প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আস্থা হারাচ্ছে বাংলাদেশ ?

ডেস্ক রিপোর্ট : গত ৮ মার্চ প্রথম দেশে কভিড-১৯ বা নভেল করোনাভাইরাস আক্রান্ত শনাক্ত হয়। আর এক সপ্তাহ পরই তিন মাস অতিক্রম হবে। গত ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটির নামে লকডাউন ঘোষণা করার পর গত ৩১ মে থেকে তা তুলে নেয়া হয়েছে। কিন্তু এদিকে কভিড সংক্রমণ এখনো নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। এ পরিস্থিতি দেশের অর্থনীতির জন্য চরম হতাশাজনক মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সৃষ্ট হতাশা এখন বিদেশীদের মধ্যেও দেখা দিতে শুরু করেছে। ফলে কভিড সংক্রমণ অব্যবস্থাপনায় ক্রমেই বাংলাদেশের ওপর আস্থা হারাতে শুরু করেছে বিদেশীরা। বণিক বার্তা

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনা পরিস্থিতি বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার ফাঁকগুলোর বড় ধরনের প্রকাশ ঘটিয়েছে। যার কারণে অদূরভবিষ্যতে কভিড সংক্রমণ থেমে যাবে বা কভিড ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন হবে, এমন চিত্র অবাস্তব বলে মনে করছেন স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা। একই অবস্থা বিদেশীদেরও। তারা প্রতি মুহূর্তেই কভিড প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার অবস্থা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। আর সংক্রমণের গতিপ্রকৃতিতে ক্রমেই হতাশ হচ্ছে।

সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশের কভিড সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ে এরই মধ্যে অনেক বিদেশী তাদের হতাশার কথা জানাতেও শুরু করেছেন। অতিসম্প্রতি বাংলাদেশসহ আরো বেশকিছু দেশের মানুষ প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে জাপান। যাতে অনেক বিদেশীর হতাশা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। কভিড সংক্রমণ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে ফিরে আসা নিয়ে আতঙ্ক বিরাজ করছে। এ আতঙ্কের বিষয়টি অনেকে জানিয়েছেনও বাংলাদেশীদের কাছে।

বিদেশী বিনিয়োগসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এখন পৃথিবীর সবাই লকডাউনে আছে। কোথাও কেউ যাচ্ছে না, এয়ারপোর্টগুলো খুলছে না। কিন্তু অতিসম্প্রতি এ পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করেছে। অল্প কিছু এয়ারপোর্ট এরই মধ্যে খোলা হয়েছে যেমন—স্পেন, যুক্তরাজ্য খুলতে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে সবাই খুলে দেবে, কিন্তু বাংলাদেশের জন্য কেউ খুলবে না। কারণ সংক্রমিত দেশ থেকে তারা আসতে দেবে না। বাংলাদেশের মানুষ যদি বহির্বিশ্বে চলাচল করতে না পারে, তাহলে তারা ব্যবসা করবে কী করে? আবার কভিড সংক্রমণ প্রেক্ষাপটে বিদেশীরা বাংলাদেশে আসবেন না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীনারা ভারত থেকে তাদের লোকজন সরিয়ে নিচ্ছে। কারণ হিসেবে দেখাচ্ছে ভারতের সংক্রমণ পরিস্থিতি বেড়ে যাওয়া। একইভাবে বাংলাদেশ থেকেও নিয়ে যাবে, যদি আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারি। এরই মধ্যে অনেক বিদেশীই তাদের পরিবার এ দেশ থেকে সরিয়ে নিয়েছেন। যারা আমাদের বড় প্রকল্পগুলোর সঙ্গে আছেন, তারাও যদি চলে যান তাহলে কী অবস্থা হবে?

বিদেশীদের অনাস্থা শিগগিরই প্রতীয়মান না হলেও এক মাস পরই হবে, এমন মত প্রকাশ করেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর।  তিনি বলেন, বহির্বিশ্ব এখন স্বাভাবিক হওয়ার পথে। এ পরিস্থিতিতে আমরা হয়ে যাব অস্পৃশ্য। বিদেশীদের কাছে আস্থা হারিয়ে ফেলব। ফলে কেউ এখানে আসবে না এবং আমাদেরও কোথাও যেতে দেবে না। আমাদের দেশ থেকে বিদেশী নাগরিকদের সরিয়ে নেবে নিজ নিজ দেশগুলো। এর বড় প্রভাব পড়বে দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতিতে। এমনকি পুঁজিবাজারেও এর প্রতিফলন দেখা যাবে।

নভেল করোনাভাইরাসের কারণে দেড় মাসের বেশি সময় ধরে দেশের পুঁজিবাজারে লেনদেন বন্ধ রয়েছে। গত দুদিন হলো পুনরায় চালু হলেও দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় বাংলাদেশ ও শ্রীলংকার পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করা বিদেশী ফান্ডগুলো এরই মধ্যে তাদের বিনিয়োগ নিয়ে সতর্ক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। আপৎকালীন পরিস্থিতিতে এ দুই দেশের পুঁজিবাজারের ভঙ্গুরতার বিষয়টি বিদেশী ফান্ডগুলোকে বিনিয়োগ প্রত্যাহারের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি ব্লুমবার্গের কাছে বাংলাদেশ ও শ্রীলংকার পুঁজিবাজার থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করার কথা জানিয়েছেন বিদেশী ফান্ডগুলোর কর্মকর্তারা।

ব্লুমবার্গের খবরে বলা হয়েছে, বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশ ও শ্রীলংকা হচ্ছে হাতেগোনা কয়েকটি দেশের মধ্যে অন্যতম, যেখানে করোনাভাইরাসের কারণে মার্চ থেকে পুঁজিবাজার বন্ধ রয়েছে। বিশ্বব্যাপী এপ্রিলে পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াতে দেখা গেলেও বন্ধ থাকার কারণে এ দুই দেশের বিনিয়োগকারীরা এক্ষেত্রে বঞ্চিত হয়েছেন।

টেলিমার দুবাইয়ের ইকুইটি স্ট্র্যাটেজির প্রধান হাসনাইন মালিক বাংলাদেশের পুঁজিবাজার বন্ধ থাকা প্রসঙ্গে বলেন, এটি একটি তিক্ত অভিজ্ঞতা। এত দীর্ঘ সময় ধরে বাজার বন্ধ থাকার কারণে অনেক বিনিয়োগকারী এখান থেকে চলে যাবেন। হয়তো একেবারে সব বিনিয়োগ প্রত্যাহার হবে না। এক্ষেত্রে বিদেশীরা ধীরে ধীরে তাদের বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নেবে।

পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যত দ্রুত অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে তত দ্রুততার সঙ্গে শেয়ারবাজারে বিদেশীরা ফিরে আসবেন। এখন যেহেতু বাজারে মূল্য অনেক কম, এ সময় বিদেশীদের কাছে বাজার আকর্ষণীয়। আর্থিক বিশ্লেষণ দৃষ্টিকোণ থেকে এ সময়ে বিদেশীদের আসা উচিত। কিন্তু এক্ষেত্রে বড় অন্তরায় হলো কভিড। শেয়ারবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিদেশী বিনিয়োগ থাকলেও তারা বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশে এসে।

বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, যেকোনো প্রতিষ্ঠান যখন এখানে বিনিয়োগ করে, তারা এখানে এসে আর্থিক বিশ্লেষনগুলো করে। ব্যাংকে যায়, সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে যায়। এভাবে পরিস্থিতি যাচাই করে তারা প্রতিবেদন তৈরি করে। এখন বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বিশ্লেষণ করবে কীভাবে? আর বিশ্লেষণ না করে তারা বিনিয়োগ তো করবে না।

নভেল করোনাভাইরাসের কারণে দীর্ঘ ৬৫ দিন বন্ধ থাকার পর রোববার দেশের পুঁজিবাজারে লেনদেন শুরু হয়। দুই মাসেরও বেশি সময় পর লেনদেন শুরু হওয়ার কারণে এদিন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উচ্ছ্বাস লক্ষ করা যায়, যার প্রভাবে সেদিন সব সূচক বেড়েছে। অন্যদিকে রোববার দেশে একদিনে সর্বোচ্চসংখ্যক কভিড-১৯-এ আক্রান্ত ও মৃত্যু হয়েছে। এতে করোনা পরিস্থিতি আরো অবনতি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে। ফলে গতকাল দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সার্বিক সূচক ডিএসইএক্স দেড় শতাংশ কমেছে। করোনা আতঙ্কসহ বিদেশী বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বিক্রির বিষয়টিও দরপতনে ভূমিকা রেখেছে।

বাজার বিশ্লেষকেরা বলছেন, রোববারের তুলনায় গতকাল দেশের পুঁজিবাজারে শেয়ার বিক্রির প্রবণতা ছিল বেশি। ব্যক্তি শ্রেণীর পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরাও নিজেদের নগদ অর্থের প্রয়োজন মেটাতে শেয়ার বিক্রি করেছেন। বিদেশী বিনিয়োগকারীরাও তাদের পোর্টফোলিওতে থাকা শেয়ার বিক্রি করেছেন। পাশাপাশি বিদেশীরা শেয়ার কিনেছেনও। কভিড-১৯-এ আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টিও বিনিয়োগকারীদের শঙ্কিত করেছে। তাছাড়া কভিড-১৯-এর কারণে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আয় কমে যাওয়ার সম্ভাবনার বিষয়টিও বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বিক্রির ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছে।

এদিকে গত ২৭ মে থেকে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তানসহ ১০টি দেশ থেকে আসা মানুষের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে জাপান। করোনাভাইরাস প্রতিরোধে তাদের দেশের বিভিন্ন এলাকায় জারি করা জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার শুরু করলেও জাপান ভ্রমণে বাংলাদেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা করেছে। এ নিষেধাজ্ঞা পরবর্তী দুই মাস পর্যন্ত থাকতে পারে।

বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণের সার্বিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে বিদেশী বিনিয়োগকারীসংশ্লিষ্ট বাণিজ্য সংগঠনগুলো বলছে, কভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবটি বৈশ্বিক। আর বিশ্বের কোনো দেশই ভাইরাসটির সংক্রমণ রোধে যথাযথভাবে ভূমিকা পালন করতে পারেনি। বাংলাদেশও ব্যতিক্রম নয়।

ফরেন ইনভেস্টরর্স চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফআইসিসিআই) সভাপতি রুপালী চৌধুরী বলেন, কভিড-১৯ প্রেক্ষাপটে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের মনোভাব নিয়ে মন্তব্য করার সময় এখনো আসেনি। সাধারণ দৃষ্টিকোণ থেকে দেশে বসবাস করা সব মানুষের জন্যই আমাদের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতি দূর করা প্রয়োজন। আর শুধু বিদেশী বিনিয়োগকারীদের বিষয়ে বলতে গেলে আমাদের এখন অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর সফল উন্নয়ন দেখানো প্রয়োজন, যা বিদেশী বিনিয়োগকারীদের ধরে রাখতে অবশ্যই সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত