প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ডাঃ তাজিন আফরোজ শাহ : বেসরকারি চিকিৎসকদের ঈদ কাটল বেতন উৎসব-ভাতা ছাড়া

ঈদ সবার জন্য অনাবিল আনন্দ বয়ে আনলেও এবারের প্রেক্ষাপটটা অনেকটাই ভিন্ন ছিল। নভেল করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি সব কিছু উলট পালট করে দিয়েছে। তবুও জীবন থেমে থাকেনি। তাইতো সবাই তাদের নিজেদের মত করে ঈদুল ফিতরের আনন্দে মেতে উঠেছিল। কিন্ত এই লক ডাউন পরিস্থিতিতেও নিজেদের জীবনের মায়া ত্যাগ করে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে ফ্রন্টলাইনে থাকা সরকারি চিকিৎসকদের পাশাপাশি বিভিন্ন হাসপাতালে দিন রাত স্বাস্থ্য সেবা দিয়ে যাচ্ছেন বেসরকারি চিকিৎসকরা। তাদের অনেকেই ঠিক মত বেতন উৎসব-ভাতা পায়নি বলে অভিযোগ উঠছে। এতে তাদের ঈদ কেটেছে অনেকটাই নিরানন্দে সে নিয়ে কোন সন্দেহ নাই।

সরকারি চাকরিতে আর যাই হোক মাস শেষে নিয়মিত পাওয়া যায় বেতন –ভাতা, প্রণোদনা, রয়েছে চাকরির নিশ্চয়তা । আর বেসরকারি ও ব্যাক্তিমালিকানাধিন প্রতিষ্ঠানে তা সব সময় মানা হয়না বা হয়ে উঠে না। আর এ জন্যই সেদিন ফেসবুকে আক্ষেপ করে একজন লিখেছেন “চাকরি করলে সরকারি আর চাষ করলে তরকারি”। সবে মাত্র খুশির ঈদ শেষ হল কিন্তু দেশের বেশীর ভাগ বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে কর্মরত শিক্ষক, চিকিৎসক ও কর্মচারীগণ ঠিকমত বেতন ও উৎসব ভাতা পায়নি বলে বিভিন্ন মাধ্যম থেক শোনা যাচ্ছে।

মৃত্যু ঝুঁকি মাথায় নিয়ে দেশের করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসা সেবা প্রদানে অনন্য নজীর স্থাপন করে চলেছেন দেশিও চিকিৎসকগণ। বাংলাদেশ ডক্টরস’ ফাউন্ডেশনের (বিডিএফ) এর সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী আজ পর্যন্ত কোভিড আক্রান্ত ডাক্তারদের সংখ্যা মোট ৯৪১ জন, এর মধ্যে সুস্থ হয়েছেন প্রায় ৪২০ জন। মৃত্যুবরন করেছেন দশ জন , তবে কোভিডের লক্ষ্মণ ও এক্সপোজার হিস্ট্রি নিয়ে মৃত কিন্তু টেস্ট নেগেটিভ এসেছে (৩০-৪০% ক্ষেত্রে আসতেই পারে), এরকম চিকিৎসকরা যুক্ত করলে এই সংখ্যাটা ১২ এর উপরে। তারপরেও এদেশে প্রায় ৫০ হাজারের বেশি চিকিৎসক বেসরকারি মেডিকেল কলেজ বা হাসপাতালগুলোতে সেবা প্রদান করে যাচ্ছেন । তাদের চাকরির নিশ্চয়তা নেই, অন্যান্য সুযোগ সুবিধাও কম, প্রণোদনা তো দূরের কথা ।

এই করোনা দুর্যোগের সময় তাদের অনেকেরই বেতন বন্ধ করে দেওয়া এবং অন্যান্য সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত করায় হতাশা নেমে এসেছে এ বিপুল সংখ্যক পেশাজীবীদের মাঝে।

চিকিৎসকদের সংগঠন বাংলাদেশ ডক্টরস ফাউন্ডেশন-বিডিএফের পরিচালিত সম্প্রতি এক জরিপে করোনা সঙ্কট শুরু হওয়ার পর থেকে বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালগুলোর ৬১ শতাংশ চিকিৎসকের বেতন অনিয়মিত হয়ে পড়েছে বলে প্রতিবেদন উঠে এসেছে। বিডিএফ গত ১৩ থেকে ১৫ মে অনলাইনে জরিপ চালিয়ে পরিস্থিতির ব্যাপকতা বোঝার চেষ্টা করে। ৫১৯ জন চিকিৎসকের ওপর চালানো ওই জরিপের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনাভাইরাস সঙ্কট শুরুর পর বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালগুলোর ৬১ শতাংশ চিকিৎসকের বেতন অনিয়মিত; বোনাস পাননি ৮৩ দশমিক ৮ শতাংশ।

হালেই কোভিড ডেসিগনেটেড হওয়া হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এক চিকিৎসক জানান, গত ডিসেম্বরে সবশেষ বেতন পেয়েছি। জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি, মার্চ ও এপ্রিল মাসের বেতন এখনও হয়নি। আমরা অনেক দেনদরবার করেছি। তারা দিব, দিচ্ছি করছে। বলছে তাদের ফান্ড নাই। হাসপাতালে রোগী নেই। আমরা যদি বেতনটা না পাই তাহলে কীভাবে চলে? রাজধানীর কেয়ার হাসপাতালের একজন চিকিৎসক বলেন, ফেব্রুয়ারি মাসের বেতনের ৩ ভাগের দুই ভাগ বেতন পেয়েছি। মার্চ-এপ্রিলের বেতন হয়নি। নার্স, আয়া, ওয়ার্ড বয় সবারই এক অবস্থা। সেখানকার একজন চিকিৎসক বলেছেন, লকডাউনের আগে নিয়মিত বেতন হলেও এখন সমস্যায় পড়েছি আমরা। কর্তৃপক্ষ বলেছে, শুধু যারা উপস্থিত থাকবে তাদের বেতন দেওয়া হবে।

আমি নিজেই যেহেতু চিকিৎসক এবং বিভিন্ন চিকিৎসক পেশাজীবী সংঘটনের সাথে জড়িত বিভিন্ন জন বিভিন্ন অভিযোগ করেন আমাদেরকে। উল্লেখ্য, বিভিন্ন মাধ্যম যেমন, ফেসবুক পেজ/ গ্রুপ, ফোনালাপ এবং ইমেইল থেকে জানা যায়, বেতন বকেয়া রয়েছে ইউ এস বাংলা মেডিকেল ৫ মাস, সিরাজুল ইসলাম মেডিকেল ৬ মাস, শাহাবুদ্দীন মেডিকেল কলেজ ২ মাস,ম্যান্ডি ডেন্টাল কলেজ ১০ মাস, সিটি ডেন্টাল কলেজ ১২ মাস, নর্দান মেডিকেল-রংপুর ৩ মাস। এ ছাড়াও অর্ধেক বেতন দিয়েছে এমন প্রতিষ্ঠান গুলোর মধ্যে রয়েছে আদ দ্বীন মেডিক্যাল কলেজ খুলনা ও যশোর, কুমুদিনী উইমেন্স, মুন্নু মেডিকেল মানিকগঞ্জ ,ইস্ট ওয়েস্ট মেডিকেল কলেজ, কেয়ার মেডিকেল কলেজ, সেন্ট্রাল মেডিকেল- কুমিল্লা , ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল -টঙ্গী। তা ছাড়া আরো বেশ কয়েক্তি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ছাটাইয়ের অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে । বেসরকারি অনেক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কর্মীদের গত বছরের বেতনও বকেয়া রয়েছে। তাদের অভিযোগ, এখন মহামারির কথা বলে তাদের বকেয়া পরিশোধ করা হচ্ছে না। এদিকে বিভিন্ন বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে একই অভিযোগ পাওয়া গেছে।

কিছু সুপারিশমালাঃ

উপরোক্ত পরিস্তিতি বিবেচনা করে কিছু সুপারিশ মালা পেশ করা হল।

অবিলম্বে বেসরকারি ডাক্তারদের বকেয়া সহ পূর্ণ বেতন ঈদ বোনাস পরিশোধের উদ্যোগ নেবার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সহ সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি । পাশাপাশি চিকিৎসকগণের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা দিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবার দাবী জানাচ্ছি। করোনা চিকিৎসায় অগ্রদূত ডাক্তারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষে নিমক্ত সুপারিশ মালা পেস করা হল।

-ডাক্তারদের পর্যাপ্ত সংখ্যক উন্নত মানের পিপিই ও মাস্ক সরবরাহ নিশ্চিত করা

-করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ডাক্তারদের আইসোলোশনে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ সুবিধা সহ পৃথক হোটেল ও অ্যাপার্টমেন্টের ব্যবস্থা করা।

-করোনা রোগী সনাক্ত করার সুবিধা উপজেলা পর্যায়ে চালু করতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, সরঞ্জাম ও জনবল নিয়োগ করা
– চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য সেবা কার্যক্রমে নিয়োজিত দের সম্মান প্রদান ও কর্মক্ষেত্রের সুরক্ষা নিশ্চিত করা

-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ডাক্তার/স্বাস্থ্যকর্মীদের করোনাতে আক্রান্ত বা মৃত হলে সরকারি চাকুরীজীবীদের মত প্রনোদনা দিতে হবে।

–প্রতিটি বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে জব সিকিউরিটি, ও সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী বেতন কাঠামো অনুযায়ী সার্ভিস রুল থাকতে হবে।

-হাসপাতাল চালানোর জন্য পর্যাপ্ত জনবল নিশ্চিত করতে হবে।

-রোস্টার ডিউটির সময়ে খাবারের ব্যাবস্থা থাকতে হবে ও নারী ডাক্তারদের ইভিনিং বা নাইট ডিউটির সময় ট্রান্সপোর্ট সুবিধা রাখতে হবে। স্টাডি লিভ, ও ম্যাটার্নিটি লিভের ব্যাবস্থা থাকতে হবে।

-ছুটির দিন বা ডিউটি আওয়ারের বাইরে যদি হাসপাতালে আসতে হয়,তাহলেও ট্র্যান্সপোর্ট সুবিধা দিতে হবে।

উপরোক্ত সুপারিশ মালা অনুসরন করা হলে চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, সেই অনুযায়ি দেশের করোনা পরিস্থতি আশু উন্নতি হবে বলে দৃঢ় বিশ্বাস।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত