প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দেশে থেকে বিলুপ্ত ৩২ প্রজাতির অর্কিড

মাজহারুল ইসলাম : দুই’শ বছরেরও বেশি সময় আগে ‘হর্টাস বেঙ্গলেনসিস’ শিরোনামে একটি বই প্রকাশ করেছিলেন স্কটিশ উদ্ভিদতত্ত¡বিদ উইলিয়াম রোক্সবার্গ। কলকাতায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিভিন্ন বাগানে সংরক্ষিত কয়েক’শ ভেষজ উদ্ভিদের তথ্য ক্যাটালগ করা ছিলো ওই বইটিতে। এসব উদ্ভিদের মধ্যে একটি চট্টগ্রাম থেকে সংগৃহীত। সে সময় উদ্ভিদতত্ত¡বিদরা অর্কিডের প্রজাতিটিকে চিহ্নিত করেছিলেন cymbidium alatum নামে। বর্তমানে এটি পরিচিত theocostele alata হিসেবে। বণিক বার্তা

বাংলাদেশে এখন আর এ অর্কিড প্রজাতি খুঁজে পাওয়া যায় না। ১৮১৪ সালে রোক্সবার্গের নোটটির পর theocostele alata আর কারও চোখে পড়েছে কিনা, সে বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক কোনও তথ্য পাওয়া যায় না।

গত মাসে ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব ইকোলজিতে প্রকাশিত একটি গবেষণা নিবন্ধে বলা হয়, বাংলাদেশে উৎপত্তি হওয়া অর্কিডের প্রজাতিগুলোর মধ্যে ৩২টিকে এখন আর এখানে খুঁজে পাওয়া যায় না। যার অন্যতম হলো theocostele alata । বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত অর্কিডের প্রজাতি চিহ্নিত হয়েছে ১৮৭টি। সে হিসেবে এখানকার ১৭ শতাংশ অর্কিড এখন বিলুপ্ত। বাস্তুসংস্থানে অর্কিডের অনন্য অবস্থান এবং এর ভেষজ, উদ্যানতাত্তি¡ক ও সৌন্দর্যমূল্য বিবেচনায় নিয়ে এ ক্ষতিকে শঙ্কাজনক মনে করছেন গবেষকরা।
গবেষণা নিবন্ধের প্রধান লেখক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল হুদার মতে, যদি এ ধারা বজায় থাকে, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে আর অর্কিডের চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যাবে না।

অধ্যাপক কামরুল হুদা ও তার সহকর্মীরা বাংলাদেশ জুড়ে অর্কিডের বিদ্যমান প্রজাতি নিয়ে মাঠ পর্যায়ে গবেষণা চালিয়েছেন ২৩ বছর। ১৯৯৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত গবেষণায় ও আগেকার বিভিন্ন বর্ণনায় উঠে আসা অর্কিডেরও সন্ধান করেছেন তারা। বুনো পরিবেশে যেসব প্রজাতির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি, উদ্ভিদ সংগ্রহশালা এমনকি ব্যক্তিগত পর্যায়ের সংগ্রহেও খোঁজ করেছেন সেগুলোর। যদিও তাতে খুব একটা লাভ হয়নি।

অর্কিডের বিলুপ্ত আরেকটি প্রজাতি anaectochilus roxburghii। এর উপস্থিতি দেখা যেতো বনের ধারে স্যাঁতসেঁতে জলাভূমিতে। উদ্ভিদটি সর্বশেষ দেখা গেছে ১৮৩০ সালে সিলেটের কাছে। অর্কিডের প্রজাতিটি বিলুপ্ত হয়ে পড়ার পেছনে ওই অঞ্চলে ব্যাপক মাত্রায় বন ধ্বংসকে দায়ী করছেন অধ্যাপক কামরুল হুদা এবং তার সহকর্মী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ইশরাত জাহান।

নি¤œভূমিতে আরেক ধরনের অর্কিড জন্মাত habenaria viridifolia। ১৮৯০ সালের পর এটি আর চোখেই পড়েনি। এটির গায়েব হয়ে যাওয়ার পেছনে দায়ী করা হয়েছে আবাসস্থল ধ্বংস ও অতিমাত্রায় আহরণকে।
চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলের কাছাকাছি জন্মাত আরেক ধরনের উদ্ভিদ spathoglottis pubescens। বাংলাদেশে এটি সর্বশেষ চোখে পড়েছে ১৯৯৯ সালে। অধ্যাপক কামরুল হুদা ও তার সহকর্মীরাই সর্বশেষ এটিকে দেখেছিলেন। এর কিছুদিনের মধ্যেই প্রজাতিটির সর্বশেষ চিহ্নিত আবাসস্থলের চেহারাও বদলে যায় পুরোপুরি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের অনেক স্থানে অর্কিডের অনেক প্রজাতি এখন বিলুপ্তির মুখে। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী বিলুপ্তির শঙ্কায় থাকা দেড় হাজারেরও বেশি অর্কিড প্রজাতিকে লাল তালিকাভুক্ত করেছে আইইউসিএন।
বাংলাদেশে বিলুপ্ত অর্কিড প্রজাতিগুলোর অনেকগুলোর আবাসস্থল পুরোপুরি বিনষ্ট হয়ে পড়লেও এখনও কিছু প্রজাতি নিয়ে আশা করা যায়। এরপরও এগুলোর অনুসন্ধান চালিয়ে যাওয়াতেও খুব একটা ক্ষতির কিছু নেই।

অধ্যাপক কামরুল হুদা জানিয়েছেন, মাঠ পর্যায়ের অনুসন্ধানে ওই ৩২ প্রজাতিকে খুঁজে পেতে ব্যর্থ হলেও তার জন্য অনেক বিস্ময় অপেক্ষা করে ছিলো। তিনি বলেন, বেশকিছু অর্কিডের প্রজাতি পুনরাবিষ্কার করেছি, যেগুলোর কয়েকটি পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে গেছে বলে অন্য গবেষকরা ধারণা করেছিলেন।
এরমধ্যে একটি প্রজাতি acanthphippium sylhetense এর আগে বাংলাদেশে সর্বশেষ দেখা গিয়েছিলো ১৮৮০ বা ১৮৯০ সালে। যদিও অন্যান্য দেশে সফলভাবেই এটির চাষ করা হয়েছে। theocostele alata নামে শুরুতে উল্লিখিত অর্কিডটি, যেটিকে রোক্সবার্গই সর্বশেষ বাংলাদেশে দেখেছিলেন, সেটি মাঝেমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের অনলাইন বাজারে বিক্রি হতে দেখা যায়। সেক্ষেত্রে একেকটি ফুলের দাম ২৯ ডলার ৯৯ সেন্টও উঠে যায়।

বাংলাদেশে বিলুপ্ত হলেও এসব অর্কিডের বেশ কয়েকটি এখন সীমান্ত পেরিয়ে ঠাঁই খুঁজে নিয়েছে অন্যান্য দেশে। এর কোনও কোনোটি এখনও টিকে রয়েছে। এমনকি spathoglottis pubescens, বাংলাদেশে সর্বশেষ অধ্যাপক কামরুল হুদা যে প্রজাতিটি দেখেছিলেন, সেটি এখনো ভারত ও চীনে দেখতে পাওয়া যায়। তার মানে এই নয়, বাংলাদেশে বিলুপ্ত প্রজাতিগুলোর সবগুলোই অন্যান্য স্থানে টিকে রয়েছে।

অধ্যাপক কামরুল হুদা ও ইশরাত জাহান যে ৩২ প্রজাতিকে বাংলাদেশে বিলুপ্ত বলে চিহ্নিত করেছেন, তার মধ্যে মাত্র ৪টিকে পর্যালোচনা করেছে আইইউসিএন। এর মধ্যে ঢ়ড়ফড়পযরষঁং শযধংরধহঁং নামে একটি প্রজাতি লাল তালিকায় চিহ্নিত হয়েছে ‘লিস্ট কনসার্ন’ (সবচেয়ে কম উদ্বেগজনক) হিসেবে। যদিও তালিকার সঙ্গে সংযুক্ত নোটে উল্লেখ করা হয়েছে, এটি এরই মধ্যে ৪টি দেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আরেকটি দেশে এর উপস্থিতি অনিশ্চিত। paphiopedilum venustum ও p. insign হ নামের আরও ২ট প্রজাতি চিহ্নিত হয়েছে ‘বিপন্ন’ হিসেবে। এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে বেচাকেনার জন্য নির্বিচারে সংগ্রহের কথা।

gastrochilus calceolaris নামে আরেকটি প্রজাতি আশঙ্কাজনকভাবে বিপন্ন হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছে। এর কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে মাত্রা ছাড়া কেনাবেচা ও আবাসস্থল কমে যাওয়া। ২০০৪ সালের পর এ পর্যালোচনা আর হালনাগাদ করা হয়নি।

বাংলাদেশে বিলুপ্ত ৩২ প্রজাতির অর্কিডকে পৃথিবীর বুকে টিকিয়ে রাখতে হলে অন্যান্য দেশেরও এগুলোকে নিয়ে অনুসন্ধান চালানো উচিত বলে মনে করছেন অধ্যাপক কামরুল হুদা। একই সঙ্গে ওইসব দেশের নিজ নিজ সীমানার মধ্যে অর্কিডের বিদ্যমান অন্যান্য প্রজাতি রক্ষায়ও উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, সুন্দর ও মূল্যবান এসব প্রজাতিকে রক্ষা করতে হলে সংরক্ষণকর্মী ও রাজনৈতিক নেতাদের বৈশ্বিক পর্যায়ে অনতিবিলম্বে কার্যকর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।

বর্তমানে অধ্যাপক কামরুল হুদা ও তার সহকর্মীরা বাংলাদেশে বিদ্যমান অর্কিডের ১৫৫ প্রজাতি নিয়ে পর্যালোচনা করছেন। এসব প্রজাতির যথাযথ সংরক্ষণ পরিস্থিতি নিরূপণের পাশাপাশি দেশে জীববৈচিত্রের ক্ষতি ঠেকাতে কার্যকর সুপারিশ উপস্থাপন করতে পারবেন।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত