প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ফেসবুকে বাবা সেজে মেয়ের সাড়ে তিন লাখ টাকা নিয়ে লাপাত্তা ‘আব্বাজান’

ডেস্ক রিপোর্ট  : ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করেছেন তিনি। বনানীতে একটি আর্কিটেক্ট ফার্মে এসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। ফেসবুক মেসেঞ্জারে এক প্রতারকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে খুইয়েছেন সাড়ে তিন লাখ টাকা। ওই প্রতারক দীর্ঘ দিন তার সঙ্গে কথাবার্তা বলে ঘনিষ্ঠতা বাড়ায়। ওই তরুণী তাকে বিশ্বাস করে বাবা বলে সম্বোধন করতেন। টাকা হাতিয়ে নেয়ার পর ওই প্রতারক তাকে মেসেঞ্জারে ব্লক করে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। প্রতারিত ওই তরুণীর জবানিতেই জানা গেল ঘটনাটি। তিনি বলেন, ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে আব্দুল আরফান আলী নামের একটি ফেসবুক একাউন্ট থেকে তার আইডিতে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট আসে।

মেসেঞ্জারে সালাম দিয়ে মেসেজ পাঠায় আরফান। এসময় তরুণী সাড়া না দিলে আরফান লিখেন, আমি তোমার বাবার বয়সী। আমাকে একসেপ্ট করতে সমস্যা কোথায়। তখন তাকে ফেসবুকে যুক্ত করেন ওই তরুণী। এসময় আরফান জানতে চায়, সে কি করে, কোথায় থাকে, বিয়ে করেছে কি না ইত্যাদি। তরুণী বলেন, আগ্রহের জায়গা থেকে আমি তার প্রোফাইলে যাই। প্রোফাইলের নিচে লেখা, পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি। সে আয়ারল্যান্ড প্রবাসী। গ্রামের বাড়ি বরিশাল। স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে আয়ারল্যান্ডে থাকে। চলতে থাকে নিয়মিত কথাবার্তা। সে আমাকে তার নিজের মেয়ের মত খোঁজখবর নিতে থাকে। ঘুম থেকে কখন উঠেছি, খেয়েছি কি না, অফিসে গিয়েছি কি না, আমার বিয়ের জন্য আয়ারল্যান্ডের নাগরিক পাত্র দেখাসহ খুঁটিনাটি সব বিষয়ে খোঁজখবর রাখতে শুরু করে। এক সময় দেখি সে আমার বাবার স্থান পুরোপুরি দখল করে ফেলেছে। আমাদের গ্রামের বাড়ি নরসিংদী। তিন ভাই বোনের মধ্যে আমি সবার ছোট। বাকি দুই ভাই বোনের বিয়ে হলেও আমি বিয়ে করিনি। বাবা মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। বর্তমানে অবসরে। বাবার উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা আছে। সবসময় অসুস্থ থাকেন। তার একটিই দুঃখ মেয়েকে বিয়ে দিয়ে যেতে পারবেন কি? ২০১৭ সালে পাশ করে বের হওয়ার পর বিদেশে যাওয়ার ভুত মাথায় চাপে। আইএলটিএস কোচিংএ ভর্তি হবো ঠিক এমন সময় এই ঘটনাটি ঘটে। প্রতারক আরফানের সঙ্গে ফেসবুকে পরিচয় হওয়ার পর থেকে সে আইএলটিএস এর বিপরীতে যত নেতিবাচক ধারণা দেয়া যায় সেগুলো করে আমাকে নিরুৎসাহিত করে। পরবর্তীতে আমি আর আইএলটিএস কোচিং এ ভর্তি হইনি। দিনে দিনে সে আমার কতটা আপন হয়ে উঠেছে আমি নিজেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। এসময় তার জন্য খুব মায়া তৈরি হয়। বাবা-মায়ের সঙ্গে তার বিষয়ে আলাপ করলে বাবা শুরুতেই বুঝতে পারেন লোকটি প্রতারক প্রকৃতির। মা যদিও আমার পক্ষে সাফাই গাইতেন। তার সঙ্গে আমার নিয়মিত মেসেঞ্জারে কথা হত। একসময় সে আমাকে আশ্বস্ত করে বলেন, আমি নিজেই এখানে বড় একটি হোটেল দিব। সেখানে লোক লাগবে। তখন তোমাকে নিয়ে আসবো। তাছাড়া ওখানে অনেক পাঁচ তারকা হোটেল আছে সেখানে পরবর্তীতে চাইলে তাকে ভালো পদে চাকরি দিয়ে দিবেন আরফান। তার কথা শুনে আমি বিদেশে যাওয়ার জন্য একদম পাগল হয়ে গেলাম। অফিসের কাজে মন বসে না। পাগলামি দেখে অফিসের সবাই আমাকে আব্বাজান বলে ক্ষেপাতেন। ইতোমধ্যে সে জেনে গেছে আমি কত টাকা বেতন পাই। পরিবারের কি অবস্থা। আমি তাকে সরল মনে বলে সব বলে ফেলি। পরিবারের প্রতি আমার কোনো দায়বদ্ধতা নেই। আমি বাসা থেকে টাকা নেই না। বাসায়ও আমি টাকা দেই না। একসময় ইচ্ছা ছিল রাজউকে চাকরি করবো। সে জন্য আমার ব্যাংক একাউন্টে প্রায় ৬ লাখ টাকা জমা রেখেছি। যেটা পুরোটাই আমার চাকরি করা টাকা। সঙ্গে অল্প কিছু টাকা ছিল বাবার দেয়া। ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসের ২৮ তারিখ আমি বাড়ি যাই। বাড়ি থেকে ঢাকায় আসার সঙ্গে সঙ্গে সে আমাকে মেসেঞ্জারে বলেন, ‘তোমার জন্য সুখবর আছে। এখানে তোমার চাকরির ব্যবস্থা হয়ে গেছে’। তিন মাসের ভেতরে এতকিছু ঘটে গেছে। এখন সে আমার আব্বাজান হয়ে গেছে। আমি তাকে আব্বাজান বলে ডাকি। সেও আমাকে আম্মাজান বলে ডাকে। আরফান বলেন, ‘যত দ্রুত সম্ভব কিছু টাকা পাঠাতে হবে। চাকরি না হলে টাকা ফেরত পাবে। তোমার আব্বাজান থাকতে টাকা মার যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই’। প্রথমে আড়াই লাখ টাকা সে আমাকে ব্যাংক ড্রাফট করতে বলেন। তখন পোস্ট অফিস থেকে ফিক্সট ডিপোজিট করা টাকা তুলে প্রথম ধাপে তাকে এক লাখ তিন হাজার টাকা পাঠাই। তার দেয়া একটি একাউন্টে টাকাটা পাঠাই। এই টাকা বাসার কাউকে না জানিয়ে পাঠিয়েছি। এর কিছুদিন পরে জানায় আরো দেড় লাখ টাকা লাগবে। অর্থাৎ এক সপ্তাহের মাথায় তাকে মোট আড়াই লাখ টাকা দেই। তৃতীয়বার এক লাখ টাকা পাঠাই। এভাবে তিন ধাপে সাড়ে তিন লাখ টাকা পাঠাই তাকে। এরপর সে আমাকে বলে, ‘আজকে তোমার জন্য একটি সুখবর আসতে পারে’। এরপর থেকে তাকে আমি ফেসবুক মেসেঞ্জারে খুঁজে পাই না। অন্য আইডি থেকে মেসেজ পাঠালেও সিন করে না। এদিকে আমি অস্থির হয়ে পড়েছি। আমি দিন রাত ভাবছি কবে আয়ারল্যান্ড যাব। সে যখন আমাকে বলেছে এপ্রিল মাসে ভিসা হয়ে যাবে তখন ঢাকার বাসা থেকে বই-খাতাসহ যাবতীয় জিসিনপত্র আমি বাড়িতে নিয়ে যাই। আমি তো চলেই যাব। তাই ঢাকায় এসব রেখে লাভ কি। শুধুমাত্র আমার বিছানাটা ছিল রুমে। অফিসেও আমি ঠিকভাবে কাজ করি না। চাকরি ছেড়ে দেই দেই অবস্থা। টাকা লেনদেনের কথা সে কখনো ম্যাসেঞ্জারে লিখেনি। আমাদের সব কথা মেসেঞ্জারে হত। তাই কল রেকর্ডও রাখতে পারিনি। প্রায় ১৫ দিন পর সে আমাকে নিজেই ফোন দেয়। দেড় লাখ টাকা চায়। এসময় আমি পারিবারিক সমস্যার অজুহাত দেখাই। বাকী টাকা মার যাবে এই ভয়ে বাবার কাছ থেকে এক লাখ টাকা নিয়ে তাকে দেই। এই টাকাটা দিলেই সে আমাকে বাংলাদেশে এসে তার সঙ্গে নিয়ে যাবে। কিছুদিন পরে জানায় আমার আবেদন রিজেক্ট হয়েছে। আবার আপিল করতে হবে। ইতোমধ্যে আমার বাবা বুঝে গেছে লোকটি প্রতারক। টাকা দেয়ার পর আর সে আমার সঙ্গে আগের মত কথা বলে না। এড়িয়ে চলে। খারাপ ব্যবহার করে। ব্যস্ততা দেখায়। এভাবে প্রায় এক বছর চলতে থাকে। এরপর ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসে মেসেঞ্জারে আমাকে ব্লক করে দেয়। পরবর্তীতে রাগে দুঃখে মানি রিসিপ্টগুলো ছিঁড়ে ফেলে দেই। পারিবারিক সম্মান নষ্ট হওয়ার ভয়ে পুলিশের কাছেও কোনো অভিযোগ করিনি। এখন নিজের ভাগ্যকে দোষ দেয়া ছাড়া আর কিইবা করার আছে।

উৎসঃ মানবজমিন

সর্বাধিক পঠিত