প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ধনে-জনে ঢাকার নির্বাচন স্বস্তিতে ধড়িবাজরা

মোস্তফা কামাল : সিটি নির্বাচনী পরিবেশে ঢাকাবাসী উসখুসে থাকলেও স্বস্তিতে নগরী দাবড়ানো হোমরা-চোমরারা। কিছুদিন আগেও সরকারি অভিযান ও ধরপাকড়ে গা-ঢাকা দেওয়া লোকগুলোর এখন আবার সুসময়। সামনে আরও সুসময়ের আশা। নির্বাচনের অছিলায় সিনা টান করে ঘুরছে তারা। নির্বিঘেœ ওঠাবসা করছে দুই দল, বিভিন্ন প্রার্থী ও প্রশাসনের সঙ্গে। মাঠে সমর্থক বা মুরুব্বির বাইরে সরাসরি মনোনয়নও পেয়েছে তাদের অনেকে। সংখ্যায় তারা প্রায় তিন ডজন। তাদের সঙ্গে মাদক, চাঁদাবাজি, দখলসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত সন্ত্রাসীদের সখ্য স্থানীয়দের পাশাপাশি পুলিশেরও অজানা থাকার কথা নয়।

অভিযানের ফাঁক গলে উত্তর-দক্ষিণ দুই সিটি নির্বাচনে কাউন্সিলর পদে প্রার্থীও হয়েছেন এই সম্প্রদায়ের অনেকে। ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন কব্জা করে নিয়েছেন প্রায় অর্ধশত বিতর্কিত কাউন্সিলর। ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের সময় গা-ঢাকা দেওয়া এই হোমরাদের দখল, মাদকের কারবার, চাঁদাসহ নানা দুষ্কর্মের কথা ঘুরেছে মানুষের মুখে মুখে। পত্রপত্রিকাসহ গণমাধ্যমে সিরিজ সংবাদও প্রচার হয়েছে তাদের নিয়ে। ওই ধকলে তাদের বেশিরভাগই গর্তে লুকানোর মতো সরে পড়েছিলেন। কেউ কেউ বিদেশ পালিয়েছেন। কেউ কেউ ওমরাহ হজের নামে মধ্যপ্রাচ্যে পাড়ি দিয়েছেন। বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি কয়েকজনের ব্যাংক হিসাব তলব বা জব্দ করা হয়েছিল। সিটি নির্বাচন যেন তাদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। মুশকিল আছান পেয়ে তারা আবার বিভিন্ন এলাকার বরেণ্য ভিআইপি। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার মানুষের বুক ধুর ধুর করছে এই শ্রেণিকে নিয়ে। ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় তুলনামূলক শান্তশিষ্ট নেতারাও আতঙ্কে পড়ে গেছেন। দাগীরা এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ায় তারা একটু ভরসা দেখছিলেন। নিজেদের ভালো মানুষ দাবি করে ওদের বিরুদ্ধে নানা মন্তব্যও করেছিলেন। তারা এর পরিণতি ভোগের একটা শঙ্কায়।

এই ধাঁচের লোকদের কাউন্সিলর পদে নমিনেশন দেওয়ায় সাধ্যমতো সচেষ্ট থেকেছে বিএনপিও। সাধ্যের মধ্যে জাতীয় পার্টিও কম যায়নি। ক্যাসিনোকা-সহ টেন্ডারবাজি, ফুটপাত থেকে শুরু করে নানা ধরনের চাঁদাবাজি, জমি দখল, বাড়ি দখল, প্রতিপক্ষের ওপর আঘাত, সরকারি জায়গা দখল করে মার্কেট নির্মাণ, মাদক বিক্রিতে সহায়তা কর্মে ভাগেযোগে বিএনপি-জাতীয় পার্টির স্থানীয় নেতাদের মিলমিশ অনেকটা ওপেন সিক্রেট। মাসতুতো ভাই হিসেবে তারা সবাই এখন আবার স্বমূর্তিতে। তিন দলের এসব ‘রতœ’দের সামনে রেখে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোয় সন্ত্রাসীদের প্রকাশ্য আনাগোনা স্থানীয়দের আতঙ্কে ফেলেছে। কাউন্সিলর প্রার্থীদের কারও কারও সঙ্গে মাদক, চাঁদাবাজি, দখলসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত সন্ত্রাসীদের সখ্যতার খবর অনেক দিন থেকেই আলোচিত। এটা তাদের সামর্থ্য-হিম্মতেরও প্রমাণ। তাদের কয়েকজনের সঙ্গে বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীদের যোগাযোগও বহুল আলোচিত। আবার জেলে থেকেও ভোটের মাঠে ভূমিকা রাখছে কোনো কোনো সন্ত্রাসী। কারাগারে বা বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসীদের চেয়েও রাজধানী ঢাকায় দুর্ধর্ষ অনেক সন্ত্রাসী তৎপর রয়েছে। বর্তমান সরকারের আমলে নতুন অপরাধীর নাম থানার তালিকায় এখনো না ওঠায় তারা অনেকটা নিরাপদেই থেকে যাচ্ছে।

এবারের ঢাকা সিটি নির্বাচনের শুরুটা হয়েছিল উৎসবমুখর পরিবেশেই। প্রতীক বরাদ্দের পর ১০ জানুয়ারি জুমাবারে আনুষ্ঠানিক প্রচারের বিসমিল্লাহতে হেভিওয়েট সব প্রার্থীই শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার ওয়াদা করেছিলেন। মানুষ পুরোপুরি না হলেও কিছুটা আশ্বস্ত হয়েছিল। তার ওপর ক্যাসিনোর সূত্র ধরে শুরু হওয়া ধরপাকড়ও ছিল কিছুটা স্বস্তির বিষয়। আশা করা হয়েছিল ধড়িবাজরা মাঠে থাকবে না। কিন্তু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার মধ্যে যেন ভিন্ন একটা বার্তা পেয়েছে সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজরা। ম্যাজিকের মতো মাঠে ফিরে আসা তারা। কেউ কেউ সরাসরি দলীয় মনোনয়ন পেয়ে যায়। বাদবাকিরা হয়ে যায় প্রার্থীদের সাঙ্গপাঙ্গ। সেই সঙ্গে প্রার্থীদের পরিবেশ শান্ত রাখার অঙ্গীকারের দু-একদিনের মধ্যে বিক্ষিপ্ত কয়েকটি সংঘর্ষ এবং প্রচারে বাধার ঘটনা নির্বাচন নিয়ে মানুষের পুরনো শঙ্কাগুলোকে উসকে দিচ্ছে।

এসব ঘটনা যেন বড় না হয়, সে জন্য কার্যকর ভূমিকা নেওয়া নির্বাচন কমিশনের জরুরি দায়িত্ব। হামলার জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। ছোটখাটো ঘটনা থেকে বড় ঘটনা ঘটলে সেটা নির্বাচনী পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে। এমনিতেই গত জাতীয় নির্বাচনের অভিজ্ঞতায় সাধারণ মানুষের মধ্যে এ নিয়ে আস্থার সংকট আছে। এখন ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচন ঘিরে যদি প্রচার-প্রচারণার একেবারে শুরুতেই সংঘর্ষ-সহিংসতা শুরু হয়ে যায়, তা হলে সেই আস্থার সংকট আরও ঘনীভূত হবে। এসব সংঘর্ষের ঘটনা শুধু যে সার্বিক নির্বাচনী পরিবেশকেই বিঘিœত করবে না, আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রেও বিরূপ প্রভাব ফেলবে। আইন অনুযায়ী এখন ঢাকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নির্বাচন কমিশনের অধীন। প্রতীক বরাদ্দের আগে থেকেই প্রার্থীদের নির্ধারিত আচরণবিধি মেনে চলতে তাগিদ দিয়ে আসছে নির্বাচন কমিশন।

বিধি না মানলে প্রার্থী বা তার সমর্থকের সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদ- বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দ-ের বিধান রয়েছে। সেই সঙ্গে প্রার্থিতা বাতিলসহ নিবন্ধিত দলকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানার করারও বিধান করে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। শুনতে খারাপ লাগলেও আচরণবিধি অনেকটা কাগুজে বাঘের মতো। আবার এটি মূল সমস্যাও নয়। সমস্যার পেছনে অন্যতম কারণ টাকার ছড়াছড়ি। জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়ে ধনবান হওয়ার পাশাপাশি যাবতীয় অপকর্ম হালাল করা, সহযোগী বা পছন্দের লোকদের সুরক্ষা দেওয়ার ঘটনা ওপেন সিক্রেট ঘটনা। এটা একটা পদ্ধতিও। তা আমাদের সামাজিকতার সঙ্গে মিশে গেছে সংস্কৃতির মতো। তা আর তেমন অপরাধের পর্যায়ে নেই। এ ছাড়া নির্বাচনের মৌসুমে উড়ন্ত টাকার ভাগ হাতানো একটি বড় ফ্যাক্টর। প্রার্থীর বাইরে মাঠ দাবড়ানো হোমরা-চোমরারা মৌসুমি এ ভাগটা হাত ছাড়া করতে চায় না। প্রার্থীরাও নিজেদের স্বার্থে এদের ব্যবহার করেন। এরাও ব্যবহৃত হতেই চায়।

দেশ-দুনিয়ার বাস্তবতায় ঢাকায় ধনের সঙ্গে জন দেখেছে বড় দুই দল। মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে সেই দৃষ্টেই। ঢাকা উত্তর-দক্ষিণে মেয়রের পাশাপাশি কাউন্সিলর প্রার্থীদের মধ্যে কমজুরির সংখ্যা নেহায়েত কম। অঢেল অর্থ-বিত্তবান প্রার্থীদের ঘিরে অন্য ধনবানদের আয়োজনও ব্যাপক। টাকা উড়ছে ঢাকার অলিগলিতেও। এই টাকা কালো না সাদা সেই প্রশ্ন হালে পানি পাচ্ছে না। বরং নির্বাচনী ক্যাম্পে খরচপাতি নিয়ে প্রতিযোগিতা ও আলোচনার কদর বেশি। এর পরও প্রার্থীর পোস্টার ছাপানো, পরিবহন, কাগজ, কালি, ছাপাখানার খরচ, এগুলো টানানো, ক্যাম্প সাজানো ও পরিচালনার কাজে একটা টুকটাক খরচের তৈরি করা হিসাব ঠিকভাবেই দাখিল হবে নির্বাচন কমিশনে। এতে সমস্যা হয় না। কমিশন তা এক খোঁচাতেই কবুল করে নেয়। আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থায় এটাও বড় বা কোনো অপরাধমূলক ঘটনা নয়।

নির্বাচন কমিশনের বিধি অনুযায়ী একজন মেয়রপ্রার্থী তার ব্যক্তিগত খরচ বাবদ সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা এবং নির্বাচনী কাজে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা খরচ করতে পারবেন। আর কাউন্সিলর প্রার্থীরা পারবেন ব্যক্তিগত খাতে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা এবং নির্বাচনী কাজে সর্বোচ্চ ৬ লাখ টাকা। বাস্তব ভিন্ন। উল্লিখিত টাকা প্রতিদিন অহরহ খরচ করছেন প্রার্থীরা। সীমা ছাড়ানো এ অর্থ ব্যয় ধরার কোনো সুযোগ নেই। এ ছাড়া ক্যাসিনোকা-ের সঙ্গে জড়িতদের খরচের বাহার আরও বেশি। কোনো বাদ-প্রতিবাদ নেই। কারও পক্ষে চ্যালেঞ্জ করাও কঠিন। এর আগে দুদক যাদের বিরুদ্ধে কোটি টাকার দুর্নীতির মামলা করেছে, তাদের কেউ কেউ মাত্র ১৬ লাখ টাকার সম্পদ দেখিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট দায়ীরা এ নিয়ে মোটেই উদ্বিগ্ন বা ব্যথিত নন। সূত্র : আমাদেরসময়

মোস্তফা কামাল : সাংবাদিক-কলাম লেখক ও বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত