প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আমরা ফাঁকিবাজ হয়ে গেছি, হয়েছি ভীষণ রকম অসৎ

সালেহ্ বিপ্লব : অন্যদের কথা অন্যরা বলবেন, আমারটা আমি নিজে বলতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। আমার ক্ষেত্রে যেটা হয়েছে, সাংবাদিকতাকে দশটা-পাঁচটা কাজ বানিয়ে ফেলি মাঝে মাঝে। এটা ভীষণ রকম অন্যায়, মারাত্মক রকম অসততা, অসভ্যতা। এটা পাপ, এটা হারাম। বুঝি না যে, তা কিন্তু নয়। তবুও সপ্তায় দু’একদিন ঘণ্টা মেপে কাজ করি। কখনো শরীরে কুলোয় না বলে, কখনো মনে বাড়তি ভার থাকলে। নিরুপায় হয়ে করি, মর্মযতনায়ও ভুগি। ৪৯ কোনও বয়স না, এটা ঠিক। আবার এটাও ঠিক, শরীর ও মনের ওপর অত্যাচার যারা আমরা করি বা করে এসেছি, তাদের জীবনটা মাঝে মাঝেই যেনো মধ্যদুপুরে শীতবিকেলের রোদের মতো নেতিয়ে পড়া, অষ্টপ্রহর। সে কারণে, সত্যিকার কথা, ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে, অনেক সংকোচ বহন করে কর্মঘণ্টা কমিয়ে আনি। এটা একটা অপরাধ, সাংবাদিকতার সঙ্গে এটা যায় না। এমন আরও অপরাধ আমরা করে যাচ্ছি, যা পরবর্তী প্রজন্মের ক্ষতি করছে।

রিপোর্টার হিসেবে মাঝে মাঝেই অপরাধ করে ফেলি। সাংবাদিকতার একজন মধ্যবয়স্ক শিক্ষানবীশ আমি, পদবীতে নির্বাহী সম্পাদক। তবে মূল পরিচয়, আমি একজন রিপোর্টার। শুরুতে ছিলাম শিক্ষানবীশ রিপোর্টার, এরপর স্টাফ রিপোর্টার। তারপর অনেকগুলো ক্লাসে পড়েছি। ধাপ পার হয়েছি। শিক্ষানবীশ থেকে স্টাফ, স্টাফ থেকে সিনিয়র রিপোর্টার, এ্যাসিসট্যান্ট চিফ রিপোর্টার, চিফ রিপোর্টার, অ্যাসাইনমেন্ট এডিটর, জয়েন্ট নিউজ এডিটর, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, সিনিয়র নিউজ এডিটর, চিফ নিউজ এডিটর এবং এরপর এখন আমাদের নতুন সময়ের এক্সিকিউটিভ এডিটর। সামনে আরো ক্লাস বাকি। যতোক্লাসই বাকি থাক, আমার মূল পরিচয়, আমি রিপোর্টার। রিপোর্টারের কাজ সম্পর্কে বলি।

রিপোর্টারের প্রধান একটি কাজ হচ্ছে বানানে ভুল করা। রিপোর্টারের প্রধান কাজ হচ্ছে, বানানের দিকে নজর না দিয়ে তথ্যের দিকে পুরো মনোযোগ দেয়া। সবাই ভালো লিখতে পারেন না। কিন্তু আসলেই গুছিয়ে লিখতে পারেন না, এমন অনেক সহকর্মীও আমার আছেন, যারা রিপোর্টিং জগতে অনুসরণীয় হয়ে গেছেন অনেকেই। কীভাবে? তথ্য সংগ্রহের অসাধারণ দক্ষতাই তাদের বিখ্যাত করেছে। বানান টানান আগের জীবনে শেখা না থাকলে পরের জীবনে  সেটা কাভার করা সাধারণত কঠিন। আর সবার লেখার দক্ষতাও সমান হয় না। তবে বানানে দক্ষ হওয়ার কিন্তু একটা সহজ পথ আছে।

উদহারণ দেই প্রিয় বন্ধু এনামুল হক রূপমকে দিয়ে। অফিসে এলেন। কী নিয়ে এসেছেন, ব্রিফ করলেন। গাইডলাইন নিয়ে লিখতে বসে গেলেন। স্ক্রিপ্ট লিখা হলে প্রথমে একটা হার্ড কপি প্রিন্ট নিলেন, সফট ফাইল দিয়ে দিলেন সিস্টেমে। নিউজ এডিটর দেখলেন, ওকে করলেন। সেই এডিটেড ফাইলটার প্রিন্ট নিলেন। ডেস্কে গিয়ে বসলেন। এবার নিজের সাবমিট করা ফাইলটার সঙ্গে মেলালেন। বাক্যরীতিতে কী পরিবর্তন আনা হয়েছে, দেখে নিলেন। আর যে বানানগুলো ভুল হয়েছিলো, সেগুলো করলেন কী, মুখে উচ্চারণ করতে করতে সঠিক শব্দটি কলম দিয়ে কাগজে লিখলেন। বন্ধু এবং সহকর্মী হিসেবে আমি রূপমের এই গুণটায় মুগ্ধ। একটা বানান তিনি একবারই ভুল করতেন, আমার চ্যানেল আই লাইফে এটা দেখেছি। নতুন শব্দের বানান ভুল করতেন নিয়মিত, হয়তো এখনো করেন, কিন্তু একবারই করেন। বার্তা সম্পাদক বা আর কেউ ভুলটা ধরিয়ে দিলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে শিখে নেন। এটাই একজন রিপোর্টারের কর্তব্য।

আমি এই কর্তব্যটা মাঝে মাঝে পালন করি না। সহজ এবং প্রচলিত শব্দে বিদঘুটে ভুল করে সিনিয়রের কাছে স্ক্রিপ্ট সাবমিট করি। আমি শুধু নই, আমরা অনেকেই এই অন্যায়টা করি, এটা অপরাধ। কী লিখলাম আর কী ছাপা হলো, এটা মিলিয়ে দেখা একটা পবিত্র দায়িত্ব। জানি, বুঝি। অথচ মাঝে মাঝে আমি করি না। এটা দায়িত্বহীনতা, এটা নিন্দনীয়। এমন আরও আছে।

দুই যুগের কর্মজীবন। চোখের নাগালেই দেখছি, ইন্টার্নি করতে আসা ছেলেমেয়েরা অনুবাদ করছে মূল ফাইলটাকে ওয়ার্ডফাইলে পেস্ট করে। ভালো অনুবাদ করছে তাদের কেউ কেউ। কিন্তু বার্তা সম্পাদক হিসেবে আপনার কাছে ওই স্ক্রিপ্টটা পানসে লাগবে। অগ্রসর পাঠক হিসেবে  আলুনি লাগবে। কেনো? উত্তরে আমি বলবো, বিবিসি বা সিএএন বা যে কোন সাইট থেকে আপনি যখন কোন কনটেন্ট অনুবাদ করবেন, তখন কিছু নিয়ম মানতে হয়।

অনুবাদে হাত দেয়ার আগে কমপক্ষে দু’বার কনটেন্টটা পড়ে নিলে ভালো। এরপর এক লাইন এক লাইন করে পড়বেন, আর লিখবেন। আবার সাইটে যাবেন, আরেক লাইন পড়বেন, আবার লিখবেন। নিউজ কনটেন্টটা বার বার দেখা মানে, নিউজের সঙ্গে থাকা ছবিটা বারবার দেখা। বার বার সাইটে চোখ রাখা মানে নিউজটার ভেতরে ঢুকে গিয়ে নিজের ভাষায় আনার কাজটা স্মুথ করা। নিউজের যে একটা নিজস্ব গতি থাকে, জোশ থাকে, সেটা লেখায় প্রবাহিত করা। কপি করে ওয়ার্ড ফাইলে কনটেন্ট নিয়ে যদি অনুবাদ করেন, সেটা পত্রিকার জন্য আইটেম হবে বটে, কিন্তু খবরের মধ্যে যে দুর্দান্ত স্বাদ থাকে, তা হবে না। তো এক্ষেত্রে আমিও চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয় দেই কখনো।

চোখের নাগালেই দেখছি, সাংবাদিকতায় নতুন আসা ছেলে বা মেয়েটা ওই ভুল পথে অনুবাদ করছে। একটু তার পাশে গিয়ে আমি দাঁড়াই না। তাকে ভুলটা শুধরে দেই না। তাকে অনুবাদের বেসিক কৌশলগুলো নিজে যেচে শিখিয়ে দেই না। খুব অন্যায়, খুব অন্যায্য। তবুও করে ফেলি। করছি। আমরা পোড় খাওয়া, ঠেকে শেখা সংবাদকর্মীরা নতুন প্রজন্মকে দরদ দিয়ে শেখাচ্ছি না, অথচ আমাদের অগ্রজরা খুব নিষ্ঠার সঙ্গে আমাদের শিখিয়েছেন। এখনও শেখাচ্ছেন। কিন্তু আমরা তাদের মতো হইনি। হয়তো হতে চাইও না।

সর্বাধিক পঠিত