প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ভালোবাসা বড্ড বেসামাল জিনিস, জীবন কেড়ে নেয় তবু এই পৃথিবীতে ভালোবাসার চাইতে সুন্দর আর কোনো কিছুর জন্ম হয়েছে কিনা আমার জানা নেই

অপরাজিতা নীল : ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারে আমাকে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হলো মগবাজারের ইস্পাহানী গার্লস কলেজে। সকালে এক মামা আরামবাগ থেকে আমাকে কলেজে দিয়ে বাসায় ফেরত যায়, আবার দুপুরে আমাকে এসে নিয়ে যায়। মা থাকে না ঢাকায়, আব্বার ব্যাচেলর টাইপে জীবনে আমি এক কঠিন উটকো ঝামেলা হয়ে দেখা দিলাম। এই ঝামেলার মাঝে আব্দুল মামা বলে যিনি বাসায় রান্না করতেন, তিনি সকালে রুটি আর আলু ভাজি করে দেয়, আমি তাই নিয়ে আসি টিফিনে। কিন্তু সেই টিফিন খেতে পারি না। টিফিন টাইমে হুট করে ২-৩ জন জুটে যায়, তারা এসে ভাগাভাগি করে খেয়ে ফেলে। আমি নির্বিকার থাকি। পড়ালেখা করার তেমন ইচ্ছা কাজ করে না। প্রেম করছি নাকি করছি না, এই ডিলেমায় থাকি সারাক্ষণ, প্রেমিকের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ তো দূরের কথা, মাসের পর মাস চলে যায়, কথাও হয় না। এর কয়েকমাস পর তথাকথিত ক্রাশ আরেকখান প্রেম শুরু করলো। আমার নিশি জাগা রোগ শুরু হলো। ক্লাসের পড়া কিছু মাথায় ঢুকে না। টিফিনের ঘণ্টাও মাথায় ঢুকে না।

এমন সময় একদিন টিফিন টাইমে একটা স্টিলের গোল ডাব্বা খুলে একটা মেয়ে আমার সামনে রুটি আর কী যেন খাবার বাড়িয়ে ধরে বললো, এখান থেকে একটা রুটি খাও, আরেকটা আমি খাবো। আর কাল থেকে আমার সঙ্গে বসবে। এই মেয়ের নাম রুমানা। রুমানা তার পরিচয় দিলো অনেকটা এভাবে। ‘আমার নাম রুমানা। আমার মায়োপিয়া আছে, লিভার সিরোসিসের ভাব আছে, রিউমেটিক ফিভার আছে, কিডনিতেও একটা সমস্যা আছে। সবাই তোমার টিফিন খেয়ে ফেলে, তুমি কিছু বলোনা কেন, এরপর তারা কেউ তোমার টিফিন খেয়ে ফেললে আমি তোমার সামনের দুটো দাঁত ভেঙে দিবো’। আমি সম্ভবত সুইসাইড করতাম, রুমানা আমাকে বাঁচিয়ে রাখলো। সেই রুমানা এখন কোথায় আমি জানি না।

ইউনিভার্সিটিতে মিললো সবুজ। পড়ে না, কাপড় ধোয় না, নখ কাটে না, কঠিন কিপ্টা, টাকা খরচ করে না, কিন্তু আমাকে পাখির বাচ্চার মতো আগলে রাখে। আমার চলমান বিরহে আমার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে, অনাহূত চাহনেওয়ালাদের গলার কাঁটা হয়ে বিঁধে থাকে। আমার ভাই, আমার বন্ধু সবুজকে দেখি না কতোদিন, মনে নেই। চাকরিতে ঢোকার পর জীবনে বহু ধরনের মানুষ দেখার সৌভাগ্য কিংবা দুর্ভাগ্য হয়েছে। অসুস্থ প্রতিযোগিতা, হিংসা, ক্রোধ, ক্ষমতার লড়াই মাঝে মাঝেই মনে হতো তল খুঁজে পাচ্ছি না। মানুষের দুই সত্তার মাঝে বড় বেসামাল অবস্থায় একদিন ছোটখাটো শান্ত একজন মহিলা এক পড়ন্ত বিকালে ডেকে বললো, ফারজানা তোমাকে চেনাটা বড্ড কঠিন, ভুল বোঝাটাই সবচাইতে সহজ। সেই মহিলা ইরশাত, আমার থেকে আজ কয়েক হাজার মাইল দূরে। ১৫ রোজার পর থেকে আমরা যেমন ছোটবেলায় উল্টো করে গুনতাম রোজাকে, জীবনের এই সময়টা বুঝি সে রকম। অনেকটা দেখে এসেছি, অর্ধেকেরও বেশি হয়তো অনাকাক্সিক্ষত ভালোবাসা পেয়েছি বিস্তর, কতোটা তার শোধ করতে পেরেছি, কতোটা পারিনি, সেটির হিসাব মেলাতে বসতে ইচ্ছা করে না। শুধু যারা হারিয়ে গেছে, যাদের স্মৃতিগুলো খোলা প্রান্তরে, কুমড়ার ফুলে, ধানের শিশিরে, গানে, তারিখে, ছবিতে, অভ্যস্ততায়, অনভ্যস্ততায় মনে পড়ে, তাদের জন্য হৃদ পোড়ে, মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে পরে খুব জানতে ইচ্ছা করে তারা ভালো আছে কিনা। ভালোবাসা বড্ড বেসামাল জিনিস, জীবন কেড়ে নেয়। তবু এই পৃথিবীতে ভালোবাসার চাইতে সুন্দর আর কোনো কিছুর জন্ম হয়েছে কিনা আমার জানা নেই। সবার ভালোবাসার মানুষেরা ভালো থাকুক দুধে-ভাতে, থাকুক বুকের মাঝে। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত