প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ভার্চুয়াল আদালত : আইনজীবীদের ঝুঁকি কতটুকু

আইনজীবী ও বিচার প্রার্থীদের সম্প্রতি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হলো ভার্চুয়াল আদালত সিস্টেমে শুনানি। ইতোমধ্যেই দেশের সব জেলায় জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ও দায়রা জজ আদালতের নির্দিষ্ট সংখ্যক আদালতে ভার্চুয়াল সিস্টেমে বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীর স্বশরীরে হাজির না হয়ে শুনানি শুরু হয়েছে। বর্তমানে শুধুমাত্র জামিন শুনানি এবং জামিন হওয়ার পর বেলবন্ড দাখিলের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে ভার্চুয়াল আদালত সিস্টেমে। অনলাইন অ্যাপস Microsoft Teams বা ZOOM Cloud Meetings বা Google Meet এর মাধ্যমে মামলার সংশ্লিষ্ট আইনজীবী বিচারকের সাথে অনলাইনে ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হয়ে শুনানি করতে পারবে।

তবে হঠাৎ করে তেমন কোন প্রস্তুতির সময় না দিয়ে অনলাইনে শুনানি সিস্টেম চালু করায় অনেকগুলো আইনজীবী সমিতি তা বর্জন করার এবং শুনানিতে অংশগ্রহণ না করার মতো সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন। শুরুর দিকে কিছুটা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে মনে করে হয়তো আইনজীবী সমিতিগুলো এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে খুব দ্রুত তারা তাদের সিদ্ধান্ত হতে সরে আসবে বলে আমার ধারণা। করোণা ইস্যুতে আপদকালীন মুহুর্তের কারণে বিচারপ্রার্থীদের কথা চিন্তা করেই ভার্চুয়াল কোর্ট সিস্টেম চালু করেছে সরকার। যার ফলে আইনজীবীরা প্রশিক্ষণ বা প্রস্তুতির তেমন সুযোগ পায়নি।

করোণার কারণে নিরাপদ থাকতে জনসমাগম এড়িয়ে বাসায় বসেই যেন আইনজীবীরা বিচারপ্রার্থীদেরকে প্রতিকার দিতে পারেন সেজন্যই ভার্চুয়াল আদালত চালু করা হয়েছে। অনলাইনে শুনানি করার ক্ষেত্রে সুপ্রীম কোর্টের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, আইনজীবী উকালতনামা, কোর্ট ফিস ও বেলবন্ড স্ক্যান করে বিচারকের নিকট মেইল করে পাঠাবেন। তারপর বিচারক শুনানির তারিখ ও সময় দিবেন। সে হিসেবে উকালতনামা, কোর্ট ফিস ও বেলবন্ড ক্রয় করতে আইনজীবীকে আদালতপাড়ায় যেতে হচ্ছে। কারণ এখন পর্যন্ত অনলাইনে এগুলো ক্রয় করার সিস্টেম চালু হয়নি। উকালতনামায় বিচারপ্রার্থীর স্বাক্ষরের জন্য সেটা জেলখানায় পাঠাতে হচ্ছে। এরপর সেটা আইনজীবীকে আবার নির্দিষ্ট জায়গা হতে সংগ্রহ করে শুনানির প্রস্ততি নিতে হচ্ছে। এই কাজগুলো সম্পন্ন করার পর সকল ডকুমেন্ট স্ক্যান করে বিচারকের নিকট পাঠাতে হবে।

বেশিরভাগ মামলার ফাইল আইনজীবীর চেম্বারে রক্ষিত থাকে। ফলে এই আপদকালীন শুনানিতে অংশ নিতে তাকে চেম্বারে যেতে হবে ফাইল আনতে। বেশিরভাগ আইনজীবীর বাসায় ল্যাপটপ বা ডেস্কটপ নেই। আবার কম্পিউটার থাকলে হয়তো ইন্টারনেট সংযোগ নেই। ডকুমেন্ট প্রিন্ট করার জন্য নিজস্ব প্রিন্টার নেই। যেসব আইনজীবীরা ঢাকার বাইরে চলে এসেছে, তাদের বেশিরভাগের নিকট কোর্ট ড্রেসও নেই। অথচ ভার্চুয়ালি শুনানিতে সম্পূর্ণ কোর্ট ড্রেস পরিধান করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

ভার্চুয়ালি শুনানি করার পূর্ব প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে একজন আইনজীবীকে বাসার বাইরে বের হতেই হবে। সেক্ষেত্রে একজন আইনজীবী সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে পারবে না। ঢাকার বাইরের জেলা বারের সদস্যদেরকে এক্ষেত্রে বেশি বেগ পেতে হবে। কারণ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কিনতে আদালতপাড়ায় যাওয়াটা বেশ দু:সাধ্য। একই সঙ্গে বাসার বাইরে বের হলে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে বিভিন্ন প্রশ্নের সম্মুখীনও হতে হবে। কারণ রাষ্ট্র তাদেরকে জরুরী সেবার মতো ফ্রি মুভমেন্ট করার আদেশ দেয়নি। এক্ষেত্রে আইনজীবীদের বড় অংশ করোণাতে আক্রান্ত হতে পারে বলেও অনেকের আশঙ্কা। একটা শুনানির জন্য কয়েকবার বাসার বাইরে যাওয়ার ফলে তিনি নিজেকে এবং তার পরিবারের সদস্যদেরকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।

সরকার বিচারক ও অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের কর্মকর্তাদেরকে ভার্চুয়াল আদালত সিস্টেম বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। কিন্তু আইনজীবীরা এ বিষয়ে প্রশিক্ষণের মুখ দেখেনি।

বর্তমানের ভার্চুয়াল কোর্ট সিস্টেমে ৫-১০ শতাংশ আইনজীবী সুবিধা পাবে বলে মত দিয়েছেন অনেকে। নিজেদেরকে ঝুঁকিমুক্ত রাখতে অনলাইনে উকালতনামা, বেলবন্ড বিক্রি ও অনলাইন গেটওয়ের মাধ্যমে কোর্ট ফিস পরিশোধের সিস্টেম চালুর উদ্যোগ নিতে সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানান সাধারণ আইনজীবীরা। একইসঙ্গে উপরোক্ত বিষয়গুলোকে আরো বিবেচনার দাবীও রাখে সরকার ও সংশ্লিষ্টদের প্রতি।

তবে সামনের দিকে এই ভার্চুয়াল আদালত ক্রমান্বয়ে সুফল বয়ে আনবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে ই-জুডিসিয়ারি আরো সহজ হবে এবং আইনজীবীরা আপডেট হয়ে বিচারপ্রার্থীদেরকে প্রতিকার দিবে বলে প্রত্যাশা রইলো।

লেখক: সাকিল আহমাদ

অ্যাডভোকেট, জেলা ও দায়রা জজ আদালত, ঢাকা

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত