প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আজহারীর বিষয়টা সাঈদীর সেই ঘটনারই হুবহু কপি, বছর কয়েক আগে আজহারীকে প্লেস করা হয় সাঈদীর মতোই একদম দলনিরপেক্ষ ইসলামী বক্তা হিসেবে

 

আরিফ জেবতিক : আশির দশকের শুরুতে জামায়াত সাঈদীকে বাজারে আনে একদম ‘নির্দলীয় নিরপেক্ষ হক্কানী আলেম’ হিসেবে। দেশব্যাপী সাঈদীর তাফসিরুল কোরআন মাহফিলগুলো আয়োজিত হতো ‘ইসলামী সমাজকল্যাণ পরিষদ’ বা এই ধরনের একাধিক জামায়াতি ছদ্ম সংগঠনের ব্যানারে। সাঈদীকে আলোচনায় আনার জন্য জামায়াত ব্যাপক বিনিয়োগ করে। সবচাইতে বড় মাঠ, সবচাইতে রঙচঙের শামিয়ানা, দিনের পর দিন মাইকিং-পোস্টার, দলীয় লোকজনকে দিয়ে মাঠ ভরিয়ে ফেলাÑ এভাবে প্রথমে সাঈদীকে সমসাময়িক অন্য আলেমদের তুলনায় ‘বড় আলেম’ হিসেবে প্রচার করা শুরু করে জামায়াত। সাঈদীর সেই প্রতিভা ছিলো যে এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে সে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। সারা বাংলাদেশে হৈচৈ পড়ে যায়। সাঈদীর ওয়াজের ক্যাসেট হাজার হাজারে, লাখে লাখে বিক্রি হতে থাকে। সাঈদী ওয়াজ করে একচেটিয়া জনপ্রিয়তা দখল করার পনেরো বছর পরে হঠাৎ একদিন আবিষ্কৃত হয় যে সাঈদী শুরু থেকেই জামায়াতের সদস্য এবং সিনিয়ার নেতা। সাঈদী সরাসরি নির্বাচনে আসে এবং এমপি নির্বাচিত হয়। আজহারীর বিষয়টা সাঈদীর সেই ঘটনারই হুবহু কপি।

বছর কয়েক আগে আজহারীকে প্লেস করা হয় সাঈদীর মতোই একদম দলনিরপেক্ষ ইসলামী বক্তা হিসেবে। সময়ের চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে আজহারী যে ওয়াজ করেন, সেটি জনপ্রিয় হতে বাধ্য। এই শতাব্দীর হাওয়া হচ্ছে ‘মডারেট ইসলাম’। বাঙালি মুসলিম এখন ধর্মেও আছে, জিরাফেও আছে। হিন্দি সিনেমা বুঁদ হয়ে দেখে, কথার খেলাপ করে, আমানতের খেয়ানত করে, অন্যের মেয়েকে দেখলে পেছনে শিস দেয়Ñ আবার নিজের বউকেও কিছুটা পর্দা-কিছুটা না পর্দার মধ্যে রেখে এই ‘মডারেট ইসলাম’ জিনিসটা চালু করেছে তারা। আজহারী ফোকাস করেছেন এই মধ্যপন্থার ইসলামকে। একইভাবে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তার স্মার্ট বাচনভঙ্গি, সুন্দর চেহারা, রুচিশীল পোশাক-আশাক, সুন্দর শব্দচয়ন, সঙ্গে শুদ্ধ ইংরেজির ব্যবহার তাকে একজন স্মার্ট ও আধুনিক হুজুর হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এ রকম হুজুরই বাঙালি মধ্যবিত্তের আকাক্সক্ষা। সুতরাং সারাদেশে জামায়াতিদের নিজস্ব নেটওয়ার্কে আবার সেই একই ধরনের ‘ইসলামী সমাজ কল্যাণ সংস্থা’ জাতীয় ছদ্মবেশী সংগঠন, নিজস্ব লোকবল সাপ্লাই, ঝাঁকানাকা আয়োজন, হুলস্থুল প্রচারের সাপোর্টে আজহারী এখন বাকি ওয়াজিয়ানদের অনেক পেছনে ফেলে একেবারে তুঙ্গে অবস্থান করছেন। তার মাহফিলে থানার বড় দারোগা থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগের মন্ত্রী পর্যন্ত থাকে। এখন ক্যাসেটের যুগ নেই, তবে আমার ধারণা তার ইউটিউব ওয়াজ এখন বাংলাদেশের সর্বাধিক দর্শককে আকর্ষণ করছে এবং তার ধারেকাছেও কেউ নেই।

মুশকিল হচ্ছে জামায়াত সাঈদীর ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় নিতে পারলেও আজহারীর ক্ষেত্রে সেই ধৈর্য রাখার উপায় তাদের নেই। গত এক দশকের প্রতিকূল পরিবেশে এই যুদ্ধাপরাধী সংগঠনটিকে দ্রুতই কোনো না কোনোভাবে ফিরে আসতে হবে। তাই আজহারীকে তারা সাঈদীর সমান সময় দিতে পারেনি। এজন্যই আজহারীকে ওয়াজে বলতে হয়েছে, ‘সিংহের ( মানে সাঈদীর) বাচ্চারা সব সিংহই হবে এবং সময়মতো সিংহের গর্জনে সব কিছু কেঁপে কেঁপে উঠবে’। আবার বলতে হয়েছে, ‘ঘরে ঘরে সাঈদী দাও’। বলতে হয়েছে কোরআনের আলোচনা করার জন্যই সাঈদীকে জেলে পুরা হয়েছে। আজহারী সময়ের আগে পেকে যাওয়ায় সেটা ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর রাডারে ধরা পড়েছে। তিনি বলেছেন, ‘আজহারী মাজহারীরা জামায়াতি’।

ধর্মমন্ত্রীর এই উক্তি গুরুত্বপূর্ণ। এই উক্তির কারণে এখন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা গিয়ে স্টেজে বসে মাথা দুলানোর আগে খানিকটা চিন্তা করবেন। থানার বড় দারোগা এখন আজহারীর হাতে চুমা দেওয়ার আগে চিন্তায় পড়বেন। একইভাবে কওমী মাদ্রাসাকেন্দ্রিক হুজুররা তাদের ওয়াজ ব্যবসায় ধস পড়ার কারণে বেশ কিছু জায়গায় আজহারীকে প্রতিহত করার চেষ্টা করেছেন এবং কোথাও কোথাও প্রশাসনের সহায়তায় মাহফিল বন্ধও করে দিতে পেরেছেন। এই দলটা এখন আরেকটু জোর পাবে। সব মিলিয়ে আজহারী এখন একটু সমস্যায়ই পড়ছেন বলে মনে হচ্ছে। ওয়াজ হচ্ছে কোটি কোটি টাকার একটি ইন্ডাস্ট্রি, সাধারণ হুজুররা লাখ লাখ টাকা ইনকাম করেন। স্টার হুজুররা সিজনে মাসে কোটি টাকার উপরে আয় করে থাকেন। এই আয় ট্যাক্স ফ্রি। সুতরাং এখানে ঝুঁকি তৈরি হলে আজহারীকে আবারও একটু ধীরে চলো নীতিতে আগাতে হবে। তাই এখন তাকে বলতে হচ্ছে যে তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য নন। আমার ধারণা এই ওয়াজ সিজনে ( মানে মার্চ মাস পর্যন্ত) তিনি আর সাঈদীকে সিংহ কিংবা বিলাই কিছুই আর বলবেন না। একদম ‘মধ্যপন্থার ইসলাম’ নিয়ে ওয়াজ করে যাবেন। অন্যদিকে তার দলের লোকজন হয়তো তাকে দিয়ে আবার ‘সিংহ মামার ওয়াজ’ করানোর চাপ দিতে পারে। এই দ্বৈরথে আজহারীর ওয়াজের গতিপথ টাকার দিকে যায় নাকি রাজনীতির দিকে যায়, সেটাই দেখার বিষয়। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত