প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আমার কাছে দেশ মানে এক লোকের পাশে অন্য লোক

ফেরদৌস আহমেদ উজ্জল : ভোরবেলা ঘুম ভাঙ্গতেই গুনগুন করে গানটা গাওয়ার চেষ্টা করলাম। ‘ও আমার দেশের মাটি, তোমার পরে ঠেকাই মাথা…’। আমাদের দেশটা কত সুন্দর আর কত বৈচিত্র্যময়। এখানে প্রাণ-প্রকৃতি আর মানুষের লড়াই সংগ্রামের কত কথা ইতিহাসের প্রতিটি পরতে পরতে। প্রকৃতি আমাদের কত উজাড় করে সব দিয়েছিলো। এখানে মাটিকে মানুষ সোনা ভাবতে ভালবাসে কারণ এখানে সোনা রং এর ফসল ফলে। এখানে মাঝি নৌকা বেয়ে যায় আর তার সাথে ভাটিয়ালী গান। প্রতিটা ঋতুতে আর তার সকল আনুষ্ঠানিকতার যে রং ও রূপ তা পৃথিবীর অনেক বড় বড় ব্যক্তিত্বকে বিমোহিত করেছে বারে বারে। অনেক জনপদকে বিদেশীরা সবসময় দখল করতে পারলেও বাঙলাকে তাদের বসে রাখা সহজ ছিলো না। প্রতিটি যুগে এখানে সৃষ্টি হয়েছে লড়াইয়ের ইতিহাস যার কোনটি থেকে কোনটি কম নয়। আসলে ইতিহাস পাঠ করা আমার আজকের আলোচনা নয়। আমরা একটা কাজে হাত দিয়েছিলাম যার নাম দিয়েছিলাম ‘চাল ডাল আলু। বাঁচার জন্য। ৪৫০ টাকায় এক সপ্তাহ।’ মূলত এ কাজটি করতে গিয়ে আমরা নতুন করে এক দেশকে খুঁজে পেলাম। গানে যেমন বলে, ‘আমার কাছে দেশ মানে এক লোকের পাশে অন্য লোক….’

আমাদের কাজটা শুরু করেছিলাম খুবই তাৎক্ষনিক একটা সিদ্ধান্তে। কিন্তু দিনে দিনে কত কত মানুষ, নাম জানা, নাম না জানা, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, বিশ্বাসী, অবিশ্বাসী, ছাত্র, শিক্ষক, সাংবাদিক, রাজনীতিক, গবেষক, গার্মেন্ট শ্রমিক, ডাক্তার, শিল্পী, আমলা, কৃষক, প্রবীণ, শিশু, বেকার, দোকানদার, প্রতিবেশি, আত্মীয়, বন্ধু কে নেই আমাদের এই উদ্যোগের সাথে। একজন ফোন করলেন বরিশালের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে। খুবই আঞ্চলিক টান দিয়ে বললেন, কয়ডা টাহা পাঠাইছি, পাইছো? সত্যি বলতে চোখে পানি চলে আসলো। প্রথম ও শেষ পর্যন্ত কাউকে জিজ্ঞেস করেছিলাম ভাই আপনি কি করেন? সে তার উত্তরে বলেছিলেন, আরে ভাই মুনে চাইছে,পাঠাইছি আর কি দরকার, আপনারা ভাল কাজ করতাছেন, ভাল লাগলো, শেষ!

আমরা এখন মানুষকে ডিম খিচুড়ি খাওয়াই। প্রতিদিন ২০০ জনের বেশি মানুষকে এখন আমরা ডিম আর সবজি খিচুড়ি খাওয়াই। প্রতিদিন একজনের বাসার ছাদে রান্না হয় খিচুড়ি আর সেগুলো প্যাকেট করে বিকাল ৫ টা থেকে ৬ টার মধ্যে বিতরণ করা হয়। গত একমাস ধরেই আমরা তাদের এই খাদ্য সহযোগিতা করেছি। এর মধ্যে অধিকাংশই নিম্ন আয়ের মানুষ। কেউ রিকশা চালায়, কেউ বিধবা, কেউ কর্মহীন, কেউ অসুস্থ আবার কেউ মধ্যবিত্ত পরিবারের ও আছে যারা কারো কাছে হাত পাততে পারে না। এই খিচুড়ি প্রকল্প একমাস ধরে চালানোটা মোটেই সহজ ছিলো না। তারপরও কত কত মানুষ আমাদের পাশে এসে দাড়িয়েছে, সাহস যুগিয়েছে, ভালবাসা দিয়েছে। তাদের প্রতি আমাদের এই সামান্য কৃতজ্ঞতা।

আমাদের অনেকের শ্রদ্ধাভাজন শেলী আপা একজন নারী আন্দোলন নেত্রী। দীর্ঘসময় ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলেন, এখন ভালো আছেন কিন্তু নিয়মিত তার চিকিৎসার মধ্যে থাকতে হয়। কিন্তু আমাদের কাজের শুরু থেকে তার পাগল প্রায় অবস্থা। প্রায়ই ফোন করে বলতেন যে সে আমাদের সাথে কাজ করতে আগ্রহী। আমি বলে বলে তাকে অনেকটা আটকিয়ে রেখেছি। সে আজ ফোন করে বললো আমরা ঈদের দিন যাদের খাওয়াবো সে রান্নার জন্য সে অনেকটা ঘি কিনে রেখেছে, যাতে তাদের ভালো করে রান্না করে খাওয়ানো যায়। তিনি যখন কথাগুলো বলেন বা অভিযোগ করেন যে কেন তাকে কাজে নিচ্ছি না, এতো আপ্লুত লাগে! বারবার মনে হয় একজন ক্যান্সার যোদ্ধা হয়ে তার এই অপরিসীম আগ্রহ আর আমরা কত কিছু ভাবি। এটাকেই হয়তো সংগ্রামী জীবন বলেন।

রাশেদা নাসরিন আপা পেশায় একজন শিক্ষক ছিলেন। চাকুরী থেকে অবসর নিয়ে নানা সামাজিক, সাংস্কৃতিক, মানবিক কাজ কাজেই ব্যস্ত থাকেন। নগরের নিম্ন আয়ের মানুষদের সন্তানদের নিয়ে তিনি আলোকশিখা নামের একটা স্কুল চালান দীর্ঘ বছর ধরে। প্রায় ৪ শতাধিক শিক্ষার্থী। তার সন্তানরা সকলেই বিদেশে থাকে কিন্তু তিনি দেশ ছেড়ে থাকতে পারেন না। সন্তানরাও তার এই মানবিক কাজে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করে থাকেন। তিনি আমাদের কাজের শুরু থেকেই খুবই অনুপ্রেরণাদায়ক ভূমিকা পালন করে চলেছেন। গতকাল ফোন করে আরও এক বস্তা চাল তার বাসা থেকে নিয়ে আসার জন্য বলেছেন । এছাড়া শুরু থেকে তিনি নানানভাবে আমাদের আর্থিক সহযোগিতা করেই চলেছেন। তিনি সময় পেলেই আমাকে তার ভাইয়ের গল্প করেন যিনি মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন আর আমাদেরকেও তিনি করোনা যুদ্ধের সৈনিক বলেই অভিহিত করেন। খুবই লজ্জা লাগে তার কথা শুনে কিন্তু খুবই অনুপ্রাণিত হই সত্যি।

মিতি আপা প্রথম আলোর সাংবাদিক। শুরু থেকে আমাদের ব্যাপক সহযোগিতাই শুধু নয়, সাহস যুগিয়েছেন প্রতিনিয়ত। ভাসমান পতিতাদের জন্য তিনি অনেকবার আমাদের টাকা দিয়েছেন আর ঈদের খাবারের জন্যও টাকা দিয়েছেন।
ছেলেটার নাম কাজী মুনির হোসেন। সে মূলত গার্মেন্টস ব্যবসায়ী। করোনা পরিস্থিতির শুরু থেকেই তার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ হতো। একটু পাগলাটে ধরনের। সে শুরু দিকে দুএকদিন কথা বলার পরেই হঠাৎ করেই শুরু করলো রান্না করা খাবারের প্রকল্প। নারায়ণগঞ্জের ভাসমান, নিম্ন আয়ের মানুষদের নিয়ে তার এই ডিম খিচুরি প্রকল্প। শেষ পর্যন্ত সে কয়েকহাজার মানুষকে দিনে খাওয়াতো। এ কাজের জন্য সে বাড়ী যাওয়া বন্ধ রেখে রাতদিন কারখানায় থেকে কাজ পরিচালনা করেছে। তার কথা ছিলো এমন ভাই আমার শ্বাসকষ্ট সহ নানাবিধ সমস্যা রয়েছে আমি করোনার খুব ভালো খাদ্য তাই একটা কাজে লাগুক জীবনটা।

দীপক শীল ছাত্র ইউনিয়ন নেতা। শুরু থেকেই আমাদের কাজের সাথে ঘনিষ্টভাবে যুক্ত। আমাদের খাবার পৌঁছে দেয়ার জন্য সে ঢাকা শহরের এ প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত ছুটে বেড়ান এখনো। সেটা বসিলা কি যাত্রাবাড়ী যেকোন জায়গায়। তার এই কর্মস্পৃহা একদমই ব্যতিক্রম।

আমাদের কাজের অন্যতম ব্যক্তি হলো শিমুল খান, শুভ, আরইয়ান, তৌহিদ, প্রভা, মৌরী, হরেন, জাওয়াদ, আসিফ, মেহেদী, ষাইফ, ফয়সাল এমন অনেক নামই যুক্ত হবে। শিমুল নারীদের স্বাস্থ্য ও তাদের নানান বিষয়গুলোকে মূলত দেখভাল করেন। এতোমধ্যে তার নেতৃত্বে ৪ টি গর্ভবতী নারীকে নিয়মিত খাদ্য ও ওষুধ দেয়া হচ্ছে। একজন নারীর ডেলিভারির খরচও আমরা দিয়েছি। আমাদের এ কাজের শুরুতে নানান দিক থেকে অর্থসহযোগিতার জন্য মুভ করেছিলেন প্রিতু, রোকন, এ্যাড তানইয়া, জয়, প্রীয়াংকা, বন্ধু ইমা, নীতিশসহ আরও কত কত নাম বলে শেষ করা যাবে না।

আমরা আমাদের এই রান্না খাবারটা ঈদের দিন পর্যন্ত চালাতে চাই। এরপর পরিস্থিতি বুঝে আবার সিদ্ধান্ত নেবো আমরা। তবে আমাদের চাল ডাল আলুর যে খাদ্য সহযোগিতা সেটা অব্যাহত রাখবো। আসছে ঈদের দিন আমরা ৫০০ মানুষের জন্য তেহারী রান্না করে খাওয়াতে চাচ্ছি। আর সেই ২০০ মানুষ যাদের আমরা সারা মাস খাওয়ালাম তাদের জন্য সেমাই, চিনি ও দুধ দেয়া হবে। আমরা গত ২৫ মার্চ থেকে আজ অবধি আমাদের এই কর্মকান্ড করার চেষ্টা করেছি। আমরা এটি চালিয়ে যেতে চাই। আমরা এসময়ে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে অসংখ্য মানুষকে দারুণ ভাবে কাজ করতে দেখেছি। আমরা দেখেছি মানুষ কতটা দরদ দিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। জীবনের মায়াকে ত্যাগ করে এই হাজার হাজার মানুষ কাজ করে যাচ্ছে। এই যে অসাধারণ মানবিকতাবোধ মানুষকে আজকেও মানুষের পাশে দাড়াতে উদ্বুদ্ধ করছে এই চিন্তাটাকে আরও সামনে এগিয়ে নিতে হবে। মানুষের এই মূল্যবোধকে আজ নতুন করে ঝালাই করার সময় এসেছে। তাই এই যে এক মানুষের পাশে আরেক মানুষের দাড়ানোর বোধটাকেই আবার আমাদের নতুন দিনের স্বপ্ন দেখাতে উদ্বুদ্ধ করছে। আমরা একটা নতুন সমাজ ও রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখছি। যে সমাজ ও রাষ্ট্র হবে মানবিক ও বৈষম্যহীন । আসুন নতুন দিনের স্বপ্ন দেখি আর আমাদের কাছে দেশ মানেই হোক এক লোকের পাশে অন্যলোক।

সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন ও সম্পাদক, পরিবেশ বার্তা।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত