প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

পাপের ভাগিদার না হয়ে যাকাত আদায় করি, জেনে নিন যেসব সম্পদের যাকাত দিতে হয়

ইসমাঈল আযহার:  রমজান মাস। এ মাসে জাকাত আদায় করেন ধনীরা। জাকাত আদায় করা ইসলামের একটি ফরজ বিধান। যাকাত ইসলামের পঞ্চ স্তম্বেরও একটি। এটি আদায় না করলে পাপের ভাগিদার হতে হবে এবং কিয়ামতে এজন্য শাস্তি পেতে হবে। তাই প্রত্যেক ঈমানদারের কর্তব্য এর বিধিবিধান স্পষ্ট জানা এবং আমল করা। যে সব সম্পত্তির ওপর জাকাত ফরজ হয় এর বিবরণ দেওয়া হলো,

১. ভূমি থেকে উৎপাদিত শস্য ও ফলফলাদি
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে মোমিনরা! তোমরা তোমাদের বৈধ উপার্জন এবং তোমাদের জন্য ভূমি থেকে যে শস্য উৎপন্ন করি তা থেকে আল্লাহর নির্দেশিত পথে ব্যয় করো।’ (সূরা বাকারা : ২৬৭)। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আসমান ও ঝরনার পানিতে কিংবা স্বেচ্ছা উৎপাদিত ফসলের মধ্যে এক দশমাংশ আর যা সেচের মাধ্যমে আবাদ হয় তার মধ্যে ২০ ভাগের এক ভাগ জাকাত প্রদেয়।’ (বোখারি : ১৪৮৩)।

ফসলের ওপর জাকাত ফরজ হওয়ার নির্ধারিত পরিমাণ হলো পাঁচ ওসক। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘শস্য বা ফলমূলের ওপর জাকাত ফরজ হবে না। যতক্ষণ তা পাঁচ ওসক পরিমাণ না হয়।’ (মুসলিম : ৯৭৯)।

আর ওসকের পরিমাণ হলো, রাসুলুল্লাহ (সা.) এর ব্যবহৃত সা’য়ের ৬০ সা’ সমপরিমাণ। তাহলে নিসাব হলো, ৩০০ সা’, আর এক সা’র পরিমাণ হলো ২ হাজার ৪০ গ্রাম (দুই কেজি চল্লিশ গ্রাম)। সুতরাং নিসাবের পরিমাণ দাঁড়াল ৬১২ কেজি। তাই এর কমে জাকাত ফরজ নয়। ওই নিসাবে বিনাশ্রমে প্রাপ্ত ফসলের জাকাতের পরিমাণ হলো এক দশমাংশ আর শ্রম ব্যয়ে প্রাপ্ত ফসলের এক বিশমাংশ।

ফলমূল, শাকসবজি, তরমুজ ও জাতীয় ফসলের ওপর জাকাত ফরজ নয়। ওমর (রা.) বলেন, ‘শাকসবজিতে জাকাত নেই’। আলী (রা.) বলেন, ‘আপেল বা এ জাতীয় ফলের ওপর জাকাত ফরজ নয়। তাছাড়া যেহেতু এগুলো (নিত্যপ্রয়োজনীয়) খাবার, জাতীয় শস্য বা ফল নয়, তাই এর ওপর জাকাত নেই। তবে যদি এসব টাকার বিনিময়ে বিক্রি করা হয় তাহলে মূল্যের ওপর নিসাব পূর্ণ হয়ে এক বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর জাকাত ফরজ হবে।

২. গবাদি পশু
উট, গরু, ছাগল, ভেড়া ও মহিষের জাকাত ফরজ। যদি এসব প্রাণী ‘সায়েমা’ হয় তথা মাঠে চরে চষে খায় এবং এগুলোকে বংশ বৃদ্ধির জন্য পালন করা হয় এবং তা নিসাব পরিমাণ হয়, তাহলে এদের জাকাত দিতে হবে। উটের নিসাব ন্যূনতম ৫টি, গরুর ৩০টি আর ছাগলের ৪০টি।

‘সায়েমা’ ওই সব প্রাণীকে বলে, যেগুলো সারা বছর বা বছরের অধিকাংশ সময় চারণভূমিতে ঘাস খেয়ে বেড়ায়। যদি এসব প্রাণী সায়েমা না হয়, তবে এর ওপর জাকাত ফরজ নয়। কিন্তু যদি এগুলো দ্বারা টাকা-পয়সা কামাই করার উদ্দেশ্য থাকে; যেমন, বেচাকেনা, স্থানান্তর ইত্যাদির মাধ্যমে টাকা-পয়সা আয় করা, তাহলে তা ব্যবসায়িক পণ্য হিসেবে বিবেচিত হবে। আর তখন সেগুলো সায়েমা কিংবা মা’লুফাহ (যাকে ঘাস কেটে খাওয়ানো হয়) যা-ই হোক না কেন তাতে ব্যবসায়িক পণ্যের জাকাত আসবে; যদি তা এককভাবে নিসাব পরিমাণ হয় অথবা এসবের মূল্য অন্য ব্যবসায়িক সম্পদের সঙ্গে যুক্ত করলে নিসাব পরিমাণ হয়।

৩. স্বর্ণ-রৌপ্য
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর যারা সোনা ও রুপা জমা করে রাখে অথচ তা আল্লাহর নির্দেশিত পথে ব্যয় করে না (জাকাত দেয় না)। আপনি তাদের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সংবাদ প্রদান করুন। কেয়ামত দিবসে ওই সোনা-রুপাকে জাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত করে তা দ্বারা তাদের ললাট, পার্শ্ব ও পৃষ্ঠে সেকা দেয়া হবে এবং বলা হবে, এ হলো তোমাদের সেসব ধন-সম্পদ, যা তোমরা নিজেদের জন্য সঞ্চয় করে রাখতে। সুতরাং আজ জমা করে রাখার স্বাদ গ্রহণ করো।’ (সূরা তওবা : ৩৪-৩৫)।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যেসব সোনা-রুপার মালিকরা তাদের সম্পদ থেকে নির্ধারিত হক (জাকাত) আদায় না করে, কেয়ামত দিবসে তার জন্য কতগুলো আগুনের পাত প্রস্তুত করে তা জাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত করে তা দ্বারা ওই লোকদের ললাট ও পিঠে চেপে ধরা হবে। তাপ কমে গেলে উত্তপ্ত করে আবার চেপে ধরা হবে। ৫০ বছর দীর্ঘ সময় বান্দাদের হিসাব-নিকাশ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এভাবে শাস্তি চলতেই থাকবে।’ (মুসলিম : ৯৮৭)।

সোনা-রুপার যাবতীয় সামগ্রীতে জাকাত ফরজ। চাই তা হোক টাকা-পয়সা, চাকা বা টুকরা, পরিধেয় অলংকার বা ধার দেয়ার মতো অলংকার অথবা অন্য প্রকার সোনা-রুপা এসব কিছুর ওপর জাকাত ফরজ।

সোনার নিসাব ২০ দিনার। রাসুলুল্লাহ (সা.) সোনার ব্যাপারে বলেন, ‘(স্বর্ণের জাকাত হিসেবে) তোমার ওপর কিছুই ওয়াজিব হবে না যে পর্যন্ত তোমার কাছে ২০ দিনার পরিমাণ স্বর্ণ না হবে।’ (আবু দাউদ : ১৫৭৩)। দিনার বলতে ইসলামী দিনার উদ্দেশ্য, যার ওজন এক মিসকাল। এক মিসকাল সমান সোয়া চার গ্রাম। সে হিসাবে সোনার নিসাব হলো ৮৫ গ্রাম, যা এ দেশীয় মাপে ৭.৫ ভরি হয়।

রুপার নিসাব পাঁচ ওকিয়া। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘পাঁচ ওকিয়ার কম রুপার ওপর জাকাত নেই।’ (বোখারি : ১৪৫৯)। এক ওকিয়া সমান ৪০ ইসলামী দিরহাম। সে মতে রুপার হিসাব হলো ২০০ দিরহাম। আর এক দিরহাম হলো, এক মিসকালের সাত দশমাংশ। এর মোট ওজন ১৪০ মিসকাল, যার বর্তমান প্রচলিত ওজন হলো ৫৯৫ গ্রাম, যা এ দেশীয় মাপে ৫২.৫ ভরি। রৌপ্য ও স্বর্ণের জাকাতের পরিমাণ হচ্ছে, চার দশমাংশ বা ৪০ ভাগের এক ভাগ।

কাগজের তৈরি নোটের (টাকা) ওপরও জাকাত ফরজ। কারণ নোটগুলো রুপার বদলেই চলমান। সুতরাং এসব রুপার স্থলাভিষিক্ত হবে এবং এর মূল্যমান রুপার নিসাবের সমপরিমাণ হলে তাতে জাকাত ফরজ হবে। সোনা-রুপা ও কাগজের নোট ইত্যাদির ওপর সর্বাবস্থায় জাকাত ফরজ। চাই তা হাতে মজুদ থাকুক বা অন্য কারও জিম্মাদারিতে থাকুক। সোনা-রুপা ছাড়া অন্য সব খনিজপদার্থ যদিও তা আরও মূল্যবান হয়, তাতে জাকাত ফরজ নয়। তবে তা যদি ব্যবসার পণ্য হয়ে থাকে; তাহলে নিসাব পূর্ণ হলে অবশ্যই ব্যবসায়ীকে পণ্য হিসেবে জাকাত দিতে হবে।

৪. ব্যবসায়ী পণ্য
ব্যবসায়ী পণ্য বলতে বোঝায় এমন যাবতীয় বস্তু যা দ্বারা মুনাফা অর্জন কিংবা ব্যবসার উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে রাখা হয়েছে। যেমন, জমি, জীবজন্তু, খাবার, পানীয় ও গাড়ি ইত্যাদি সব ধরনের সম্পদ। সুতরাং বছরান্তে সেগুলোর মূল্য নির্ধারণ করে তার চার দশমাংশ বা ৪০ ভাগের এক ভাগ জাকাত দিতে হবে। চাই সেটার মূল্যমান ক্রয়মূল্যের সমপরিমাণ হয় অথবা কম হোক বা বেশি।

মুদি দোকানদার, মেশিনারি দোকানদার বা খুচরা যন্ত্রাংশ বিক্রেতা এবং এ জাতীয় ব্যবসায়ীদের কর্তব্য হলো, ছোট-বড় সব অংশের মূল্য নির্ধারণ করে নেবে, যাতে কোনো কিছু বাদ না পড়ে। পরিমাণ নির্ণয়ে যদি জটিলতা দেখা দেয়, তাহলে সতর্কতামূলক বেশি দাম ধরে জাকাত আদায় করবে, যাতে সে সম্পূর্ণভাবে দায়িত্বমুক্ত হতে পারে।

মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় বস্তু যথা খাবার, পানীয়, বিছানা, আসবাবপত্র, থাকার ঘর, বাহন, গাড়ি, পোশাকের (ব্যবহার্য সোনা-রুপা ছাড়া) ওপর জাকাত নেই। কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুসলিমের দাস-দাসী, ঘোড়ার ওপর জাকাত নেই।’ (বোখারি : ১৪৬৪, মুসলিম : ৯৮২)।

অনুরূপভাবে ভাড়া দেয়ার জন্য প্রস্তুতকৃত পণ্য যেমন জমিজমা, গাড়ি ইত্যাদির ওপর জাকাত আসবে না। তবে সেসব থেকে প্রাপ্ত অর্থের ওপর বছর পূর্তির পর সেটা দ্বারা এককভাবে নিসাব পূর্ণ হোক বা এ জাতীয় অন্য সম্পদের সঙ্গে মিশে নিসাব পূর্ণ হোক, তাতে জাকাত দেয়া ফরজ হবে।

 

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত