প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বইমেলা : পুলিশ আসলে কী কী নিরাপত্তা দেয়?

 

মারুফ রসূল : পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা তো নানা সময়ে নানা কিছু খতিয়ে দেখেন, আমরা বরং একটু খতিয়ে দেখার চেষ্টা করি অমর একুশে গ্রন্থমেলায় পুলিশ বাহিনীর ভূমিকাটি কেমন। বলছি না তাদের কোনো ভূমিকাই নেই, কিন্তু এই ভূমিকাটি ঠিক কেমন তার একটি আলোচনা দাঁড় করানোর চেষ্টা করি। যখন কেবল বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণেই গ্রন্থমেলা হতো তখনও পুলিশ বাহিনী বইমেলার নিরাপত্তার বিষয়ে কাজ করেছেন। এই নিরাপত্তা বিধান করাই তাদের দায়িত্ব। গত কয়েক বছরে বইমেলার বিস্তৃতি ঘটেছে অনেক। নতুন অনেক প্রকাশনী যুক্ত হয়েছে। সেইসঙ্গে যুক্ত হয়েছে পুলিশের তৎপরতাও। এখন বইমেলায় পুলিশের আচরণ দেখলে মনে হয় এ যেন ‘ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ’ কর্তৃক আয়োজিত একটি বইমেলা। যারা নিয়মিত বইমেলায় যান, বই-পত্তর দেখা বা কেনার পাশাপাশি এখানে-ওখানে দাঁড়িয়ে আড্ডা দেন কিংবা যারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুয়েকজন সদস্যের সঙ্গে কথাও বলেন, তারা জানেন এই আটাশ দিনব্যাপী আয়োজিত বইমেলা প্রসঙ্গে পুলিশ বাহিনীর অনেক সদস্যের অনেক ক্ষোভ। তারা যেন এটা মানতেই পারেন না যে আটাশ দিন ধরে বইমেলা চলতে হবে। ফলে বইমেলার প্রতি তাদের একধরনের বিতৃষ্ণাও কাজ করে।

প্রতিবছর বইমেলা শুরুর আগে বাংলা একাডেমি প্রশাসনের নানা ব্যস্ততার পাশাপাশি পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ব্যস্ততাও আমাদের চোখে পড়ে। এই নিরাপত্তা দেয়া হচ্ছে, ওই নিরাপত্তা দেয়া হচ্ছে ইত্যাদি নানা বিষয়ে তারা সাংবাদিক সম্মেলন করে থাকেন। কিন্তু পুলিশ আসলে কী কী নিরাপত্তা দেং? মেলায় প্রবেশের আগে নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য কতোগুলো আর্চওয়ে গেট লাগানো আছে। মানুষ ঢুকছেন আর মেশিনগুলো শব্দ করেই যাচ্ছে। তাহলে লাভ কী হলো। এখন প্রশ্ন হতে পারে এতো মানুষের সবাইকে কম সময়ে সঠিকভাবে তল্লাশি করে প্রবেশ করানো সম্ভব? সম্ভব নয় সম্ভবত কোনো গণসমাবেশেই এটা সম্ভব নয়। তাহলে এই জিনিসের উপযোগিতা কী? এই আর্চওয়ে গেট দিয়ে প্রবেশের পরও বাহিনীর সদস্যরা আমার পকেট হাতাচ্ছেন, গায়ে হাত দিচ্ছেন, ব্যাগ দেখছেন তাহলে এই আর্চওয়ের প্রয়োজন কী? তার মানে মেলায় প্রবেশের সময়ই আপনারা একটি লোক দেখানো নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেন। ভাব-সাব নেন, যেন অনেক কিছু করছেন আসলে লবডঙ্কা।

দ্বিতীয়ত, আজ পর্যন্ত বইমেলাতে যতোগুলো অপরাধ সংগঠিত হয়েছে, তার প্রত্যেকটিই ঘটেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গাফিলতির জন্য। ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের উপর মৌলবাদীদের হামলা পুলিশ তখন কোথায় ছিলো? ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায়কে মৌলীবাদী অপগোষ্ঠীর হত্যা এবং বিজ্ঞান লেখক ও গবেষক বন্যা আহমেদকে হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণের ঘটনা তো পুলিশের নাকের ডগায়। তাহলে পুলিশের কাজ কী? টিএসসি থেকে দোয়েল চত্বর পর্যন্ত নিরীহ বাদামওয়ালা ও চানাচুরওয়ালার উপর চোটপাট দেখানো? আমি যদি ভুল না করি, তবে ২০১৩ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি রাতে বইমেলায় আগুন লাগার ঘটনার পর থেকেই মেলা প্রাঙ্গণে সিগারেট নিয়ে প্রবেশের বিষয়ে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। সে সময় তো আগুন লেগেছিলো রাতে বইমেলা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর (কমেন্টে প্রথম আলো ও বাংলা নিউজের খবরের লিঙ্ক দেয়া হলো)। সে সময় তো মেলায় লেখক, পাঠক, প্রকাশক, দর্শনার্থী, আড্ডাবাজ, শিল্পী কেউ-ই উপস্থিত ছিলেন না। একমাত্র ছিলেন তারাই, যাদের হাতে নিরাপত্তার ভার। যারা রাতের বেলা মেলার নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্বে ছিলেন। তো সাধারণ মানুষের উপর চোটপাট দেখানো কেন? আবার ২০১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি পুলিশ ও বাংলা একাডেমি খুব গলাগলি করে ব-দ্বীপ প্রকাশনীর স্টল বন্ধ করে দিয়েছিলো এবং স্বত্বাধিকারী শামসুজ্জোহা মানিককে গ্রেপ্তার করেছিলো।

চলতি বছরের ২৩ জানুয়ারি আদালতের রায়ে গ্রেপ্তারকৃতরা খালাস পান। হায় রে অভিযোগ! হায় রে জীবনের অপচয়!
মেলার বিভিন্ন প্রকাশনী থেকে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বই বের হয়েছে। তো এ সব কর্মকর্তারা আসেন, বসেন, অটোগ্রাফ দেন, ছবি তোলেন। হোক সমস্যা নেই। পুলিশের চাকরি যারা করেন, তারাও অসামান্য লিখতে পারেন নিশ্চয়ই পারেন। কারও লেখার ক্ষমতা তো আর পেশাভিত্তিক নয়। কিন্তু মূল বিষয়টি হলো আচরণ। একেকজন পুলিশ কর্মকর্তাকে দেখি পাহারাদার নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রকাশনীর আশপাশের এলাকাকে পুরো গরম করে তোলেন। আরে ভাই আপনে অমুক জোনের এডিসি না ডিসি… সেই পরিচয় আপনে বাংলা একাডেমির মিটিংয়ে গিয়ে দেন না। আপনি সাধারণ মানুষের মতো মেলায় আসতে পারেন না? লেখকদের মতো আড্ডা দিতে পারেন না? কয়েকজন অধঃস্তন কর্মকর্তাদের আপনি পাহারাদারের মতো দাঁড় করিয়ে রাখেন। তাদের দিয়ে বই টানান, ছবি তোলান… আপনার লজ্জা লাগে না? বইমেলায় নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ বাহিনীর প্রায় প্রত্যেক সদস্যই অত্যন্ত বিরক্ত থাকেন। এটা তো বাণিজ্যমেলা না যে, মেলা শেষে দুয়েকটা বালতি-বদনা বাড়ি নিয়ে যেতে পারবেন। সুতরাং আমার ধারণা, প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসের জন্য আমরা যতোটা মুখিয়ে থাকি আমাদের পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা ততোটাই আতঙ্কে থাকেন। মেলা শেষ হলে আমাদের মন খারাপ হয় আর তারা তুমুল আনন্দে বাড়ি ফিরে যান।

শিল্পী চারু পিন্টুর উপর পুলিশি নির্যাতনের বিষয়ে ইতোমধ্যেই অনেকে প্রতিবাদ করছেন। আমি শুধু একটা ছোট্ট বিষয় তলিয়ে দেখতে চাই। লিটলম্যাগ প্রাঙ্গণে সিগারেট খেয়ে চারু পিন্টু যদি অপরাধ করে থাকেন, তাহলে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ কর্তব্যে অবহেলার কারণে তার চেয়েও বেশি অপরাধী। শিল্পী চারু পিন্টুকে তো আর সিগারেট না খাওয়ার জন্য বেতন দেওয়া হয় না, কিন্তু তল্লাশি করে সিগারেট আটকের মতো ফেলুদাগিরি করার জন্য তো পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের বেতন দেওয়া হচ্ছে। মেলায় প্রবেশের সবক’টি পথেই তো পুলিশের ভাষ্য মতে ‘বিরাট নিরাপত্তা’ দেওয়া হচ্ছে। তো ‘ক্যাচ মি ইফ ইউ ক্যান’ সিনেমার লিওনার্দ ডি ক্যাপ্রিও’র মতো শিল্পী চারু পিন্টু সিগারেট নিয়ে ঢুকলেন কী করে? অপরাধ তো প্রবেশ মুখে হয়েছে, দ- বিধান করলেন লিটল ম্যাগ চত্বরে। সিগারেট খাওয়ার অপরাধে শিল্পী চারু পিন্টুর কলার তো আপনারা চেপে ধরলেন, কিন্তু দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হওয়ায় আপনাদের … ধরবে কে? আমি মনে করি বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষের এই প্রশ্নটা পুলিশ কর্তৃপক্ষকে করা উচিত ছিলো। শিল্পী চারু পিন্টু সিগারেট নিয়ে ঢুকলেন কী করে। আপনারা তাহলে কী ছাতার মাথা তল্লাশি করেন? কিন্তু একাডেমি কর্তৃপক্ষের সেই প্রশ্ন তোলার হেডম নেই।

সম্পূরক প্রশ্ন : পুলিশ বাহিনীর ‘আইজাক আসিমভ’ খ্যাত ২০১৮ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত মোশতাক আহমেদ সাহেবের বইয়ের তেমন কোনো ব্যানার ফেস্টুন এবার চোখে পড়েনি। তিনি কি আর পুলিশের উচ্চপদে বহাল নেই? ফেসবুক থেকে

সর্বাধিক পঠিত