প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সিটি নির্বাচনে জয়-পরাজয়ে ৭ ফ্যাক্টর

যুগান্তর : ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি নির্বাচনে জয়লাভে মরিয়া আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। চলছে শেষমুহূর্তের কর্মকৌশল। রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি নগরবাসীর মুখে মুখে প্রশ্ন- কারা হচ্ছেন দুই সিটির নতুন মেয়র। চায়ের দোকান, রাস্তাঘাট, বাসাবাড়ি ও রাজনীতির অন্দরমহলেও চলছে একই আলোচনা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকসহ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মেয়রদের ভাগ্য নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে অন্তত সাত ফ্যাক্টর। এর মধ্যে রয়েছে- তরুণ, বস্তিবাসী, নারী, আঞ্চলিকতা, সনাতন ধর্মাবলম্বী, শ্রমিক ও নীরব ভোটার। এ ছাড়া এলাকাভিত্তিক নানা সমীকরণও ভোটের ফলে প্রভাব রাখতে পারে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বস্তিবাসী, সনাতন ধর্মাবলম্বী ও আঞ্চলিক ভোট যারা টানতে পারবেন, তারাই এগিয়ে থাকবেন। এর বাইরে জয়-পরাজয়ে অন্যতম ফ্যাক্টর হবে তরুণ ভোটাররা। এরা যেদিকে ঝুঁকবেন, জয়ের পাল্লা সেদিকেই ভারি হতে পারে। কারণ মোট ভোটারের অর্ধেকের বেশি তরুণ। নারী ভোটাররাও হতে পারেন ফ্যাক্টর। শ্রমিকরা বরাবরই অধিকারবঞ্চিত। তাই তাদের ভোটও কোন দিকে যাবে সেটা গুরুত্বপূর্ণ। রাজনীতির বাইরে বড় একটি অংশ নীরব ভোটার। তারা সবকিছু বিবেচনা করে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন।

এসব নীরব ভোটার যেদিকে ভোট দেবেন জয়ের পাল্লা সেদিকেই ভারি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। জয়-পরাজয়ে এসব ফ্যাক্টর সামনে নিয়ে গণসংযোগ চালাচ্ছেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মেয়র প্রার্থীরা। তাদের ইশতেহারেও এসব ভোটারকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছেন। দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি।

নির্বাচন বিশ্লেষকরা বলছেন, ভোটারদের কেন্দ্রমুখী করাই বড় চ্যালেঞ্জ। আগের নির্বাচনগুলোর অভিজ্ঞতা থেকেই এটি নিয়ে ভাবতে হবে। তরুণদের মধ্যে ভোটদানের আগ্রহ কম। এ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন দুই দলের প্রার্থীরা। তাই ভোটারদের কেন্দ্রমুখী করতে নেয়া হচ্ছে নানা উদ্যোগ। ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে প্রার্থীরা বারবার আহ্বান জানাচ্ছেন।

জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মুজমদার যুগান্তরকে বলেন, দু’দলের মেয়র প্রার্থী শিক্ষিত তরুণ। তাদের ইমেজ ভালো। এ অবস্থায় তাদের জয়-পরাজয়ে প্রধান ফ্যাক্টর দলীয় ইমেজ। পাশাপাশি তরুণ ও নারী, বস্তিবাসীসহ দরিদ্র শ্রেণির ভোটারও ফল নির্ধারণে ভূমিকা রাখেন।

তবে সবকিছু নির্ভর করবে ভোটারদের কেন্দ্রমুখী হওয়ার ওপর। কারণ, সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন হলেই শুধু জয়-পরাজয়ে এসব ফ্যাক্টর কাজে লাগবে। তাই ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে আস্থার পরিবেশ নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে দুই সিটিতে ভোটার ৫৪ লাখ ৬৩ হাজার ৪৬৭ জন। এবারের সিটি নির্বাচনে জয়-পরাজয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন তরুণ ও নারী ভোটাররা। ২০১৫ সালের তুলনায় চলতি বছর দুই সিটিতে নতুন যুক্ত হয়েছে ১২ লাখ ৪৭ হাজার ভোটার; এদের বেশিরভাগই তরুণ। এ সময়ে দুই সিটিতে যুক্ত হয়েছে ১৮টি করে ৩৬টি ওয়ার্ড। সেসব ওয়ার্ডের বাসিন্দারাও জয়-পরাজয়ের অন্যতম নিয়ামক। এ ছাড়া দুই সিটির মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেকই নারী। তাদের সংখ্যা ২৬ লাখ ২০ হাজারের বেশি।

ইসি সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল ঢাকার দুই সিটিতে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই সময়ে দুই সিটিতে ভোটার ছিল ৪২ লাখ ১৬ হাজার ১২৭ জন। ওই সময়ে ঢাকা উত্তরে ৩৬টি ও ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে ৫৭টি ওয়ার্ড ছিল। পাঁচ বছর পর এবার দুই সিটিতে ভোটার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৪ লাখ ৬৩ হাজার ৪৬৭ জন।

এ সময়ের ব্যবধানে ঢাকা উত্তর সিটিতে ১৮টি ওয়ার্ড বেড়ে ৫৪টি ও দক্ষিণ সিটিতে ৫৭টি থেকে বেড়ে ৭৫টি ওয়ার্ডে পরিণত হয়েছে। সম্প্রসারিত ১৮টি ওয়ার্ড ও নতুন ভোটার মিলিয়ে দুই সিটিতে যুক্ত হয়েছে ১২ লাখ ৪৭ হাজার ৩৪০ জন ভোটার। এদের বেশিরভাগই তরুণ। মেয়র নির্বাচনে জয়-পরাজয়ে তারাও অন্যতম নিয়ামক হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।

দুই সিটিতে জয়-পরাজয়ে নারী ভোটাররাও অন্যতম প্রধান ফ্যাক্টর। ঢাকা উত্তর সিটিতে মোট ভোটার রয়েছেন ৩০ লাখ ১০ হাজার ২৭৩ জন। এর মধ্যে নারী ভোটারই ১৪ লাখ ৬০ হাজার ৭০৬ জন। আর পুরুষ ভোটার ১৫ লাখ ৪৯ হাজার ৫৬৭ জন। অপরদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে ভোটার রয়েছেন ২৪ লাখ ৫৩ হাজার ১৯৪ জন; যাদের মধ্যে নারী ভোটার ১১ লাখ ৫৯ হাজার ৭৫৩ জন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দুই সিটিতে প্রায় ৪০ লাখ তরুণ ও নারী ভোটারের চাওয়া-পাওয়ার হিসাব-নিকাশ যে ভোটের ক্ষেত্রে বড় প্রভাব রাখবে, তা আমলে নিয়ে নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন প্রার্থীরা। তরুণদের প্রত্যাশাগুলো স্থান পেয়েছে দুই সিটির মেয়র প্রার্থীদের ইশতেহারেও। তাদের কাছে টানতে ডিজিটাল চমক দেখানোর কাজও করছে দুই দল। শিক্ষিত তরুণ যুবকদের কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন তারা। নারীদের জন্য নিরাপদ ঢাকা গড়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন দু’দলের মেয়র প্রার্থীরা।

দুই সিটির, বিশেষ করে, দক্ষিণে জয়ের ক্ষেত্রে হিন্দু ভোটাররা অন্যতম ফ্যাক্টর হতে পারেন। জানা গেছে, ঢাকা দক্ষিণের পুরান ঢাকায় হিন্দু ভোটার বেশি। শুধু সূত্রাপুর থানায় হিন্দু ভোটার আছেন ৮০ হাজারের বেশি। এর বাইরে রায়েরবাজার, লক্ষ্মীবাজার, শাঁখারিবাজার, গেণ্ডারিয়া, ফরিদাবাদ, চানখাঁরপুল, অভয়দাস লেন, বংশাল, জজকোর্টের পেছনের এলাকাসহ সব মিলিয়ে প্রায় ৪ লাখের মতো হিন্দু ভোটার আছেন।

তাদের কাছে প্রয়াত সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকা জনপ্রিয় ছিলেন। বাবার প্রতি সহানুভূতি কাজে লাগিয়ে এ ভোট পেতে চাচ্ছেন দক্ষিণে বিএনপির প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন। এ সিটিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসের বাবা শহীদ শেখ ফজলুল হক মণির সঙ্গে পুরান ঢাকার অনেক স্মৃতি জড়িত। এ ছাড়া নৌকার পক্ষের নেতাকর্মীরা মনে করেন, হিন্দু ভোটারদের সমর্থন তাদের দিকেই থাকবে। পুরান ঢাকার ভোটারদের আকৃষ্ট করতে দক্ষিণের দুই মেয়রই নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। পুরান ঢাকার ঐতিহ্য ধরে রেখে আধুনিক ঢাকা গড়ার আশ্বাস দিচ্ছেন তারা।

ঢাকার দুই সিটি রয়েছে অসংখ্য বস্তি। উত্তর সিটির বনানীর কড়াইল বেগুনবাড়ি, তেজগাঁও, মিরপুরের চলন্তিকা, মহাখালী সাততলা বস্তি, মধুবাগ, মগবাজারের রেললাইন এলাকায়ও বস্তি রয়েছে। এ ছাড়া দক্ষিণ সিটির কমলাপুর, গোলাপবাগ, মানিকনগর, কামরাঙ্গীরচর, রায়েরবাজারসহ কয়েকটি এলাকায় বস্তিবাসী ভোটার রয়েছেন। সব মিলিয়ে দুই সিটিতে প্রায় কয়েক লাখ বস্তিবাসী ভোটার রয়েছেন। এই ভোটাররা কোনদিকে ঝোঁকেন সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাদের ভোট টানতে প্রার্থীরাও বসে নেই। পুনর্বাসন ছাড়া বস্তিবাসীদের উচ্ছেদ করা হবে না-সহ নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন তারা।

ভোটের ক্ষেত্রে আঞ্চলিকতাও একটা ফ্যাক্টর হতে পারে। উত্তরে ভোটারদের বড় একটি অংশ বৃহত্তর নোয়াখালী ও কুমিল্লার। এ সিটির আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী আতিকুল ইসলামের পৈতৃক বাড়ি কুমিল্লায়। বিএনপির মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়ালের বাড়ি ফেনী। তারা দু’জনেই চাচ্ছেন এলাকার মানুষের ভোট তাদের পক্ষে নিতে। ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও ভাসমান ভোটাররাও ফ্যাক্টর হতে পারে মেয়রদের জয়-পরাজয়ে। তাদের আকৃষ্ট করতে তাই প্রার্থীরাও দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি। নির্বাচিত হলে ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য হলিডে মার্কেটসহ তাদের পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন প্রার্থীরা।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত