প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

হিন্দু অন্দরমহলেই তখন মুসলমানি কিস্‌সার কদর

বিজলীরাজ পাত্র : ১৮৯৯ নাগাদ প্যারীমোহন দাসগুপ্তের সম্পাদনায় বিজয়গুপ্তের প্রামাণ্য সংস্করণ প্রকাশের আগে, ‘মনসামঙ্গল’ আমজনতার দরবারে মূলত পুঁথির আকারে পাঠ করা হত। সে দিন ব্যক্তির চেয়ে গোষ্ঠীর গুরুত্ব বেশি।

বিজয়গুপ্তের মনসামঙ্গলে উল্লেখিত ‘হাসান হোসেন’ পালাটি বেশ চিত্তাকর্ষক। হোসেনহাটী গ্রামের নিকট বসবাসকারী হাসান-হোসেন হল, দেবী মনসার দুই প্রধান শত্রু। সম্পর্কের পরিচয়ে তারা দুই ভাই। অথচ সামাজিক রীতি-নিয়মকে তোয়াক্কা না করে, এই দুই ভাই ‘বিপরীত কাম’ তথা সমকামে আবদ্ধ। এই হল বিজয়গুপ্তের কাব্যে মুসলমানের প্রারম্ভিক পরিচয়। এর পর হাসান-হোসেন এবং কাজির সঙ্গে মনসার প্রবল লড়াই বাধে। সে লড়াইতে পরাজিত হয় মুসলমান শাসক শক্তি। প্রবল হিন্দুবিরোধী কাজি শেষ পর্যন্ত নাপিত ডেকে দাড়ি কেটে দেয় এবং ভক্তিভরে মনসা তথা বিষহরী-র পুজো করে।

১৮৯৯ নাগাদ প্যারীমোহন দাসগুপ্তের সম্পাদনায় বিজয়গুপ্তের প্রামাণ্য সংস্করণ প্রকাশের আগে, ‘মনসামঙ্গল’ আমজনতার দরবারে মূলত পুঁথির আকারে পাঠ করা হত। সে দিন ব্যক্তির চেয়ে গোষ্ঠীর গুরুত্ব বেশি। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসকার সুকুমার সেনের সাক্ষ্য থেকে জানা যায়, শ্রাবণ মাসের নাগপঞ্চমীর দিন, বারাসাতের নিকটবর্তী ছোট জাগুলিয়া গ্রামের তিন পাড়ায় মনসামঙ্গল প্রায় ৯ দিন ধরে পাঠ করা হত। এই যে হাসান-হোসেন-এর কথা যখন একটা বড় অংশের জনতার কানে যেত, তখন তাদের অভিব্যক্তি কেমন হত, তা আজকে আর স্পষ্ট করে বলা সম্ভব নয়।

কিন্তু উনিশ শতকের প্রথম লগ্নে, ১৮১৬ সালে অন্নদামঙ্গলের মতো ছাপা বই বাঙালি পাঠকের হাতে এল। পাঠ-অভিজ্ঞতা হয়ে উঠল সম্পূর্ণ একটি ব্যক্তিগত অনুভূতি। বটতলা অঞ্চলের দোকানদারেরা তৈরি করল ধর্মশাস্ত্র গ্রন্থ নামে নতুন ক্যাটিগরি, যেখানে স্থান পেল হরিভক্তি বিলাস, পরাশর সংহিতা অথবা বিজয় গুপ্তের পদ্মপুরাণ প্রভৃতি। কিন্তু পাঠকের তৃষ্ণা কি এটুকুতে মেটে। ১৮৩১ সনে, চন্দ্রিকা যন্ত্রালয় থেকে একই সঙ্গে কবিকঙ্কন কৃত চণ্ডী এবং হাতেমতাই প্রকাশিত হয়। ফারসি থেকে বাংলা ভাষায় ‘হাতেমতাই’-এর প্রবেশ ছিল বাঙালির তথাকথিত পাঠাভ্যাসের একটি পরিবর্তনের সূত্র। মুসলমান মহিলাদের এক রকম যৌন স্বাধীনতার গল্প। মনুসংহিতা বা রঘুনন্দনের স্মৃতির শাসনে তথাকথিত হিন্দু মহিলারা যখন নিজের শরীরের কামনা-বাসনাকে ভুলতে চলেছে, তখন ‘হাতেমতাই’-এর গল্পে মহিলাদের বিছানাসঙ্গী হিসাবে পুরুষ নির্বাচনের স্বাধীনতা, বার-ব্রত-উপবাসে মোড়া বঙ্গদেশে নতুন বার্তা এনেছিল। শরীরের স্বাদ মেটানোর জন্য সব সময় যে উপলক্ষ্য হিসাবে একটি রোমান্টিক প্রেমের প্রয়োজন, এমন একটি পুরুষতান্ত্রিক ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছিল। মনে রাখতে হবে, তৎকালে ‘হাতেমতাই’-এর মতো বইয়ের মুখ্য পাঠক ছিল মহিলারা। স্বর্ণকুমারী দেবীর লেখা থেকে জানা যায়, ঠাকুরবাড়িতে ঝুড়িতে করে অন্নদামঙ্গল, গোলেবকাওলি বা লায়লা মজনু আনা হত। মেয়েরা সে সব বই রীতিমতো কাড়াকাড়ি করে নিয়ে যেত। তথাকথিত ‘হিন্দু’ বাড়িতে ঠাকুরঘর নামে পরিচিত স্থানটি মূলত থাকত মহিলাদের অধিকারে। নানা পুজোপাঠের কুশীলব ছিলেন এই মহিলারা। যে মেয়ে সন্ধেবেলা তুলসী মঞ্চে প্রদীপ জ্বালাত তার চোখই গোগ্রাসে গিলত রাজকুমার হাতেমের কাহিনি। এই ব্রাত্য, বঞ্চিত বাঙালি মেয়েদের হাতেই গড়ে উঠছিল আমাদের সাম্প্রদায়িক ও অসাম্প্রদায়িক অতীতের সমন্বয়ের ঘটনা।

একটু হাতেমের কাহিনি সংক্ষেপে জেনে নেওয়া যাক। ১৮৯৭ সালে প্রকাশিত, শ্রী অধরচন্দ্র মিত্র কর্তৃক সম্পাদিত ‘হাতেমতাই’ গ্রন্থ থেকে গল্পটি নেওয়া হচ্ছে। গ্রন্থ মূল্য ছিল ১ টাকা। ছোটবেলায় বটতলা থেকে প্রকাশিত হাতেমতাই পড়ে এতটা মজেছিলেন অধরবাবু যে কর্মজীবনের লাথিঝাঁটা খেয়েও, একটুও উৎসাহ না হারিয়ে জামালপুর থেকে একটি উর্দু হাতেমতাই সংগ্রহ করেন।

বহু দিন আগে, আরব দেশের অন্তর্গত ইয়মন প্রদেশে তাই নামে এক শক্তিশালী রাজা থাকত। সে অঞ্চলের রীতি অনুযায়ী আপন পিতৃব্য কন্যার সঙ্গে বিবাহ করেছিলেন তিনি। কিন্তু রাজার মনে সুখ নেই। এখনও সন্তানের পিতা হতে পারলেন না তিনি। দ্বিতীয়বার বিয়ে করার কথাও ভাবতে পারেন না। এমতাবস্থায়, এক দিন এক স্বপ্নপ্রাপ্ত ফল গ্রহণ করে গর্ভবতী হন রানি। দৈবের আশীর্বাদে জন্ম হল হাতেমের। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সে শাস্ত্র এবং শস্ত্র উভয়ক্ষেত্রেই পারদর্শী হয়ে উঠল। অন্য দিকে খোরাসান দেশে, বণিক বরজখ কন্যা হোসনবানু ঠিক করেছে, বিবাহ করে সে কিছুতেই নিজের স্বাধীনতা পুরুষের হাতে তুলে দেবে না। অবশেষে ধাত্রীর পরামর্শে সে সাতটি প্রশ্ন দরজায় খোদাই করে রাখে। যে এই সাতটি প্রশ্নের উত্তর সন্ধান করতে পারবে, তাকেই বিবাহ করবে সে। মুনিরশামী, হোসেনবানুর চিত্র দর্শন করে প্রেমে পাগল হয়ে পড়ে। কিন্তু এই সাতটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজার সাধ্য নেই তার। অপরের দুঃখে হাতেমের হৃদয় কেঁদে ওঠে। মুনিরশামী-র হয়ে হাতেম বেরিয়ে পড়ে এই সাতটি প্রশ্নের উত্তর সন্ধানে।

এই অভিযানের সময় হাতেমের সঙ্গে বিভিন্ন মহিলার সাক্ষাৎ হয়েছে। এর মধ্যে অনেক মহিলা হাতেমকে বিছানাসঙ্গী বানাতে চায়। কখনও স্বেচ্ছায় বা কখনও অনিচ্ছায় হাতেমও সেই মহিলাদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে। যৌনতার উদ্দাম বর্ণনা, বিশেষত মহিলাদের সক্রিয় আচরণ এবং হাতেমের বীরত্বের নানান কাহিনির কারণে, ১৯২০-৩০ এর দশকেও মুসলমানি বটতলার বাজার তালতলা অঞ্চলে হাতেমতাই-এর অসংখ্য সংস্করণ প্রকাশিত হত। ১৮৩১ সনে সমাচার চন্দ্রিকার পাতায় আরও একটি বই প্রকাশের খবর পাওয়া যায়। আরব্যইতিহাস সারসংগ্রহ। লন্ডনের গ্রাব স্ট্রীটের বিখ্যাত ‘আরেবিয়ান নাইটস এনটারটেনমেন্ট’ নামক ইংরেজি পুস্তকের বাংলা অনুবাদ এই বইটি। অনুবাদকের নাম পাওয়া যায়নি। পরবর্তীকালে ১৮৪৯ সনে নীলমণি বসাকের অনুবাদে প্রকাশিত হয় আরব্য উপন্যাস-এর প্রথম খণ্ড। মোট তিন খণ্ডে প্রকাশিত হয় বইটি। ১৮৮৪ সালে বটতলার গরানহাটা অঞ্চল থেকে শ্রীঅবিনাশ্চন্দ্র মিত্রের অনুবাদে প্রকাশিত হয়- ‘সচিত্র একাধিক সহস্র দিবস’। এরপর আরও অনেক অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে আরব্য রজনীর। কিন্তু ১৯৩৫ সালে প্রকাশিত বসুমতী-রস-উপন্যাস-সিরিজ-এর আরব্য রজনী ছিল এক কথায় অনবদ্য এবং অসামান্য। প্রচ্ছদ চিত্রটিও উর্দু শৈলী-র মতো। প্রায় ৬২০ পৃষ্ঠার এই অখণ্ড সংস্করণটির অনুবাদক ছিলেন- রহস্য লহরীর প্রখ্যাত সম্পাদক দীনেন্দ্রকুমার রায়। মোট ৪৫টি রঙিন চিত্র ছিল বইটিতে। চিত্রকর হিসাবে নিযুক্ত ছিলেন- চঞ্চলকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় এবং চারুচন্দ্র সেনগুপ্ত। ভূমিকা অংশে দীনেন্দ্রকুমার লেখেন- ‘আরব্য-রজনীর আখ্যায়িকাগুলির বাইরে অনেক মনোরম চিত্তাকর্ষক কাহিনী আছে। যা, এ যাবৎকাল বাংলা ভাষায় অপ্রকাশিত। যদি বর্তমান বইটি পাঠকের মন কাড়তে পারে তবে তারা ভবিষ্যতে আরব্য রজনীর এই না-জানা কাহিনীগুলি প্রকাশ করবেন।’

আসলে আরব্য রজনী নানান সংযোজন-বিয়োজনের হাত ধরে তৈরি হয়েছে। ফরাসি এবং ইংরেজ লেখকরা নিজের প্রয়োজন মতো এর মধ্যে নানান যৌন উদ্দীপক ঘটনা যোগ করেছেন। এমনটা নয় যে আগে এর মধ্যে যৌনতা ছিল না। বেশ ভালোভাবেই ছিল। আসলে সাহেবেরা নিজদের রুচি অনুযায়ী এক রকমের মুসলমানি যৌনতার চিত্র আঁকতে চেয়েছেন।

‘বসুমতী’ প্রকাশিত বইটির রঙিন ছবিগুলি যে পাঠকের মন কেড়েছিল, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এই ছবিগুলি যে পাঠকের মনে এক ধরনের যৌন উত্তেজনা তৈরি করত, তা বলাই বাহুল্য। ছবিতে ইতিহাস এবং ভৌগোলিক স্থানের ধারণাও চমৎকার ফুটে উঠেছে। যেমন, আলাদিন ও আশ্চর্য প্রদীপ গল্পের ঘটনাস্থান- চিন দেশের রাজধানী। মিলন উৎসব নামের ছবিটিতে আলাদিন এবং রাজকন্যাকে চিনা পুরুষ-নারী হিসাবে অঙ্কন করা হয়েছে। এমনকী রেখাচিত্রগুলিতেও আলাদিন একজন চৈনিক পুরুষ।

সুলতানকে তার স্ত্রী ঠকিয়ে পরপুরুষের সঙ্গে শয্যা গ্রহণ করেছে। অতএব, তিনি পণ করেছেন রোজ একটি করে মেয়েকে বিয়ে করবেন এবং পরদিন সূর্যোদয়ের পরই তার শিরোচ্ছেদ করাবেন। ক্রমশ দেশে আর মেয়ে পাওয়াই অসম্ভব হয়ে উঠল। চারদিকে ভয় আর ত্রাসের পরিস্থিতি। অবশেষে উজির কন্যা শাহারজাদীর সঙ্গে সুলতানের বিবাহ হয়। কিন্তু তাকে সুলতান হত্যা করতে পারে না। কারণ, সে রোজ রাতে এমন আশ্চর্য গল্প শোনাতে শুরু করে, যার জাদুতে মুগ্ধ হয়ে ওঠে সুলতান। শাহারজাদী কথিত সেই গল্পের সংকলনই- আরব্য রজনী।

৮২ নং আহিরীটোলা স্ট্রীট, তারাচাঁদ দাস এন্ড সন্স থেকে প্রকাশিত- আদি সচিত্র আরব্য উপন্যাস- এর সংকলক ছিলেন- বিশ্বনাথ দাস। প্রকাশকাল—১৯৩০। নিবেদন অংশেই সংকলক জানিয়ে দিয়েছেন-গ্রন্থটি থেকে সমস্ত অশ্লীল অংশ বাতিল করা হয়েছে। যেহেতু সেন্সার এই সংকলনের একটি প্রধান লক্ষ্য ছিল, তাই তৎকালের জনপ্রিয় চিত্রকর নকুল ১০ খানা রঙিন চিত্র অঙ্কন করলেও ছবিগুলি যেন প্রাণ পায়নি।

আমাদের অতিপ্রিয় ছড়াকার সত্যেন্দ্রনাথের সঙ্গেও আরব্য রজনীর গভীর যোগাযোগ ছিল। ১৯০৮ সালে প্রকাশিত সত্যেন্দ্রনাথের এই বইটি পাঠকের একটু অচেনা ঠেকতে পারে। আসলে বইটি ছাপা হয়েছিল প্রাইভেট সারকুলেশানের জন্য। অর্থাৎ বইটি বাজারে বিক্রির জন্য নয়। লেখক তাঁর পছন্দের ব্যক্তিদের মধ্যে বিতরণ করবেন। বটতলার জনপ্রিয় প্রকাশক বসাক এন্ড সন্স থেকে প্রকাশিত এই ‘বেতিক’ নামক বইটি ছিল- আরব্য রজনীর ভাবগত অনুকরণ। ১৮৮৭-এর একটি রিপোর্ট মতে এই প্রকাশনাটি ছিল জাল জুয়াচুরির একটি আড়তঘর। খুব ছোট করে বললে কাহিনিটি হল, বাতেক নামের এক খলিফার যৌন-বিকৃতি, শিশু হিত্যা, ক্রোধ এবং প্রতিহিংসার গল্প। তবে একটি পরীক্ষামূলক সৃষ্টি হিসাবে এই রচনা যুগান্তকারী। আমাদের দুর্ভাগ্য, শুধুমাত্র অশ্লীলতাকেন্দ্রিক কিছু ট্যাবুর জন্য সত্যেন্দ্রনাথের এমন একটি অমর সৃষ্টিকে আমরা ভুলতে বসেছি।

আরব্য রজনীকে অমর করার ক্ষেত্রে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান অনস্বীকার্য। ১৯১৫ সালে প্রকাশিত ভূতপতরীর দেশ-এ আরব্য উপন্যাস খ্যাত হারুন-অল-রশীদ উপস্থিত হলেন পালকি-বেহারার ছদ্মবেশে। ১৯৩০-র কালপর্বেও অবন ঠাকুর যে আরব্য রজনী সিরিজের ছবিগুলি আঁকেন, তাঁর চরিত্ররা কেউ ভিনদেশের বাসিন্দা নয়। বরং পাড়ার দর্জি আলিচাচা বা বাবুর্চি সোলেমান-এর প্রতিরূপ।

আরব্য রজনীর সঙ্গে সঙ্গেই বাঙালির পাঠ্যাভাসে পরিচিত নাম ছিল ওমর খৈয়াম-এর রুবাইয়াৎ। অবশ্য ওমর বলে সত্যি কেউ ছিলেন কি না, এই নিয়ে বিলাতের সাহেবরা একসময় বেশ হই চই ফেলে দিয়েছিলেন। কিছু দিন পর অবশ্য ওমরের অস্তিত্ব নিয়ে আর কেউ সন্দেহ প্রকাশ করেননি। কান্তি ঘোষের অনুবাদ তো বাঙালির মুখে লেগে আছে। ওমর তার জীবনের অধিকাংশ সময় ব্যয় করেছিলেন বিজ্ঞান চর্চায়। কাব্যের সাধনা করেছিলেন অতি সামান্যই। সৈয়দ মুজতবা আলীর লেখা থেকে জানা যায়, ওমরের নামে প্রচলিত প্রায় ৬০০ রুবাইয়াৎ ইরানী বটতলাতে পাওয়া যায়, দেশভাগের পূর্বে এই ৬০০ খানি রুবাইয়াৎ-ই কলকাতার ফারসি বটতলা তালতলা-তে পাওয়া যেত। এর অতি অল্পই ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে। অতএব রুবাইয়াৎ পড়ার একটি আদর্শ জায়গা ছিল বটতলা।

বাংলা ভাষায় রবাইয়াৎ-এর প্রথম সচিত্র সংস্করণ-এর অধিকারী ব্যক্তিটি হলেন নরেন্দ্র দেব। ১৯৩৩-র কালপর্বের এই অনুবাদের প্রকাশক ছিলেন গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এন্ড সন্স। বইটি উৎসর্গ করা হয়েছিল রবীন্দ্রনাথকে। তৎকালের জনপ্রিয় শিল্পী- পূর্ণ চক্রবর্তী এবং উপেন্দ্র ঘোষ বইটিতে যে রঙিন ছবিগুলি অঙ্কন করেছিলেন, তা যথেষ্ট মাত্রায় এরোটিক। ১৯৫৯ সালে কাজী নজরুল ইসলামের অনুবাদে প্রকাশিত হয় আর একটি রুবাইয়াৎ-এর অনুবাদ। বইতে অনেকগুলি রঙিন চিত্র অঙ্কন করেছিলেন- খালেদ চৌধুরী। কিছু ছবি তো রীতিমতো যৌন উত্তেজক। এমনিতে প্রবন্ধের আকারে ওমর খৈয়াম এবং রুবাইয়াৎ-এর সঙ্গে বাঙালিকে পরিচিত করেছিলেন চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৯০৭ সালে ‘ওমর খায়ামের ধর্ম্মমত’ নামে সে প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় প্রবাসী-র পাতায়।

এ বার একটা চিত্তাকর্ষক ঘটনা দিয়ে এই লেখার ইতি টানব। বিশ শতকের একেবারে শুরুর দিকের ঘটনা। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের খুব কাছের মানুষ হয়ে উঠেছিলেন নন্দলাল বসু। অবন ঠাকুর তখন ‘ইসলামি কাহিনী কেচ্ছা’ থেকে বাদশাদের ছবি আঁকতে ব্যস্ত। অবনীন্দ্রনাথের অনেক অনুগত ছাত্রশিল্পীরা অনেকেই এই ধরনের ছবি আঁকার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু কেউ সে ভাবে পেরে ওঠেননি। নন্দলালকে গুরু অবনীন্দ্রনাথ বলেছিলেন- এ সব ‘মোগলাই কায়দার ছবি’ তোমাদের হবে না। তোমরা শুধু ‘দিশী ছবি’ কর। ‘আমাদের বংশের মধ্যে পিরালী ধারায় আছে এই সব কায়দা’। এই শেষ বাক্যটাতে একটু চমক খেতে হয়। এই পিরালী শব্দটি অপবাদ ও নিন্দাবাচক। যশোর জেলার দক্ষিণারঞ্জন রায়চৌধুরীর চার পুত্র ছিলেন কামদেব, জয়দেব, রতিদেব ও শুকদেব। এঁদের মধ্যে প্রথম দুই জন স্থানীয় শাসক মামুদ তাহির বা পীর আলির প্রভাবে ইসলামে ধর্মান্তরিত হন। এর ফলে তাদের পুরো পরিবার সমাজচ্যুত হন। সম্ভবত ঘটনাটি ঘটেছিল পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে। জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারও এই পিরালী ধারার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অবনীন্দ্রনাথের এই বাক্যটি থেকে প্রমাণ হয়, আধিপত্যকামী সংস্কৃতির বিশুদ্ধতা নামক মিথটিকে অনেক দূরে সরিয়ে রেখেছিল বাঙালি সংস্কৃতির পীঠস্থান ঠাকুর পরিবার। অন্তত অবনীন্দ্রনাথের ঐতিহ্য এবং অভিজ্ঞতায় মুসলমান আর যাই হোক, ‘অপর’ নয়। এই সময়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত