প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মেডিকেল লাইফ ডিপ্রেশন ও কিছু করণীয়

Medical Life Depression

ডা. পুষ্পিতা রায় : পৃথিবীর কঠিনতম এক জগতের অধিবাসী প্রত্যেকটা মেডিকেল স্টুডেন্ট।ডিপ্রেশন এই জগতের সবচেয়ে শক্তিধর ও নিকৃষ্টতম প্রতিদ্বন্দ্বী।একে পরাজিত করে তোমাকে জয়ী হতেই হবে।

পড়ালেখা বিষয়ক আবশ্যিক যোগ্যতার উচ্চ মানদণ্ড, সময়সীমা নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রবল দাবী,সামাজিক সমন্বয়সাধন, বৃহদায়তনের কাজের পরিমাণ, সময়ের সাথে অঙ্গীকারবদ্ধ থাকা,পরীক্ষা কিংবা সার্বিক মূল্যায়নের সংখ্যাধিক্য, অপ্রত্যাশিত রাতজাগা এবং সর্বোপরি ক্লিনিক্যাল জগতের মাত্রাধিক্য চাপ সব মিলিয়ে মেডিকেল লাইফে ডিপ্রেশন আসাটা খুবই স্বাভাবিক একটা পদ্ধতি কিন্তু তাকে প্রশ্রয় দেয়া যাবে না।ডিপ্রেশনকে প্রতিহত করতে হবে। ডিপ্রেশনের ফিজিওলজিক্যাল ও সাইকোলজিক্যাল দুই ধরনের কারণই আছে এবং দুই ধরণের উপসর্গও রয়েছে। আমি এখানে সে বিষয়ে আলোচনা করবো না। আমি শুধুমাত্র কোনো রকম ওষধ এবং মেডিকেল এ্যাসিস্ট্যান্স ছাড়া ডিপ্রেশন কে প্রতিহত করার কিছু পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করবো।

প্রথমত তোমাকে জানতে হবে এই ডিপ্রেশনটা তোমার একার নয়।পৃথিবীর প্রত্যেকটা মেডিকেল স্টুডেন্ট এই একই পদ্ধতির মধ্যে দিয়েই বের হয়ে এসেছে।কারোর হয়তো একটু বেশি,কারোর একটু কম।কারোর মধ্যে শেয়ার করার প্রবণতা বেশি,কারোর ভীষণ কম।যে কখনো শেয়ার করে না সে ডিপ্রেশড্ না এই ধারণা টা ভুল।কমবেশি ডিপ্রেশন প্রত্যেকটা মেডিকেল স্টুডেন্ট এর উপরই ভর করে।”তুমি একা নও”- এই ভাবনাটাকে নিজের ভেতর বেড়ে উঠতে দাও।তোমাকে শিথিল করবে এই ভাবনা।যে রাস্তায় যুগ যুগ ধরে পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ মানুষ হেঁটে এসেছে,এখনো হাঁটছে সেই দূরূহ রাস্তাটা তোমার একার নয়।তুমি আমাদেরই একজন।চোখ বন্ধ করে এই সত্যকে স্বীকার করে নাও।শান্ত হবে।

বুঝে পড়ার অভ্যাস তৈরি করো।একটা বাক্যও না বুঝে পড়বে না। কঠিন বিষয়টাকে সহজ করার চেষ্টা করো। মনে রাখবে তোমাকে মানুষের জীবন নিয়ে লড়তে হবে, কোসো মেশিন না। রেজাল্ট এর চেয়ে বেশি গুরুত্ব দাও ব্যাসিকে। রেজাল্ট এমনিই ভালো হবে। পরীক্ষার আগের রাতে পড়েও রেজাল্ট ভালো করা যায় কিন্ত সেটা তোমার দীর্ঘস্থায়ী কৃতিত্বের নির্ণায়ক নয়। তোমার যদি ব্যাসিক দুর্বল থাকে জীবনের লম্বা রাস্তায় আটকে যেতে হবে। পড়া যতো কঠিন হতে থাকবে ডিপ্রেশন বাড়তে থাকবে।তোমার যদি ব্যাসিকে দৃঢ়তা থাকে কঠিন বিষয় সহজ হতে থাকে। পারদর্শিতা বৃদ্ধি পাবে। পরীক্ষার হলে মনোবল বৃদ্ধি পাবে। এই দৃঢ়তা আর মনোবল ডিপ্রেশনের সাথে যুদ্ধ করবে। না বুঝে পড়ার অভ্যাস আজ থেকে বন্ধ করে দাও। তোমাকে জানতে হবে। প্রচুর জানতে হবে।প্রচুর সময় দাও ব্যাসিকে। পড়ালেখায় নিজেকে স্মার্ট করে তোলো যাতে করে ডিপ্রেশন ব্যাপারটাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে দূরে ঠেলে দেয়া যায়।

