প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

[১] শুরুতেই দ্রুত পদক্ষেপের কারণে ১০ কোটি মানুষের ভিয়েতনামে  করোনা ভাইরাসে মৃত্যু শূন্য

ডেস্ক  রিপোর্ট : [২] করোনা ভাইরাস মহামারী সফলভাবে মোকাবেলার উদাহরণ খুঁজতে বিশ্ববাসী যখন এশিয়ায় নজর দিচ্ছে, তখন ব্যাপক মনোযোগ ও বাহবা পাচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও হংকং। ভিয়েতনামের সাফল্যের গল্প কিন্তু আড়ালেই রয়ে যাচ্ছে।

[৩] চীনের সঙ্গে দীর্ঘ সীমানা থাকলেও এবং লাখ লাখ চীনা পর্যটক প্রতিবছর ভিয়েতনামে এলেও ৯ কোটি ৭০ লাখ মানুষের দেশটিতে শনিবার পর্যন্ত করোনা ভাইরাসে কারও মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি। মাত্র ৩২৭ জন এই মহামারীতে আক্রান্ত হয়েছেন। যাদের মধ্যে ২৭৯ জন সেরেও উঠেছেন।

[৪] এ সাফল্য অসাধারণ। কারণ নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ ভিয়েতনামের এশিয়ার অন্যদেশগুলোর তুলনায় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা স্বল্পোন্নত। বিশ্ব ব্যাংকের হিসাবে, দেশটিতে প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য মাত্র ৮ জন চিকিৎসক। যা দক্ষিণ কোরিয়ার তুলনায় এক-তৃতীয়াংশ।

[৫] ৩ সপ্তাহের লকডাউনের পর এপ্রিলের শেষে ভিয়েতনাম সামাজিক দূরত্বের বিধিনিষেধ তুলে নেয়। দেশটিতে স্থানীয়ভাবে সংক্রমণ হয়নি ৪০ দিনের বেশি সময়। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আবার চালু হয়েছে। জীবনযাত্রা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসছে।

[৬] সংশয়বাদীরা হয়ত ভিয়েতনামের এই সরকারি সংখ্যার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন। কিন্তু কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসায় দেশটির প্রধান একটি হাসপাতালে কর্মরত সংক্রামক ব্যাধির চিকিৎসক গাই থোয়াইটস মনে করছেন, এই সংখ্যা বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। হো চি মিন সিটিতে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি ক্লিনিক্যাল রিসার্চ ইউনিটেরও প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই চিকিৎসক সিএনএনকে বলেন, আমি প্রতিদিন ওয়ার্ডগুলোতে যাই। আমি জানি সেখানে মৃত্যুর কোনো ঘটনা নেই। শহরে বাসিন্দাদের মধ্যে করোনা ভাইরাসের অনিয়ন্ত্রিতভাবে ছড়িয়ে পড়লে তো হাসপাতালে রোগীরা আসতোই। কিন্তু এমনটা কখনও ঘটেনি।

[৭] জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মহামারীর বিস্তার রোধে সরকারের শুরুতেই দ্রুত পদক্ষেপ থেকে শুরু করে ব্যাপকভাবে কন্টাক্ট ট্রেসিং ও কোয়ারেন্টাইন করা। কেউ আক্রান্ত হওয়ার কয়েক সপ্তাহ আগেই ভিয়েতনাম করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলার প্রস্তুতি শুরু করেছিল। মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণের কোনও ‘সুস্পষ্ট প্রমাণ’ মেলেনি বলে তখনও চীন ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জোর দিয়ে বলে আসছিল। কিন্তু ভিয়েতনাম কোনো ঝুঁকি নেয়নি।

[৮] হ্যানয়ে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হাইজিন ও এপিডেমিওলজির সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের উপ-প্রধান ফ্যাম কোয়াং থাই বলেন, কেবল ডব্লিউএইচওর দিকনির্দেশনার জন্য আমরা বসে থাকিনি। আগেভাগে পদক্ষেপ নিতে দেশের ভেতরে-বাইরে থেকে আমরা উপাত্ত সংগ্রহ করেছি।

[৯] জানুয়ারির শুরুতেই হ্যানয়ের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চীনের উহানফেরত যাত্রীদের তাপমাত্রা পরীক্ষার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। জ্বর থাকলে যাত্রীদের বিচ্ছিন্ন রেখে তাদের নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়।

[১০] জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে উপ-প্রধানমন্ত্রী ভু ডাক ডাম ভিয়েতনামে প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়া রোধে স্থল বন্দর, বিমানবন্দর ও সমুদ্রবন্দরগুলিতে মেডিকেল কোয়ারেন্টাইন জোরদার করতে ‘কঠোর পদক্ষেপ’ নিতে সরকারি সংস্থাগুলিকে নির্দেশ দেন।

[১১] ভিয়েতনামে ২৩ জানুয়ারি প্রথম ২ জনের করোনা ভাইরাস শনাক্ত হয়। এরা ভিয়েতনামে বসবাসরত এক চীনা নাগরিক ও তার বাবা, যিনি উহান থেকে এসেছিলেন। এরপর উহানের সব ফ্লাইট বন্ধ করে দেয় ভিয়েতনাম।

[১২] ভিয়েতনামের বাসিন্দরা যখন চান্দ্র নববর্ষের ছুটি উদযাপন করছিল, তখন ২৭ জানুয়ারি ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট পার্টির এক জরুরি সভায় করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধের’ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী নুয়েন সুয়ান ফুক। প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে ৩ দিন পর গঠন করেন জাতীয় নির্বাহী কমিটি। সেদিনই করোনা ভাইরাসকে বিশ্বজুড়ে জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি হিসেবে ঘোষণা করে ডব্লিউএইচও।

[১৩] ১ ফেব্রুয়ারি দেশজুড়ে ‘জাতীয় মহামারী’ ঘোষণা করে ভিয়েতনাম। যখন দেশটিতে মাত্র ৬ জন আক্রান্ত ছিল। চীনের সঙ্গে সব ফ্লাইট বন্ধ করে ভিয়েতনাম। পরদিন চীনাদের ভিসা দেয়াও স্থগিত করে দেশটি।

[১৪] এরপর একে একে দক্ষিণ কোরিয়া, ইরান ও ইতালির মতো দেশের ক্ষেত্রেও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা, আগমণে কোয়ারেন্টাইন ও ভিসা স্থগিত করা হয়। আর মার্চের শেষের দিকে সব বিদেশিদের প্রবেশ স্থগিত করা হয়।

[১৫] কার্যকর লকডাউন ব্যবস্থাও শুরুতেই নিয়েছিল ভিয়েতনাম। ৭ জন ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর ১২ ফেব্রুয়ারি হ্যানয়ের উত্তরে ১০ হাজার বাসিন্দার পুরো একটি গ্রামাঞ্চল ২০ দিনের জন্য লকডাউন করে রাখা হয়। যেটা ছিল চীনের বাইরে প্রথম বড় আকারের লকডাউন। নববর্ষের ছুটির পরে ফেব্রুয়ারিতে পুনরায় চালু হতে যাওয়া স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে মে মাস পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

[১৬] হো চি মিন সিটির সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ থোয়াইটস জানান, ভিয়েতনামের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়াই সাফল্যের মূল কারণ। ডাক্তার ফ্যাম বলেন, আমাদের ৬৩টি প্রাদেশিক ও ৭০০টিরও বেশি জেলা পর্যায়ের রোগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র (সিডিসি) এবং ১১ হাজারের বেশি কমিউনিটি হেলথ সেন্টার রয়েছে, যার সবাই কন্টাক্ট ট্রেসিংয়ে ভূমিকা রাখে। করোনা ভাইরাসে আক্রান্তকে আগের ১৪ দিনে তার সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের সম্পূর্ণ একটি তালিকা স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষকে দিতে হয়। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি কোথায় ও কখন গিয়েছিলেন তা পত্র-পত্রিকা ও টেলিভিশনে ঘোষণা করে জনগণকে জানানো হয়। কেউ একই সময়ে সেসব জায়গায় গিয়ে থাকলে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের কাছে পরীক্ষার জন্য যেতে আহ্বান জানানো হয়।

[১৭] ফ্যাম বলেন, কন্টাক্ট ট্রেসিংয়ের মাধ্যমে আমরা প্রায় সবাইকে খুঁজে পেয়েছি। তাদেরকে বাড়িতে কোয়ারেন্টাইনে থাকতে বলেছি। কোনও লক্ষণ দেখা দিলে তাদেরকে বিনামূল্যে পরীক্ষার জন্য স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতে বলেছি।

[১৮] হাসপাতালটির একহাজার স্বাস্থ্যকর্মীসহ সংশ্লিষ্ট ১৫ হাজারের বেশি মানুষের পরীক্ষা করেছে কর্তৃপক্ষ। ভিয়েতনামের কন্টাক্ট ট্রেসিং এতোই পুঙ্খানুপুঙ্খ ছিল যে, কেবল সংক্রমিত ব্যক্তির প্রত্যক্ষ সংস্পর্শ নয়, পরোক্ষভাবে সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদেরও খুঁজে বের করা হয়।

[১৯] থোয়াইটস বলেন, এটা করোনা ভাইরাস মোকাবিলার বিশেষ একটি অংশ। এই মাত্রার কোয়ারেন্টাইন কোনো দেশ করেছে বলে আমার মনে হয় না। আক্রান্তদের প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে আসা সবাইকে স্বাস্থ্যকেন্দ্র, হোটেল বা সেনাশিবিরে সরকারি কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়। আর পরোক্ষভাবে সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের নিজেদের ঘরে বিচ্ছিন্ন থাকার নির্দেশ দেয়া হয়। ভিয়েতনামের কোভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিয়ে দেশটির প্রায় ২০ জন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের করা গবেষণায় এমনটিই বলা হয়।

[২০] গবেষণা অনুযায়ী, ১ মে পর্যন্ত প্রায় ৭০ হাজার মানুষকে সরকারি নিয়ন্ত্রণে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়, আর ১ লাখ ৪০ মানুষকে বাড়িতে বা হোটেলে আইসোলেশনে রাখা হয়। প্রথম ২৭০ জন কোভিড-১৯ রোগীর মধ্যে ৪৩ শতাংশের কোনো উপসর্গ দেখা যায়নি। যা পুঙ্খানুপুঙ্খ কন্টাক্ট ট্রেসিং ও কোয়ারেন্টাইনের গুরুত্ব তুলে ধরে। কর্তৃপক্ষ সংক্রমণ বিস্তারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের এভাবে সক্রিয়ভাবে খুঁজে না বের করলে তারা শনাক্ত হওয়ার অনেক আগেই নীরবে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে দিত।

[২১] ভিয়েতনাম সরকার শুরু থেকেই করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব নিয়ে জনসাধারণকে স্পষ্টভাবে জানিয়েছে। মহামারী ও চিকিৎসা পরামর্শ বিষয়ে সর্বশেষ পরিস্থিতি জনগণকে জানাতে নিবেদিত ওয়েবসাইট, টেলিফোন হটলাইন ও মোবাইল অ্যাপস চালু করা হয়। এসএমএস বার্তার মাধ্যমে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ও নিয়মিতভাবে নাগরিকদের কাছে সতর্কবার্তা পাঠায়। কাজে লাগানো হয় দেশটির প্রচারের মাধ্যমগুলোকেও। লাউডস্পিকার, পোস্টার, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোর মাধ্যমে এই মহামারী সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো হয়।

[২২] সঠিকভাবে হাত ধোয়াসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করতে ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে জনপ্রিয় একটি ভিয়েতনামি পপ হিটের সুরে আকর্ষণীয় মিউজিক ভিডিও প্রকাশ করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ‘হাত-ধোয়ার গান’হিসাবে পরিচিত ভিডিওটি মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। যেটা ইউটিউবে ৪ কোটি ৮০ লাখ বারের বেশি দেখা হয়েছে। বিডিনিউজ২৪

সর্বাধিক পঠিত