প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

উচ্চ আদালতের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা কার্যকরকরণ প্রসঙ্গে

অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ শফিকুর রহমান : বাংলাদেশের সংবিধানের ৩ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা হইবে বাংলা’। সংবিধানের এই বিধান যথার্থভাবে কার্যকর না হওয়ায় ১৯৮৭ সালের ৮ মার্চ, ‘বাংলাভাষা প্রচলন আইন’ কার্যকর করা হয়। এই আইনের ৩(১) ধারায় বলা হয়েছে, ‘এ আইন প্রবর্তনের পর বাংলাদেশের সর্বত্র তথা সরকারি অফিস-আদালত, আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিদেশিদের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যতীত অন্যান্য সব ক্ষেত্রে নথি ও চিঠি-পত্র, আইন আদালতের ছওয়াল-জওয়াব এবং অন্যান্য আইনানুগ কার্যাবলী অবশ্যই বাংলায় লিখতে হবে’। উপরন্তু আইনের ধারায় বলা হয়েছে, ‘৩(১) এ উল্লেখিত কোনো কর্মস্থলে যদি কোনো ব্যক্তি বাংলা ভাষা ব্যতীত অন্য কোনো ভাষায় আবেদন বা আপিল করেন, তাহা হইলে উহা বেআইনি ও অকার্যকর বলিয়া গণ্য হইবে’। তারপরও হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের রুল এবং দেওয়ানী ও ফৌজদারি কার্যবিধির দোহাই দিয়ে আদালত বাংলা ভাষা ব্যবহারকে ঐচ্ছিক বিষয়ে পরিণত করে ধারাবাহিকভাবে ভিনদেশি ভাষায় আবেদন-নিবেদন, আপিল, ডিক্রি ও রায় দিয়ে যাচ্ছে। এতে আইন ও আদালত জনবিচ্ছিন্ন হয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রে আস্থাহীনতার সুযোগ সৃষ্টি করছে। উল্লেখ্য, সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যায় স্পষ্ট করেই বলা আছে যে, ‘আদালত অর্থ সুপ্রিম কোর্টসহ যে কোনো আদালত’।

হাইকোর্ট বিভাগের রুলে ৪র্থ অধ্যায়ের ১নং বিধিতে বলা হয়েছে, হাইকোর্টে দাখিলকৃত দরখাস্তসমূহের ভাষা হবে ইংরেজি। তবে ৫ম অধ্যায়ের ৬৯নং বিধিতে বলা হয়েছে, হাইকোর্ট কর্তৃক প্রদত্ত আদেশ এবং ডিক্রি আদালতের ভাষায় প্রস্তুত করতে হবে। এখানে আদালত বিষয়টিকে অস্পষ্টতার চাদরে ঢেকে দিয়েছেন, যা সাধারণের বোধগম্য নয়। আদালত মনে করছে, রাষ্ট্রভাষার অর্থ হলো নির্বাহী বিভাগ, আইন বিভাগ ও নি¤œ আদালতে ব্যবহৃত ভাষা। মানে সরকারি কার্যক্রম যে ভাষায় চলবে, তা ‘সরকারি ভাষা’ আর আদালতের কার্যক্রম যে ভাষায় চলবে তা ‘আদালতের ভাষা’। এই দুটি পরিভাষার বিষয়টি বিশ্বের আর কোথাও আছে এমন নজির আমাদের জানা নেই। সেই সুবাদে আদালত দরখাস্তের ভাষার অনুরূপ ইংরেজি ভাষা ব্যবহারের সুবিধা লাভ করছে। একইভাবে দেওয়ানী কার্যবিধির ১৩৭ ধারায় আদালতের ভাষা নির্ধারণ করতে গিয়ে ১৩৭(৩) অনুচ্ছেদের উল্লেখ করা হয়েছে, ‘কোনো আদালতে সাক্ষ্য লিপিবদ্ধ করা ব্যতীত অন্য কিছু লিখিতভাবে সম্পাদন করার জন্য অত্র কোর্ট আদেশ যা অনুমোদন করে তা ইংরেজিতে লেখা যাবে’।

একইভাবে ১৩৮(১) ধারায় বলা হয়েছে, ‘হাইকোর্ট বিভাগ সরকারি গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে কোনো নির্দিষ্ট বিচারক বা তা না হলে বিজ্ঞপ্তিতে ঘোষিত কোনো শ্রেণির বিচারককে এ মর্মে আদেশ দিতে পারেন যে, যে সব মোকদ্দমায় আপিল চলে, সে সব মোকদ্দমার সাক্ষ্য ইংরেজি ভাষায় ও নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসারে লিপিবদ্ধ করতে হবে’। একইভাবে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৬৭(১) এ বলা হয়েছে, ‘সব রায় অত্র বিধির অন্য কোথাও আলাদাভাবে বিবৃত না হলে আদালতে বিচার পরিচালনাকারী কর্মকর্তা স্বহস্তে অথবা তার শ্রুতলিপিতে আদালতের ভাষায় অথবা ইংরেজিতে লিখতে হবে’। আশার কথা এই যে হাইকোর্টের রুলে বাংলা ভাষার কোনো উল্লেখ না থাকলেও সুপ্রিম কোর্টের রুলে আদেশ নং ১১(২) তে বলা হয়েছে, ‘এ আদালতের সম্মুখে পরিচালিত বিচার কার্যে বাংলা অথবা ইংরেজি ভাষা ব্যতীত অন্য কোনো ভাষায় কোনো দলিল প্রদর্শিত বা ব্যবহৃত হবে যতোক্ষণ পর্যন্ত তা এ বিধি অনুযায়ী অনূদিত না হয়’। এ সব রুল ও কার্যবিধি ১৯৮৭ সালের আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ার পরও আদালতে তা চ্যালেঞ্জ হয়নি। অথচ দেওয়ানী কার্যবিধির ১৩৭(২)-এ বলা হয়েছে, ‘আদালতের ভাষা কি হবে এবং কোন রীতিতে সে আদালতসমূহে আবেদনপত্রসমূহ এবং আদালতের কার্যবিবরণী লিখতে হবে তা ঘোষণা করার অধিকার সরকারের থাকবে’। ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৬৬(১) ধারায় বলা হয়েছে, ‘যে কোনো ফৌজদারি আদালতের বিচারিক রায় আদালতের ভাষায় অথবা অন্য কোনো ভাষায়Ñ যা আসামি অথবা তার আইনজীবী বুঝতে সক্ষম সে ভাষায় ঘোষণা অথবা উক্ত রায়ের বিষয়বস্তু লিপিবদ্ধ করতে হবে’। সুপ্রিম কোর্টের রায়েও বাংলা ভাষায় রায় দেওয়ার সুযোগ বিবৃত হয়েছে।
আজ স্বাধীনতার ৪৯ বছর পরও একজন ন্যায় বিচারপ্রার্থী মানুষ আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকে অসহায়ের মতো। যে ভাষায় বিচারকের সঙ্গে তার আইনজীবীরা কথা বলে সে তা বুঝতে অক্ষম। যে ভাষায় বিচারক রায় দিচ্ছেন সে তা-ও বুঝতে অক্ষম। তার প্রতি ন্যায়বিচার করা হলো কিনা সেটাও তাকে বুঝতে হচ্ছে তার আইনজীবীর দেহভঙ্গি দেখে বা তার কাছ থেকে শুনে। আপনি কি মনে করেন এটা ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? ঈষৎ সংক্ষেপিত। লেখক : চেয়ারম্যান, হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশন

সর্বাধিক পঠিত