পরিবারের সাথে কথা বলো। নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে এমন মানুষ প্রয়োজন যে তোমার মস্তিষ্ক চেনে, তোমার মস্তিষ্কের ক্ষুধা সম্বন্ধে নিখুঁত বিশ্বাস ও ধারণা বহন করে।তারাই তোমার পরিবার। ডিপ্রেশনের অনেক ক্যাটাগরি রয়েছে। তবে প্রথম পাঁচ বছরে “মেজাজের ওঠা-নামা কিংবা অস্থিরতা” এই সমস্যাই সর্বাধিকভাবে নিরীক্ষিত হয়েছে। সেই ক্ষেত্রে তোমাকে প্রচুর কথা বলতে হবে। এমন মানুষের সাথে কথা বলতে হবে যারা তোমার মেজাজের সুরকে আন্দোলিত করার ক্ষমতা রাখে। আধাঘন্টা পরিবারের সাথে ফোনে বকবক করো প্রাণখুলে। এতে করে অবিলম্বে তোমার মেজাজের অবস্থান্তর ঘটবে এবং পুণরায় পড়ায় নিবিষ্ট হওয়া তোমার জন্য সহজলভ্য হয়ে উঠবে।

ঘনিষ্ঠ বন্ধু তৈরি করো। একেবারেই একান্ত নিজস্ব বলে কিছু বন্ধু থাকতে হবে। অন্তত একজন তো থাকতেই হবে। ডিপ্রেশন যখন একেবারে অনিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে চলে যাবে বন্ধুকে ফোন দাও। বলো, “দোস্ত চল্ ঘুরে আসি”। বন্ধুত্বের গভীরতা এমন হতে হবে যেন সে তৎক্ষনাৎ রাজি হয়ে যায়। দু‘জনের মধ্যে নির্ভরশীলতা আর বিশ্বাসের সেতুবন্ধন মজবুত হতে হবে। তোমার কথাগুলো শেয়ার করো। নিজেকে হালকা মনে হবে। একসাথে ফুচকা, চা কিংবা এক কাপ কফি খাও। তারপর ঘরে ফিরো। মনে রাখবে চার ঘন্টা ডিপ্রেশনে ডুবে থেকে বই নিয়ে বসে না থেকে দুই ঘন্টা বেস্ট ফ্রেন্ড এর সাথে ঘুরে বকবক করলে মস্তিষ্কের সক্রিয়তা অনেক গুণে বৃদ্ধি পায়। বন্ধুত্বে কোন শূন্যস্থান থাকা যাবে না। দ্বিধাহীনভাবে সব শেয়ার করা যায় এমন বন্ধুত্ব হতে হবে। Be careful & never choose a wrong person to be your best friend.This can bring fatal outcome.

যদি কোনো শিক্ষককে ভীষণ নির্ভরযোগ্য মনে হয় তার কাছে তোমার মানিসক যন্ত্রণার বর্ণনা দাও। প্রত্যেকটা ডাক্তার একজন ভালো কাউন্সিলর। এই ডিপ্রেসিভ পিরিয়ডটা তারা সবাই পার করে এসেছেন। যে কারণে,অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের কাউন্সেলিং তোমার মানসিক স্থিরতায় ভীষণ শক্তিশালী অবদান রাখবে। নিজ মেডিকেলের শিক্ষক হলে অনেক সময় পড়ালেখা বিষয়ক মানসিক সমস্যা সমাধানে অধিকতর কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

দুই থেকে তিনজন সিনিয়রের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলো। হতে পারে উনি নিজ মেডিকেল কিংবা অন্য কোন মেডিকেলের। এতোটাই বন্ধুত্বপূর্ণ হতে হবে যাতে করে তোমার আস্থা আহত না হয়। তাদের দেয়া সাজেশন গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করো। তাদের অভিজ্ঞতার গল্প শোনো। জানতে চাও তোমার মতো একই অবস্থায় তাদের তৎকালীন সময়গুলো কেমন ছিলো। ধৈর্যের সাথে উত্তর গুলো শোনো। তোমার সাথে মিলে যাবে। সিনিয়রদের থেকে শোনা অভিজ্ঞতা তোমাকে প্রত্যয়ী করে তুলবে। সংশয় দূর করবে। সফলতার চেয়ে তাদের ব্যর্থতার গল্পে বেশি গুরুত্ব দাও। দেখবে তোমার মানসিক শক্তিমত্তা মজবুত ও অবিচল হবে। পরবর্তী দিনগুলোও সতেজ হবে।

ফ্রেশ শাওয়ার, মিউজিক ও টি থেরাপি ফলো করো। প্রচণ্ড ডিপ্রেশন যখন কয়েক ঘন্টা শেষ করে দিচ্ছে তখন বই বন্ধ করে উঠে পড়ো। একটা ফ্রেশ শাওয়ার নাও। এক মগ গরম কফি কিংবা চা বানাও। ছাদে চলে যাও।মৃদু আওয়াজে পছন্দের প্লেলিস্ট ওপেন করো। তারপর আকাশের দিকে তাকাও। জীবন সম্বন্ধে গভীরভাবে ভাবো। অতীতে পার করে আসা সমস্ত প্রতিবন্ধকতায় দুঃসাহসী নিজেকে আরও একবার খুঁজে বের করো। শান্তি অনুধাবন করো।নিজের উদ্ভাবনী শক্তিকে আবিষ্কার করো। সব মিলিয়ে ৩০-৪০ মিনিট নিজকে দাও। তারপর ফিরে যাও। এবার মনোযোগ দাও। তিন ঘন্টার পড়া ত্রিশ মিনিটে হবে।

পছন্দের লেখকের উপন্যাস পড়ার অভ্যাস করো। মনে রাখবে উপন্যাস পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সুকৌশলী যোগ্যতা বহন করে।উপন্যাস তোমাকে জীবনবোধের সংস্পর্শে নিয়ে যাবে। তোমাকে গতানুগতিক জীবন থেকে সাময়িক অব্যাহতি দিবে। তোমাকে আরও বেশি বাস্তববাদী ও প্রামাণিক করে তুলবে। মস্তিষ্কে পুষ্টির যোগান দিবে। অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের কাছ থেকে উপন্যাস সম্বন্ধে সাজেশন নিতে পারো। উপন্যাস জীবনের গল্প বলবে। এই গল্প তোমার বাস্তব জগতকে দীর্ঘ করবে। তোমাকে সাবলীল করবে। আজই একটা উপন্যাস পড়া শুরু করো।

যারা অতিরিক্ত ডিপ্রেশনে ভুগছো তারা মেডিটেশন কিংবা যোগব্যায়ামের অভ্যাস করো একটু একটু করে। প্রচণ্ড ভালো ফলাফল পাবে।অবসর সময়ে ভালো কাজ করো।রান্না করো। বন্ধুদের খাওয়াও। পছন্দের কাজ করো।ছবি আঁকো। নিজের আঁকা ছবিগুলো মাঝে মাঝে দেখো। নিজের ইচ্ছাগুলোকে প্রায়োরিটি দাও। নিজের মধ্যে সামাজিকতার বিকাশ ঘটাও কিন্তু সামাজিক মাধ্যমের ওপর নির্ভরশীলতা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনো। নিজেকে যতোটুকু পারো শৃঙ্খলিত ও কর্মক্ষম রাখার চেষ্টা করো।

সর্বশেষ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নিজেকে সংস্কৃতির সাথে জড়িত রাখার প্রবণতা বাড়াও। সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে আবিষ্ট রাখো নিজেকে এর তাৎপর্য গভীর। সংস্কৃতি তোমার স্বাস্থ্যকর, পরিষ্কার ও সফল জীবন নিশ্চিত করে। সংস্কৃতি দিয়ে ডিপ্রেশনকে খুন করো।

উপরের সব আলোচনাই তোমাদের মনকে সাবলীল ও সুস্থ রাখার উদ্দেশ্যে লেখা । তোমাদের মন ভালো থাকলে তোমরা ভালো থাকবে। তোমরা ভালো থাকলে ক্যাম্পাসটা ভালো থাকবে। অফুরন্ত শুভকামনা রইলো। আজ থেকে বদলে যাও। আবার নতুন করে শুরু করো। জয় তোমারই হাতে আসবে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত