প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ই-সিগারেটের রমরমা ব্যবসা চলছে রাজশাহীতে

মুসবা তিন্নি : রমরমা বিজ্ঞাপন দিয়ে রাজশাহীতে চলছে ই-সিগারেটের রমরমা ব্যবসা। তাদের লোভনীয় অফার দিয়ে ছোট-বড় দোকনগুলোতে এসব বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ভোক্তাদের আকৃষ্ট করছে। তামাক পণ্যের প্রচারণা নিষিদ্ধ হলেও রাজশাহীতে এর প্রচার বন্ধে কোন উদ্যোগ নেই। এদিকে, খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, রাজশাহীতে তরুণদের মধ্যে ই-সিগারেটের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। অথচ, সাধারণ সিগারেটের তুলনায় ই-সিগারেটের ক্ষতি অনেক বেশি।

যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্তত ২৩টি দেশে নিষিদ্ধ হয়েছে ই-সিগারেট। তবে বাংলাদেশের ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইনে ‘ই-সিগারেট’ বিষয়ে কিছু বলা নেই। তবে, এই আইনের ১০ এর ৩ উপ ধারায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বিক্রির জন্য প্রযোজ্য লেখা ব্যতিত সকল পণ্য অবৈধ্য। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, রাজশাহীতে যেসব ই-সিগারেট বিক্রি হচ্ছে সেগুলোর কোনটিতেই বাংলাদেশে বিক্রির কথা লেখা নেই। অর্থাৎ অবৈধ পথে আসা ই-সিগারেটই দখল করে নিয়েছে রাজশাহীর বাজার।

বিজ্ঞাপন বন্ধ না হওয়ায় রাজশাহীতে দিন দিন ইলেকট্রনিক বা ই-সিগারেটের মরণ নেশায় আসক্ত হচ্ছে কিশোর, তরুণ ও শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষ। অনলাইন জগতের বিভিন্ন পণ্য বিক্রির ওয়েবসাইটে তরুণ প্রজন্মের মনকাড়া ই-সিগারেটের বিজ্ঞাপন কিংবা বন্ধুদের খপ্পরে পড়ে মেধাবীরা এ নেশায় আক্রান্ত হচ্ছে। সাধারণ সিগারেটের নেশার বিকল্প, ক্ষতি কম হওয়ার ভুল ধারনা কিংবা নিজেদেরকে স্মার্ট ধূমপায়ী ভেবে তরুণ প্রজন্ম এ নেশায় বেশি আসক্ত হচ্ছে।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে, নিউ মার্কেট, সাহেববাজার, লক্ষ্মীপুর, সোনাদীঘি মোড়ের বেশ কিছু দোকানে ই-সিগারেট বিক্রি হচ্ছে। নগরীর বিভিন্ন পাবলিক ও প্রাইভেট কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ এ নেশায় আসক্ত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা। এছাড়াও ক্রেতা বাড়াতে রাজশাহীর বিভিন্ন দোকানে লাগানো হয়েছে বড় লম্বা রঙ বেরঙের ব্যানার। এছাড়া দেওয়া হচ্ছে লিফলেটও। রাজশাহীর সাহেববাজারে মনিচত্তর এলাকায় এরফান পানের দোকনের সামনে বড় ব্যানারে লিখা আছে ভ্যাপ জোন। এখানে লিকুইড ও ভ্যাপের মেশিন পাওয়া যায়। এছাড়াও সেখানে আছে বিভিন্ন ধরণের ভ্যাপ সেবনের ছবিও। একই দৃশ্য নিউ মার্কেট এলাকায়। সেখানেও লাগানো আছে ব্যানার। এছাড়াও দোকনের সামনেই টাঙ্গানো আছে এসব সিগারেট। শুধু এই দুই জায়গাতেই নয় পুরো নগরীতেই ই-সিগারেটের ছড়াছড়ি। রয়েছে পোস্টার।

ই-সিগারেট বিক্রয়কারী এরফান পান স্টোরের মালিক মঞ্জুর রহমান জনি বলেন, আগের মত আর চাহিদা নেই। বিজ্ঞাপনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি তারা নিজেরাই তৈরী করে লাগিয়েছেন, ক্রেতাকে কাছে আনার জন্য। নিষিদ্ধ কিনা বিষয়টি তারা সেভাবে ভাবেন নি। তবে এখন এটি সরিয়ে নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

নাম না প্রকাশ করে সাহেব বাজারের এক বিক্রেতা বলেন, এটি আমরা ঢাকা থেকে কিনে আনি। প্রতিটি আমাদের কেনা পড়ে ৪শ থেকে ৫শ টাকা করে। এছাড়া প্রতিটি রিফিল ৫০ থেকে ৮০ টাকা কেনা পড়ে। তবে এগুলো দোকান থেকে কেনার আগ্রহ কম থাকায় তারা বিক্রির আশায় অনলাইনে ও দোকানে বিজ্ঞাপন দেয়। এগুলো বিক্রিতে বেশি লাভ হয় তাই এগুলোতে দিন দিন ব্যবসায়ীদের চাহিদাও বাড়ছে।

এক শিক্ষার্থী জানান, বাজারের একটি দোকানে ই-সিগারেটের বিজ্ঞাপন দেখেই ক্রয় করে তিনি এই নেশার যাত্রা শুরু করেন। ই-সিগারেট সেবন করা দেখে তার অনেক বন্ধুই এখন এই নেশায় আসক্ত বলে জানান তিনি। তারা এখন নিজের পছন্দের ফ্লেভার বাছাই করে দোকান থেকে বা অনলাইনে অর্ডার দেন এবং সেগুলো সেবন করেন। ঝুঁকি জেনেও তারা এই নেশায় আসক্ত বলে জানান তারা।

এদিকে, চিকিৎসকরা বলছেন, এটির ক্ষতির মাত্রা অনেক বেশি। ঝুঁকি আছে বিভিন্ন রোগের। বারিন্দ মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞ ডা: বি কে দাম জানান, সাধারণ সিগারেটের তুলনায় ই-সিগারেট বেশি ক্ষতিকারক। এটি বিভিন্ন কেমিক্যাল দিয়ে তৈরি। যা আমাদের হার্টসহ অন্যান্য ক্ষতি করে। তবে এটি অসক্তি বাড়ায়।

রাজশাহীর উন্নয়ন সংস্থা অ্যাসোসিয়েশন ফর কম্যুনিটি ডেভেলপমেন্ট-এসিডির তামাক নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের প্রোগ্রাম এসিডি’র এডভোকেসি অফিসার শরিফুল ইসলাম শামীম বলেন, ই-সিগারেট সেবনের ভয়াবহতা বিবেচনায় আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও ই-সিগারেট নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্তত ২৩টি দেশে নিষিদ্ধ হয়েছে এই ই-সিগারেট। বাংলাদেশের ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইনে ই-সিগারেট বিষয়ে কিছু বলা নেই। এছাড়া এই আইনের ১০ এর ৩ উপধারায় বলা হয়েছে বাংলাদেশে বিক্রির জন্য প্রযোজ্য লেখা ব্যতিত সকল পণ্য অবৈধ্য। তবে এটি প্রসাশনের পক্ষ থেকে কোন উদ্যগ গ্রহণ করলেই এটি বাজারে আসতে পারবে না। এছাড়াও আইনে ই-সিগারেট সম্পর্কিত ধারা সংযুক্ত করে বাংলাদেশে দ্রুত এটি নিষিদ্ধ করতে সরকারের নিকট জোর দাবি জানান তিনি।

এ বিষয়ে রাজশাহী জেলা প্রশাসক হামিদুল হক জানান, বাংলাদেশের ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইনে ‘ই-সিগারেট’ বিষয়ে কিছু বলা নেই। তাই কোন উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারছি না। তবে এটি সরকারে দৃষ্টিতে আনার জন্য সংযোজিত করা হবে। আমি নিজেও মনে করি এটি বন্ধ হওয়া দরকার। এছাড়াও আইনটি পর্যবেক্ষণ করে দেখে পরবর্তী নির্দেশনা দেয়া হবে বলে জানান তিনি।

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত