প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নদীই আমাদের ঘর, মৃতপ্রায় নদীগুলো নিয়ে বাংলাদেশের মাঝিদের কান্না

দখল, দূষণ, বালু উত্তোলন আর উন্নয়নের নামে অবকাঠামো নির্মাণে বাংলাদেশের নদ-নদীর মৃতপ্রায় অবস্থা আজ সকলেরই জানা। এর ফলে সবচেয়ে ক্ষতির শিকার নদীজীবী জেলে ও মাঝি সম্প্রদায়ের মানুষেরা। সম্প্রতি বাংলাদেশের নদীগুলোর ক্রমশ বিলীন হয়ে যাওয়া এবং তার সঙ্গে জড়িত মানুষদের আকুতি স্থান পেয়েছে বিখ্যাত ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ানে। ঐ প্রতিবেদনের ভাবানুবাদি জবানিতেই তুলে ধরার প্রয়াস আলোচ্য প্রতিবেদন।

নূর মাজিদ: বয়স ঠিক মনে নেই তবে হাত দিয়ে নিজের কোমর বরাবর উচ্চতা নির্দেশ করলেন মুসানা রবি দাস। এই এত্তটুকু বয়স থেকেই বাবার সঙ্গে মাঝির পেশা বেছে নেন তিনি। নদীকেই বেছে নেন জীবিকার উৎস প্রতিক রূপে। শিশুকালে তিনি বাবার সঙ্গে স্থানীয় গ্রামবাসীদের নৌকায় করে পারাপার করাতেন। আর এখন ৫০ বছর বয়সে এসে মাঝির পেশা বাধ্য হয়েই ছাড়তে হয়েছে। এখন গ্রামের এক ছোট্ট বাজারে টিমটিমে কেরোসিনের কুপির আধো-আলো অন্ধকারে জুতা সেলাইয়ের কাজ করেন রবি দাস। তবু অবসর সময়ে নদীর কাছে ছুটে যান। দীর্ঘদিন ধরে বসে বসে লক্ষ্য করেছেন তিনি স্রোতহারা মৃতপ্রায় নদীকে। সেখানে বসেই তার সঙ্গে আলাপ চলে গার্ডিয়ান প্রতিনিধির।

রবি দাস বলেন, ‘এখন বর্ষাছাড়া বছরের পুরোটা জুড়েই নদীর পানি এতো কম থাকে, যে তখন পারাপারের জন্য কারো নৌকার প্রয়োজন হয় না। একারণেই আমি বেকার হয়ে পড়েছি। তাই গত এক দশক থেকে মুচির কাজ করাই হয়েছে আমার প্রধান পেশা।’

এমন রবি দাসের সংখ্যা অজস্র। তারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন একদা ৭০০ নদী-উপনদী দেয়া ঘেরা চিরসবুজ বাংলার হারিয়ে যাওয়া মিথিক অস্তিত্বে। সেই অস্তিত্বে দিনদিনে আরো বিলীন হচ্ছে। বঙ্গীয় সংস্কৃতির অপরিচ্ছেদ্য অঙ্গ নদী এখন আকস্মিক আবহাওয়ার ধরন পরিবর্তন এবং দেশের অবকাঠামো উন্নয়নের অপরিকল্পিত প্রবণতার ঘোড়দৌড়ের প্রধান বলি। অবস্থা এতোই নাজুক যে ২০১৯ সালের জুলাই মাসে শীর্ষ আদালত এক রায়ে নদীকে ‘জীবন্ত স্বত্বা’ বলে ঘোষণা দেন। অর্থাৎ, নদীর ভারসাম্য রক্ষায় এখন থেকে যে কেউ আইনি প্রক্রিয়ার আশ্রয় নিতে পারবেন। দোষ প্রমাণিত হলে অভিযুক্তরাও পাবেন কঠোর শাস্তি।

কিন্তু, বাংলাদেশের নদী-নির্ভর অধিকাংশ স¤প্রদায়ের মানুষ মনে করেন অনেক দেরিতে নেয়া এই পদক্ষেপ আখেরে কোনো সুফল বয়ে আনতে পারবে না। রবি দাস বলেন,আগে নদী শুকনো মৌসুমেও ভরা থাকতো আর এখন এই বলে নদীর বুকে ধানের জমিগুলোর দিকে আঙুলের ইশারা করেন। সিলেট বিভাগের এই নদীটি এক সময় সুরমা নদীর শাখা ছিলো। ভারত থেকে বাংলাদেশের সীমানায় এসে বঙ্গোপসাগরে মেশার আগে অসংখ্য উপনদীর জন্ম দিয়েছিলো সুরমা। যার বুকে ভর করে স্বনির্ভর হয়ে উঠেছিলো এই অঞ্চলের নৌবাণিজ্য, মৎস আহরণ। এখন সারাদিন জাল নিয়ে ঘুরেও নদীতে মাছ পাওয়া যাবে কিনা তার নিশ্চয়তা নেই, আগের দিনগুলোতে জাল গুটোলেই দেখা যেতো রূপালি মীণের জৌলুষ। ভারত সীমানার কাছে বিশ্বনাথ এলাকার হিন্দু জেলে সম্প্রদায় বহু প্রজন্মের জীবন এই মাছ ধরেই কাটিয়েছে। এখন তারা রবি দাসের মতোই কর্মহারা, কাজের সন্ধানে অধিকাংশই চলে গেছেন বড় শহরে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত