প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুস্থ রাখার দায় আমাদের সবার

 

সুব্রত বিশ্বাস : মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধ এই কথা এখন কেবল পাঠ্যপুস্তক এবং আলোচনা সভাতেই শুনতে পাওয়া যায় বেশি। কিন্তু বাস্তব জীবনে আবেগের চেয়ে বেশি হয়ে উঠে মাতৃভাষার বদলে ইংরেজি ভাষায় শিক্ষাচর্চা। এর জন্য শুধু সরকারি নীতিকে দোষারোপ করে দায় এড়ানোর কোনো মানে হয় না। আমরাও সমান দোষী। অন্তত চিন্তা ও মননের দিক থেকে। আর সেই কারণে গত প্রায় দু’দশকে আমাদের এই পশ্চিমবঙ্গে এবং সেই অর্থে সমগ্রই মুড়ি-মুড়কির মতো বেড়েই চলেছে ইংরেজি মাধ্যম স্কুল। একটি বিষয় এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। সরকারি মাতৃভাষার বিদ্যালয়গুলোতে শিশুদের ব্যাগের ওজন বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের ব্যাগের ওজনের চেয়ে তুলনামূলকভাবে অনেক কম। শিক্ষার বাণিজ্যকরণ যতো বৃদ্ধি পাচ্ছে, ততোই ব্যাগের ওজন বেড়ে চলেছে। শিক্ষার বেসরকারিকরণ যতো দ্রুত হচ্ছে, ততো সরকার অনুমোদিত এবং পোষিত বিদ্যালয়গুলোর অবস্থান দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারি বিদ্যালয়গুলো এঁটে উঠতে পারছে না। অথচ অনেক বেশি বিজ্ঞানসম্মতভাবে সরকারি বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষাদান সম্ভব।

ব্যাগের বোঝা অন্তত বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের চেয়ে কম তো বটেই। অথচ আমরা তাও ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে কেন সন্তানদের নিয়ে যাচ্ছি, সে প্রশ্ন তো উঠেই। শৃঙ্খলা আর ইংরেজি শিক্ষার প্রতি ঝোঁক একটা বড় কারণ অবশ্যই। কিন্তু যেভাবে বেসরকারি স্কুল পড়ুয়াদের ঘাড়ে পাঠ্যপুস্তকের বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে, তা অবশ্যই অনেকাংশেই অমানুষিক। এটা ভাবা দরকার। তীব্র প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষা ব্যবস্থার কারণে হারিয়ে যাচ্ছে আজকের শৈশব, খেলাধুলা সব কিছুই। শুধুই প্রথম হওয়ার আকাক্সক্ষা। আর তাতেই ঘি ঢেলে যাচ্ছে অনেক বেসরকারি স্কুল। হয়তো শুধু তাদের দোষ দিয়েও লাভ নেই। কারণ আমরাও তো ঘোরগ্রস্তের মতো দৌড়চ্ছি সন্তানকে নিয়ে ওই সব স্কুলেই। নিজের সন্তান কী পরিমাণ চাপের মধ্যে থাকবে, তা জেনেও ছুটে চলেছি। দোষ তো আমাদেরও। অভিভাবকেরা একদিকে অতিরিক্ত সচেতন হতে গিয়ে প্রতিযোগিতার মুখে ফেলে দিচ্ছেন নিজেদের সন্তানদের। তাদের সুপ্ত আকাক্সক্ষার খেসারত দিতে হচ্ছে নবীন প্রজন্মকে।

তাই সন্তানকে বইয়ের ওজন বইতে দেখেও তা নিয়ে গর্জে উঠছেন না প্রায় কেউই। শৈশব হয়ে উঠছে যান্ত্রিক। ব্যাগের ভারে চাপা পড়ছে শৈশব। পিছন ফিরে দেখা : আমরা নিজেরা ছোটবেলায় কি এভাবে পড়াশোনা করেছি? আমরা তো খেলতাম, ঘুরতাম, আনন্দ করতাম। কিন্তু এখন কেন তেমন হয় না? এখন যেমন খেলার মাঠ নেই সেভাবে, তেমনই নেই অভিভাবকের উৎসাহও। শুধুই পড়া আর পড়া। আর তার কারণ যেন জীবনযুদ্ধে নিজের সন্তানকে দাঁড় করাতেই হবে। তবেই সেই সন্তান আর তার গর্বিত পিতা-মাতা সফল। কিন্তু এই তথাকথিত সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গে সন্তানের শারীরিক এবং মানসিক অবস্থা যে করুণ হয়ে উঠছে। তারা আত্মকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে। ব্যাগের বোঝা শিশুমনে প্রভাব ফেলছে, শারীরিক বাড়বৃদ্ধির ক্ষতি করছে। অতিরিক্ত ব্যাগের ওজন শিশুর ঘাড় এবং কাঁধের মাংসপেশীর ক্ষতি করছে। অতীতের শিক্ষা ব্যবস্থায় এভাবে শিশুদের শারীরিক ক্ষতি অন্তত হতো না। প্রতিযোগিতা আগেও ছিলো। কোথাও বেশি, কোথাও কম। কিন্তু তা এমন ভয়ঙ্কর স্তরের ছিলো না। প্রতিযোগিতার মোহে এমন সমাজবিস্মৃতি ছিলো না।

স্পষ্ট নীতি আর সদিচ্ছা : সময় এসেছে সিদ্ধান্ত নেওয়ার। সরকারকে স্পষ্ট নীতি এবং সদিচ্ছা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। স্কুলব্যাগের ওজন কমাতেই হবে। কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবে। তবেই হয়তো শিক্ষার যান্ত্রিকীকরণ আটকানো সম্ভব হবে। কারণ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুস্থ রাখার দায় আমাদের সবার। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত