প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

১৬০ বছরের পুরনো দণ্ডবিধি দিয়েই চলছে বিচার কাজ

এস এম নূর মোহাম্মদ : ভারতীয় উপমহাদেশ থাকাকালীন দণ্ডবিধির খসড়া প্রনয়ণ করা হয় ১৮৩৭ সালে। যা প্রকাশিত হয় ১৮৬০ সালে। আর কার্যকর হয় ১৮৬২ সালে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও পাকিস্তান আমলের দণ্ডবিধি ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতির ৪৮ নং আদেশে বহাল রাখা হয়। এরপর ১৯৭৩ সালের ৮ নং আইন দ্বারা পাকিস্তান কথাটি বাদ দিয়ে শুধু দণ্ডবিধি শব্দটি বহাল রাখা হয়। দণ্ডবিধি সর্ব শেষ সংশোধন করা হয় ২০০৪ সালে। সংশোধনীতে বলা হয় ৯ বছরের কম বয়স্ক শিশুর কোন কাজ অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে না। যা আগে ছিল ৭ বছর পর্যন্ত।

দণ্ডবিধির ৫১০ ধারায় বলা আছে কোন ব্যক্তি নেশাগ্রস্থ হয়ে মাতলামি করলে তাকে মাত্র ১০ টাকা জরিমানা বা ২৪ ঘণ্টা আটক রাখা যাবে। ১৬০ ধারায় বলা হয়েছে কেউ মারামারি করলে তার জন্য একমাস কারাদণ্ড বা ১০০ টাকা অর্থদণ্ড করা যাবে। ১৭১ ধারায় বলা আছে কেউ প্রতারণার জন্য সরকারি কর্মচারির পোষাক পরিধান করলে তাকে তিন মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড বা ২০০ টাকা অর্থদণ্ড করা যাবে। ১৮৬ ধারায় বলা আছে, কোন ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে সরকারি কর্মচারির কাজে বাধা দিলে তিন মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড বা ৫০০ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড করা যাবে।

২৭৪ ধারায় ওষুধে ভেজাল মেশানোর শাস্তি হিসেবে ছয় মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড বা ১ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। আর ২৭৫ ধারায় ভেজাল ওষুধ বিক্রির দায়েও একই সাজার বিধান উল্লেখ আছে। ৪৪৮ ধারায় গৃহে অনধিকার প্রবেশের দায়ে এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা ১ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। উপরোক্ত ধারাগুলো ছাড়াও ১৪০, ১৭২, ১৭৩, ১৭৪, ১৭৬, ১৭৮, ১৭৯, ১৮০, ১৮৩, ১৮৪, ১৮৭, ২২৮, ২৭৩, ২৭৬, ২৭৭, ২৮০, ২৮২, ২৮৪, ২৮৫, ২৮৬, ২৮৭, ২৮৮, ২৮৯, ৩৩৪, ৩৩৬, ৩৩৭, ৩৪১, ৩৪২, ৩৫৭, ৩৫৮, ৪২৮, ৪৪৭ এবং ৪৯১ ধারাতেও অপ্রতুল সাজা তথা অর্থদণ্ডের বিষয় উল্লেখ রয়েছে।
এদিকে সময়ের চাহিদা অনুযায়ী নতুন করে অনেক বিশেষ আইন হলেও সংশোধন করা হয়নি ১৬০ বছরের পুরনো দণ্ডবিধি। দণ্ডবিধি অনুযায়ীই সাজা দিতে হয় বিচারকদের। মামলাও করতে হয় এই দণ্ডবিধি দিয়ে। তবে কোন অপরাধের জন্য বিশেষ আইন থাকলে সেখানে বিশেষ আইন অনুযায়ী মামলা ও সাজা দিতে হয়। কিন্তু দণ্ডবিধিতে থাকা অনেক দণ্ড এখনো অপ্রতুল। বিশেষ করে কারাদণ্ডের বিপরীতে থাকা অর্থদণ্ডের পরিমান বর্তমান সময়ে অনেকটা হাস্যকর বটে। তাই দণ্ডবিধিতে পরিবর্তন এনে অপ্রতুল সাজাগুলো বৃদ্ধির পরামর্শ দিয়েছেন আইনজ্ঞরা।

জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, অনেক গুলো বিশেষ আইন করা হয়েছে। যেখানে সাজার পরিমাণ অনেক বাড়ানো হয়েছে। আর দণ্ডবিধি ভারতে পরিবর্তন করা হয়েছে। আমাদের এখানেও পরিবর্তন করা উচৎ। বিশেষ আইনগুলো দণ্ডবিধির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে দেয়া যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে বিশেষ আইনগুলো বাতিলও করে দেয়া যাবে বলে মনে করেন এই আইনজীবী।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার অন্যতম স্তম্ভ হচ্ছে দণ্ডবিধি। এর শুধু নামটা বাংলাদেশ। আর ১৮৬০ সালের সেটিই রয়েগেছে এখনো। আইন তো সমাজের জন্য। ১৬০ বছর আগের আর এখনকার সমাজ তো একরকম না। অপরাধের ধরন পরিবর্তন হয়েছে। তেমনি সমাজ ব্যবস্থারও আমুল পরিবর্তন হয়েছে। সেই পরিবর্তনটাকে তো ধারণ করতে হবে। সেটা এই আইনের মধ্যে এখনো অনুপস্থিত। তাই প্রয়োজনীয় সংশোধন করে যুগপযোগী করা উচিৎ।

এছাড়া ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার এবিএম আবদুল্লাহ আল মাহমুদ (বাশার) বলেন, কোন অপরাধের ক্ষেত্রে বিশেষ আইন থাকলে সেটিই কার্যকর হবে, দণ্ডবিধি নয়। তবে প্রয়োজনবোধে দণ্ডবিধি সংশোধন করা যেতে পারে। যে অপরাধের ক্ষেত্রে বিশেষ আইন হয়ে গেছে, দণ্ডবিধির ওইসব ধারা বিলুপ্ত করা যেতে পারে। এতে বিচার প্রার্থীদের কোন ধরনের ভুল বুঝা-বুঝির অবকাশ থাকবে না। তাই দণ্ডবিধি সংশোধন করাটাই যুগপযোগী হবে বলে মনে করেন তিনি।

সর্বাধিক পঠিত