প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মিস ইনভয়েসিংয়ে সাত বছরে পাচার সাড়ে ৪ লাখ কোটি টাকা

ইসমাইল আলী: আমদানি-রপ্তানিতে মিস ইনভয়েসিং তথা মিথ্যা ঘোষণা বাড়ছেই। এতে দেশ থেকে পাচার হয়ে যাচ্ছে বড় অঙ্কের অর্থ। মাঝে মধ্যে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ এ ধরনের কিছু চালান আটক করলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। ফলে মিসইনভয়েসিংয়ের কারণে সাত বছরে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার ২৭৪ কোটি ডলার বা সাড়ে চার লাখ কোটি টাকা। শেয়ার বিজ নিউজ

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) ‘ট্রেড-রিলেটেড ইলিসিট ফিন্যান্সিয়াল ফ্লোস ইন ১৩৫ ডেভেলপিং কান্ট্রিজ: ২০০৮-২০১৭’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল প্রকাশিত এ প্রতিবেদনটিতে ১০ বছরে পাচার হওয়া অর্থের তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। তবে পর্যাপ্ত তথ্য না থাকায় কিছু দেশের অর্থ পাচারের পূর্ণাঙ্গা চিত্র প্রকাশ করা যায়নি। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাত বছরের অর্থ পাচারের তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থ পাচারের বিভিন্ন উপায় রয়েছে, যেমনÑমিসইনভয়েসিং, চোরাচালান, কর ফাঁকি ইত্যাদি। তবে এ প্রতিবেদনে শুধু মিসইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে অর্থ পাচার তুলে ধরা হয়েছে। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শ্রেণিকরণ (ক্লাসিফিকেশন) ব্যবস্থা অনুসরণ করা হয়েছে।

আমদানি/রপ্তানিতে মিসইনভয়েসিং চিহ্নিত করতে জিএফআই মূল্য ব্যবধান পদ্ধতি ব্যবহার করেছে। এ পদ্ধতিতে জাতিসংঘে জমা দেওয়া বিভিন্ন দেশের বাণিজ্য ডেটাবেজে আমদানি-রপ্তানির তথ্য ও তার সঙ্গে প্রকৃত অবস্থার ব্যবধান বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এরপর জিএফআই একটি দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে তার পার্টনার দেশের তথ্যের ব্যবধান তুলে এনেছে। এর মধ্যে অর্থ পাচারের পরিমাণ নির্ণয় করা হয়েছে।

প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২০০৮ সালে মিসইনভয়েসের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয় ৫২৮ কোটি ৫০ লাখ ডলার। পরের বছর তা কিছুটা কমে দাঁড়ায় ৪৮৯ কোটি ৯০ লাখ ডলার। তবে ২০১০ সালে তা বেড়ে হয় ৭০৮ কোটি ৭০ লাখ ডলার। ২০১১ সালে তা আরও বেড়ে দাঁড়ায় ৮০০ কোটি ৭০ লাখ ডলার। ২০১২ সালে তা কিছুটা কমে দাঁড়ায় ৭১২ কোটি ১০ লাখ ডলার। ২০১৩ সালে অর্থ পাচার আবার বেড়ে দাঁড়ায় ৮৮২ কোটি ৪০ লাখ ডলার।

পর্যাপ্ত তথ্য না থাকায় ২০১৪ সালে মিসইনভয়েসের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের হিসাব দেয়নি জিএফআই। তবে ২০১৫ সালে অর্থ পাচার ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। সে বছর রেকর্ড এক হাজার ১৫১ কোটি ৩০ লাখ ডলার পাচার হয়। এতে সাত বছরে পাচার হয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার ২৭৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার বা চার লাখ ৪৮ হাজার ২৩০ কোটি ৫০ লাখ টাকা, যার আকার বাংলাদেশের বাজেটের কাছাকাছি। এছাড়া তথ্যের অসম্পূর্ণতার কারণে ২০১৬ ও ২০১৭ সালে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের হিসাব দিতে পারেনি সংস্থাটি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৩৫টি উন্নয়নশীল দেশসহ বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে বাণিজ্য বিশ্লেষণ করে এ ফাঁকির চিত্র পাওয়া গেছে। এতে সাত বছরে বাংলাদেশ থেকে গড়ে পাচার হয়েছে ৭৫৩ কোটি ৩৩ লাখ ডলার বা ৬৪ হাজার ৩৩ কোটি পাঁচ লাখ টাকা। এ অর্থ দিয়ে দুটি পদ্মা সেতু নির্মাণ করা সম্ভব।

এদিকে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের শতাংশ হিসেবেও পাচারকৃত অর্থের পরিমাণ তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। এতে দেখা যায়, ২০০৮ সালে দেশের মোট আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের ১৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ অর্থ পাচার হয়। পরের বছর পাচার হয় মোট বাণিজ্যের ১৭ দশমিক ২০ শতাংশ, ২০১০ সালে ১৯ দশমিক ৩২ শতাংশ, ২০১১ সালে ১৭ দশমিক শূন্য চার শতাংশ, ২০১২ সালে ১৬ দশমিক ৩২ শতাংশ, ২০১৩ সালে ১৭ দশমিক ৯৭ শতাংশ ও ২০১৫ সালে ১৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ। আর প্রতি বছর গড়ে মোট বাণিজ্যের ১৭ দশমিক ৯৫ শতাংশ অর্থ পাচার হয়।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ এ প্রসঙ্গে শেয়ার বিজকে বলেন, দেশে বিনিয়োগ ও ব্যবসার পরিবেশ না থাকায় ব্যবসায়ীরা এ অর্থ পাচার করছেন। যদিও অর্থ পাচারের গন্তব্য পরিবর্তন হচ্ছে। সুইজারল্যান্ডের আইন এখন শক্ত হওয়ায় সেখানে অর্থ রাখতে গেলে প্রশ্ন করা হয়। এ কারণে দেশটিতে অর্থ পাচারে ধীরগতি এসেছে। তবে সম্প্রতি সুইজারল্যান্ডের ভূমিকায় সিঙ্গাপুরকে দেখা যাচ্ছে না। সেখানে অর্থ রাখতে গেলে প্রশ্ন করা হয় না। এছাড়া মালয়েশিয়া ও দুবাই তো বাংলাদেশিদের জন্য ‘সেকেন্ড হোম’ হিসেবে জনপ্রিয়। বর্তমানে এ দেশগুলোর মতো আরও সোর্স তৈরি হয়েছে।

অর্থ পাচারের রোধে আইনি কাঠামো জোরদার করা প্রয়োজন বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, সব ক্ষেত্রে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহিতা কঠোর করতে হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনবিআরকে আরও শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে হবে। ব্যবস্থা নিতে দেরি হলে এ ধরনের প্রবণতা আরও উৎসাহিত হবে। তাই দ্রুত আইনি ব্যবস্থাই এক্ষেত্রে কাম্য।

সর্বাধিক পঠিত