প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

প্রণোদনার অর্থ বিতরণে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি যেনো না হয়

দীপক চৌধুরী : করোনার সংকট কাটাতে সরকারের ঘোষিত ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থ সঠিকভাবে বরাদ্দ হওয়া দরকার। প্রকৃত ব্যবসায়ীরা ব্যাংক ঋণের সুদ মওকুফের পাশাপাশি হয়রানি ছাড়া যাতে উপকৃত হতে পারে এ ব্যাপারে কঠিন পদক্ষেপ নিতে হবে। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে দেশের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব উত্তরণে ৬৭ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর আগে তৈরি পোশাক খাতের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করেছিলেন তিনি। সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে প্রেস কনফারেন্সের মাধ্যমে এই কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেন।

বাংলাদেশের আর্থিক পরিস্থিতির ওপর করোনার প্রভাব পড়বেই এটা অনুমান করেই, এই অবস্থা থেকে উত্তরণে সহায়তার পদক্ষেপ হিসেবে তাৎক্ষণিক করণীয়, স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে সরকারি ব্যয়বৃদ্ধি ও কর্মসৃজনকে প্রাধান্য দেওয়ার কথা জানান। এর ফল নিম্নবিত্ত মানুষ পাবে বলে আশা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট আর্থিক সমস্যা কাটাতে প্রধানমন্ত্রী যে আর্থিক প্রণোদনা দিয়েছেন, সেটা খুবই প্রয়োজন ছিল। যেসব শিল্প ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের চলতি মূলধনের জন্য ৩০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এতে সুদের হার হবে ৯ শতাংশ। ব্যবসায়ী ও এর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের কেউ কেউ মনে করেন, সুদ সরকার অর্ধেক বহন করবে ও গ্রাহককে অর্ধেক দিতে হবে।

এতে সরকারের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদেরও উপকার হবে। সরকারের প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণ হবে পড়ে। যথারীতি নির্দিষ্ট সময়ের ভিতর প্রকৃত ব্যবসায়ীরা পুরো টাকা ফেরত দেবে। আমরা জানি, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা সাধারণ মানুষের কষ্ট বোঝেন। যেসব মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে, তাদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। গ্রামের এখনো ৩ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে আছে।

অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের জন্য যে ২০ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে, সেখানেও ৯ শতাংশ সুদ নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে সরকার দেবে ৫ শতাংশ ও বাকি ৪ শতাংশ গ্রাহককে দিতে হবে। ফলমূল, সবজি, অকৃষিসহ বিভিন্ন খাতকে এই প্যাকেজের মধ্যে আনতে হবে। এ জন্য এসএমই ফাউন্ডেশনকে সক্রিয় করতে হবে, যাতে সারা দেশের ছোট ছোট ব্যবসায়ীদের খুঁজে বের করে তাদের উন্নতির চেষ্টা তারা করতে পারে। অর্থমন্ত্রী আ হ ম বলেন, ঘোষিত প্যাকেজের সুফল পাওয়া যাবে। একসময় নিশ্চয়ই বিপদ কেটে যাবে। তবে সরকারকে চালকের আসনে বসতে হবে। প্রণোদনা যথাযথ ব্যবহার করতে হবে। যে প্রণোদনা দেওয়া হলো, তা আর্থিক। এতে বাজারে অনেক টাকা চলে যাবে। এ জন্য কৃষির উৎপাদন বাড়াতে হবে, তাতে মূল্যস্ফীতি লাগাম টেনে যাবে। আমরা যত দ্রুত কৃষি, মৎস্য, হস্ত, দুগ্ধশিল্পসহ বিভিন্ন দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে পারব, ততই ভালো। এতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেছেন, ‘করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত অর্থনৈতিক প্যাকেজে ভিক্ষুক থেকে শিল্পপতি, সবার জীবন ও জীবিকা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।’ কথাগুলো শুনতে ভাল শোনাচ্ছে। কিন্তু এটা নিশ্চিৎ করতে হবে যাতে ঋণ দেওয়ার সময় কোনো দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি না হয়। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বলেছে, বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ কমতে পারে। আমরা যদি জিডিপি ৭ থেকে সাড়ে ৭ শতাংশ অর্জন করতে পারি, তাহলেই আমরা ভারত-পাকিস্তানের থেকে এগিয়ে থাকব। এ জন্য দেশের পোলট্রি, দুগ্ধ, ফল-ফুল, মৎস্যখাতে যে অর্জন হয়েছে, তা বেগবান করতে হবে। আর প্রণোদনার টাকার যথাযথ ব্যবহার করতে হবে। আমি সুনামগঞ্জের মানুষ। এলাকার খবর নিই, কৃষকের ধানের খবর, হাওরের কবর। মানুষের চিন্তা, ভাবনা ও পরিকল্পনার কথা শুনি। একদিকে করোনাভাইরাসের আতঙ্ক অন্যদিকে মানুষের জীবন ধারণের অনিশ্চয়তা। এরমধ্যেও মানুষের নানারকম পরিকল্পনা থাকে।

আমাদের ইনফরমেশন টেকনোলজির কারণে এখন গ্রামে ঘরেঘরে টেলিভিশন, ডিসসংযোগ। বিদ্যুৎ তো আছেই। টেলিভিশনের খবর শুনে, ভিডিওকনফারেন্স শুনে সুনামগঞ্জের গ্রাম থেকে মৎস্যচাষী ও জেলেরা জানতে চায়, ‘স্যার, খবরে দেখলাম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তো প্রণোদনা দিয়েছেন। আমরা গরীব মানুষ। কিছু কি পাবো? বাঁচবো কীভাবে?’ কী জবাব দেবো আমি। আদৌ কী তারা পাবে! জানা নেই এর সঠিক উত্তর। তবে এটা তো সত্য, এদেশে মিঠা পানির মাছ দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠছে। এখন যা পাওয়া যাচ্ছে এরও প্রকৃত মূল্য পাওয়া থেকে মৎস্যচাষী ও জেলেরা বঞ্চিত। তাদের মুখ থেকে শুনলাম, সুনামগঞ্জের খাল, বিল, নদী থেকে আহরণ করা মাছ ‘জলের’ দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। বাজার হাটে মানুষ নেই, মাছবাজার ক্রেতাশূন্য। মাছের আড়ত বন্ধ। প্রকৃতদাম না পেলে মহাজনের টাকা পরিশোধ করবে কীভাবে! করোনাভাইরাসের আতঙ্কে উপজেলা ও গ্রামের মানুষ সবচেয়ে বেশি বিপদের মুখে। এই মওসুমে ‘ঘরে থাকা’ নির্দেশ পালন করায় ঋণ পরিশোধ করা অসম্ভব হবে। দিরাইয়ের মাছরাঙ্গা মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি রাধা বিশ্বাস জানালেন, ‘বঙ্গবন্ধুকন্যা দেশের প্রধানমন্ত্রী। জাতির পিতা শেখ মুজিবের মেয়ে তিনি। তিনি যদি আমাদের মতো অসহায় মৎস্যজীবীদের দিকে না তাকান তাহলে তো এবার না খেয়েই মারা যেতে হবে।’ বুঝতে পারি নিম্নবিত্তের ও অসহায় মানুষের ভরসার জায়গা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

লেখক : উপসম্পাদক, আমাদের অর্থনীতি, সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত