প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিকে অভিন্ন পদ্ধতির শিক্ষাক্রম

আমাদের সময় : প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তরে অভিন্ন পদ্ধতির শিক্ষাক্রম প্রণয়ন করা হচ্ছে। যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষাক্রমই হবে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত।

জানা গেছে, বিদ্যমান শিক্ষাক্রমে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষাক্রম যোগ্যতাভিত্তিক এবং মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাক্রম উদ্দেশ্যভিত্তিক। এর ফলে শিক্ষাক্রম রূপরেখায় ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। এক স্তর থেকে আরেক স্তরে উন্নীত হলে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায় খাপখাওয়াতে সমস্যা হয়। এতেও মাধ্যমিকে গিয়ে ঝরে পড়ে অনেক শিক্ষার্থী।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) কারিকুলাম প্রণয়ন করছে। এনসিটিবির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আমাদের সময়কে জানিয়েছেন, জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখার একটি খসড়া নিয়ে কাজ চলছে।

প্রাথমিক স্তরের নতুন পাঠ্যক্রম প্রসঙ্গে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব আকরাম আল হোসেন আমাদের সময়কে বলেন, বিদ্যমান কারিকুলামে একটি সমস্য হচ্ছে- প্রাথমিকের শিশুরা যখন মাধ্যমিকে যায়, তাদের পাঠ্যক্রম ভিন্ন হয়। এতে লেখাপড়ায় বড় ধাক্কা লাগে। দুই স্তরের পাঠ্যক্রম দুই পদ্ধতির। আমরা প্রাথমিকে পড়াই যোগ্যতাভিত্তিক পাঠ্যক্রম, আর মাধ্যমিকে পড়ানো হয় উদ্দেশ্যভিত্তিক। দুই স্তরের মাঝে সেতুবন্ধ হয়নি লেখাপড়ায়। এবার যখন আমরা নতুন পাঠ্যক্রম

নিয়ে ভাবছি, তখন সিদ্ধান্ত নিয়েছি- দুই স্তরের পাঠ্যক্রমে একটি সেতুবন্ধ থাকতে হবে। সেভাবে পাঠ্যক্রম প্রণয়নে এনসিটিবিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যমান প্রাথমিক স্তরের শিক্ষাক্রমে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান পাঠ্যপুস্তককেন্দ্রিক এবং মুখস্তনির্ভর। যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষাক্রম শ্রেণিকক্ষে যথাযথ বাস্তবায়নের অভাব। গুরুত্ব অনুসারে বিভিন্ন বিষয়ে সময়ের বণ্টন যথাযথ নয়। আবার শ্রেণি ও বিষয়ভিত্তিক যোগ্যতাসমূহতে জ্ঞান, দক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গির সুষম প্রতিফলন যথাযথ নেই। শিক্ষাক্রম প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে গবেষণালব্ধ জ্ঞানের প্রয়োগ অত্যন্ত অপ্রতুল। বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক্রমে ক্রস কাটিং বিষয়ের প্রতিফলন দুর্বল। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির মতো বিষয় সেভাবে প্রতিফলিতই হয়নি। একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যে ধরনের দক্ষতা বা যোগ্যতা শিশুদের অর্জন করা দরকার, তা শিক্ষাক্রমে অপ্রতুল, যেমন- তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, ধর্মীয় উগ্রবাদ, শিশু নিরাপত্তা ইত্যাদি। শিক্ষাক্রমে উল্লেখ থাকলেও পাঠদান এবং মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় একীভূত শিক্ষার কৌশলের প্রয়োগ দেখতে পাওয়া যায় না। শিক্ষাক্রম প্রণয়ন ও বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর মাঝে যে আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় থাকা দরকার তা যথাযথভাবে নেই।

অন্যদিকে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাক্রমে বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রের বিকাশে গুরুত্ব দেওয়া হলেও মনোপেশিজ ও আবেগিক ক্ষেত্রে যথেষ্ট গুরুত্ব প্রদান করা হয়নি। প্রাক-বৃত্তিমূলক ও বৃত্তিমূলক বিষয়ের ঘাটতি রয়েছে। শিক্ষাক্রম আরও বিজ্ঞানভিত্তিক ও প্রয়োগযোগ্য করার সুযোগ রয়েছে। শিক্ষাক্রম সব স্তর, সব শ্রেণি এবং মূল্যায়নের ক্ষেত্রে পরিপূর্ণভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। প্রাথমিক স্তরের শিক্ষাক্রম যোগ্যতাভিত্তিক এবং মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাক্রম উদ্দেশ্যভিত্তিক। ফলে শিক্ষাক্রম রূপরেখায় ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। প্রচলিত শিক্ষাক্রম পরিবর্তিত বৈশ্বিক চাহিদা, রূপকল্প ২০৪১, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার ২০১৮ ও এসডিজি লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সঙ্গত কারণেই ততটা প্রাসঙ্গিক বলে বিবেচিত হয়নি। বর্তমান আন্তর্জাতিক ধারার সঙ্গে প্রচলিত শিক্ষাক্রম সার্বিকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। শ্রেণিকার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে শিক্ষাক্রমের নির্দেশনা সীমিতভাবে অনুসরণ করা হয়। শিক্ষাক্রমে বৈচিত্র্যময় শিখন-শেখানো কার্যক্রমের কথা বলা হলেও বাস্তবে বক্তৃতানির্ভর শ্রেণিকার্যক্রমের প্রাধান্য পরিলক্ষিত হয়।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে এনসিটিবির সদস্য (প্রাথমিক শিক্ষাক্রম) প্রফেসর ড. একেএম রিয়াজুল হাসান আমাদের সময়কে বলেন, শিক্ষাক্রম পরিমার্জন প্রক্রিয়ায় আমরা শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন কার্যকারিতা এবং শিক্ষার বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ, চাহিদা নিরূপণ, গবেষণা, পর্যালোচনা, কর্মশালা ইত্যাদি থেকে প্রাপ্ত তত্ত্ব, তথ্য, সুপারিশের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের নিয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখা প্রণয়ন করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, নতুন পাঠ্যক্রমে এক শিক্ষার্থীর যেসব ‘মূল্যবোধ’ তৈরি হবে- সংহতি, শ্রদ্ধা, শুদ্ধাচার, দেশপ্রেম, সম্প্রীতি, পরমতসহিষ্ণুতা, সামগ্রিকতা। ‘গুণাবলি’ তৈরি হবে- পরিশ্রমী, গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক, উদ্যোগী, নান্দনিক, মানবিক এবং দায়িত্বশীল। ‘মূল দক্ষতা’ হবে- সূক্ষ্ম চিন্তন দক্ষতা, সৃজনশীল চিন্তন দক্ষতা, সমস্যা সমাধান দক্ষতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ দক্ষতা, সহযোগিতা দক্ষতা, যোগাযোগ দক্ষতা, বিশ্ব নাগরিকত্ব দক্ষতা, জীবিকায়ন দক্ষতা, স্বব্যবস্থাপনা দক্ষতা এবং মৌলিক দক্ষতা। শিশুর ‘শিক্ষণ ক্ষেত্র’ হবে- ভাষা ও যোগাযোগ; গণিত ও যুক্তি; বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি; তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি; সমাজ ও বিশ্ব নাগরিকত্ব; জীবন ও জীবিকা; পরিবেশ ও জলবায়ু; মূল্যবোধ ও নৈতিকতা; শারীরিক-মানসিক স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা; শিল্প এবং সংস্কৃতি।

নতুন পাঠ্যক্রমের রূপকল্প হচ্ছেÑ এমন একটি ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তৈরি করা, যারা জাতীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্য, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি ধারণ করে পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিজেকে উৎপাদনমুখী সুখী ও বৈশ্বিক নাগরিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারবে।

সর্বাধিক পঠিত