প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

[১]সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা পাচ্ছেন না রোগীরা, বেসরকারিতে কোভিড-১৯ বাণিজ্য রমরমা

মহসীন কবির : [২]  প্রাইভেট চেম্বার বন্ধ, হাসপাতাল ঘুরে ঘুরে রোগী নিয়ে বিপাকে স্বজনরা, কোভিড-১৯ চিকিৎসা না পেয়েই মারা যাচ্ছেন অনেকে । ডাক্তার ও হাসপাতাল মালিকদের এমন আচরণ শাস্তিযোগ্য অপরাধ, তদন্ত ও বিচার দাবি ভুক্তভোগীদের। সরকারি নির্দেশনা আছে একাধিক, হুশিয়ারি উচ্চারণ করে মন্ত্রীরাও বক্তব্য দিচ্ছেন; কিন্তু বাস্তবায়ন নেই । সব ধরনের রোগীর চিকিৎসা নিশ্চিতের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে -স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক। আর বেসকারি হাসপাতালে কোভিড-১৯ চিকিৎসায় চলছে রমরমা বাণিজ্য। দেশ রূপান্তর, যুগান্তর ও ইনকিলাব

[৩] হাসপাতালের চিকিৎসায় নতুন সমস্যা তৈরি হয় কোভিড-১৯ নেগেটিভ। এতদিন যারা বলেছে, করোনা নেগেটিভ হলে ভর্তি নেবে, তারা বলে, করোনায় এখন কোনো উপসর্গ লাগে না। শ্বাসকষ্টের রোগী মানেই করোনা। ফলে ভর্তি নিতে হাসপাতালগুলো অপারগতা প্রকাশ করে আর করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, কোভিড-১৯ না থাকলে ভর্তি করানো ঠিক হবে না।

[৪] কোভিড-১৯ সংক্রমণ বাড়ার পর থেকেই রাজধানীসহ দেশের ছোট-বড় অভিজাত সব বেসরকারি হাসপাতালও ক্লিনিকে সেবার নামে চলছে রমরমা বাণিজ্য। ল্যাবগুলোতেও অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এ সংক্রান্ত তদারকি ও বিধি থাকলেও মানছে না কেউ।

[৫] স্বাস্থ্যবিদ ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে করোনা না হলেও চিকিৎসার অভাবে অনেক মানুষ মারা যাবে। জরুরি চিকিৎসা না পেয়ে অনেকেই নতুন করে রোগে আক্রান্ত হবে। ক্যানসার, কিডনি, নিউমোনিয়া, অ্যাজমা, ডায়াবেটিস, চোখের ছানিসহ অনেক রোগীই মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়বেন।

[৬] স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব গতকাল দেশ বলেন, বড় বড় এবং নামিদামি হাসপাতালের মালিকরা প্রভাব খাটিয়ে চলছেন। তারা কথা শোনেন না। করোনা সংক্রমণের শুরু থেকেই বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া এবং এ মহামারীতে সরকার ও জনগণের পাশের দাঁড়ানোর জন্য বলা হচ্ছে। কিন্তু তারা কোনো কথাই মানছেন না। ওই কর্মকর্তা বলেন, মন্ত্রণালয়ের কাছে রিপোর্ট রয়েছে। সম্প্রতি ইউনাইটেড হাসপাতালে আগুনে পুড়ে মারা যাওয়া রোগীর বিল এবং আনোয়ার খান মডার্নের এক রোগীর ভুতুড়ে বিল নিয়ে বিষয়টি সবার নজরে আসে। মন্ত্রণালয় বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। কিন্তু এসব বেসরকারি হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে অনেকের ব্যবসার ভাগাভাগি রয়েছে। তাই বছরের পর বছর এ খাতকে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।

[৭] স্বাস্থ্যবিদ ও করোনায় গঠিত টেকনিক্যাল কমিটির সদস্য ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, জাতীয় দুর্যোগের সময় আমরা দেখছি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো অনৈতিকভাবে ব্যবসা করে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে এসব হাসপাতালের সেবা ও বিলের বিষয়ে অডিট জরুরি। যৌক্তিকভাবে এসব হাসপাতালকে বিল দিতে হবে। আর করোনা চিকিৎসায় ডেডিকেটেড হাসপাতালগুলো কোনোভাবেই অতিরিক্ত বিল নিতে পারবে না। কারণ সরকারের পক্ষ থেকে সব সুযোগ-সুবিধা তাদের দেওয়া হয়। তিনি বলেন, দ্রুত সংক্রমণ প্রতিরোধ আইনের নিয়ম মানতে এসব হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষকে বাধ্য করাতে হবে। প্রয়োজনে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিদের এবং সামাজিক সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করে সবার সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বারবার বলছে, কোনোভাবেই যেন করোনার চাপে অন্য রোগীরা চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত না হন।

[৮] বেসরকারি হাসপাতালের চেয়ারম্যান ও প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেছেন, করোনাভাইরাস দুর্যোগ সামাল দেওয়ার প্রস্তুতি বাস্তবায়নের জন্য সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোর জন্য সমন্বিত উদ্যোগ দরকার। শুধু সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের জন্য প্রণোদনা এবং বীমার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বেসরকারি ও প্রাইভেটে কাজ করেন এমন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা ঘোষণা করার আহ্বান জানাই। তিনি বলেন, শুধু হুমকিধমকি দিয়ে এদের নামানো যাবে না। কারণ অনেক হাসপাতাল ও ক্লিনিকই প্রভাবশালীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। সব ক্ষেত্রেই ব্যবসায়ীদের বিচরণ। তাই আলোচনা করে বিল এবং পদ্ধতি নির্ধারণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে মনিটরিং বাড়াতে হবে।

[৯] বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল মালিক সমিতির সভাপতি মবিন খান মনে করেন, বেসরকারি হাসপাতালগুলো চিকিৎসা দিচ্ছে। আর বিল বা অন্যান্য বিষয়ে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটতে পারে। তবে আমার কাছে এ ধরনের কোনো অভিযোগ নেই। তাই দুয়েকটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঢালাওভাবে বলা ঠিক হবে না।

[১০]  স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল সম্পর্কিত বিভাগের পরিচালক আমিনুল ইসলাম বলেন, বেসরকারি মেডিকেল কলেজ, হাসপাতাল এবং ক্লিনিকগুলোকে যুক্ত করতে কয়েক দফা তাদের মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করা হয়েছে। তাদের অনুরোধ করা হয়েছে, এ মহামারী পরিস্থিতিতে জনগণের পাশে থেকে সেবা দেওয়ার। তারা যেন করোনাভাইরাস ন্যাশনাল গাইডলাইন অনুসরণ করে এবং সেভাবে যেন রোগীর চিকিৎসার ব্যবস্থাপনাটা করে। কিন্তু তারা সেটা করছে না। তবে গত কয়েক দিনের ঘটনা নিয়ে তদন্ত হচ্ছে। মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর বেসরকারি হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ ও ক্লিনিকের মালিকদের সঙ্গে বসে আলোচনা করে গাইডলাইন তৈরি করবে।

[১১] বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন-বিএমএর দফতর সম্পাদক অধ্যাপক ডা. শেখ মোহাম্মদ শহীদ উল্লাহ বলেন, প্রতিদিন করোনা রোগী শনাক্তের হার সুস্থ হওয়ার তুলনার প্রায় তিন গুণ। এর মধ্যে সব রোগীকে হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন না থাকলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়।

[১২] বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর ডা. কামরুল হাসান খান বলেন, করোনা একটি জাতীয় মহামারী। এখনই সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো। এখানে জোরাজুরির বিষয় নেই। জাতির এ সংকটে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে আলোচনার মাধ্যমে বলে উল্লেখ করেন ডা. কামরুল হাসান। কোভিড-১৯ সংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি কমিটির সদস্য এবং স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) সভাপতি প্রফেসর ডা. এম ইকবাল আর্সলান বলেন, বেসরকারি হাসপাতালগুলো মূলত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। এখন তাদের ব্যবসায়িক চরিত্রের বর্হিপ্রকাশ ঘটছে। তারা যে জনহিতকর কাজ করে না-তার প্রতিফলিত হচ্ছে।

[১৩] জানা গেছে, বেসরকারি মেডিকেল কলেজের ৬৯টি হাসপাতাল রয়েছে। এছাড়া সারা দেশে বেসরকারি খাতে শুধু হাসপাতাল ও ক্লিনিক আছে ১০ হাজারের বেশি।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত