প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সম্মেলনকে ঘিড়ে আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রে নেই কোন চমক, বাড়ছে নারী সদস্যের সংখ্যা

ইয়াসিন আরাফাত : আগামী ২০-২১ ডিসেম্বর রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় সম্মেলন। এ উপলক্ষে সভানেত্রীর ধানমন্ডি কার্যালয়ে সমাগম বেড়েছে সাবেক ছাত্রনেতা, জেলার প্রবীণ নেতা থেকে শুরু করে দলীয় এমপিদের। গণভবনেও নিয়মিত যাওয়া-আসা করছেন পদপ্রত্যাশীরা। যদিও এবারের সম্মেলনে বাড়ছে না কার্যনির্বাহী সংসদ ও উপদেষ্টা পরিষদের আকার। গঠনতন্ত্রেও থাকছে না বড় কোনো চমক। তবে এবারের কেন্দ্রীয় কমিটিতে বাড়ছে নারী সদস্যের সংখ্যা। ঘোষণাপত্রে প্রথমবারের মতো থাকছে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের উন্নয়নে অঙ্গীকার। এছাড়া জেলা-উপজেলায় উপদেষ্টা পরিষদের সংখ্যা নির্দিষ্ট করে দেয়াসহ আনা হচ্ছে ছোটখাটো কিছু সংশোধনী।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র উপকমিটির সদস্য সচিব আফজাল হোসেন জানান, এবার দলের গঠনতন্ত্রে বড় কোনো চমক নেই। গঠনতন্ত্র সংশোধনী খসড়া প্রস্তাব তৈরির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। নির্ধারিত সময়েই এগুলো পৌঁছে দেয়া হবে দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনার কাছে। এছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নৌকা প্রতীক থাকবে কিনা, সে বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। যেহেতু নৌকা মার্কা স্থানীয় পর্যায়ে চালু ও মানুষ তাতে অভ্যস্ত হয়েছে তাই নৌকাকেই প্রতীক হিসেবেই রাখা হবে। তবে ছোটখাটো যেসব সংযোজন ও বিয়োজন রয়েছে তার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে।

তিনি আরও জানান, কেন্দ্রীয় কমিটির মতো তৃণমূলেও এবার দলের ‘থিংক ট্যাংক’ হিসেবে পরিচিত উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যের সংখ্যা নির্দিষ্ট করে দেয়া হচ্ছে। বৈঠকে জেলা কমিটিতে ২১ এবং উপজেলা ১৭ জন উপদেষ্টা করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের প্রাথমিক সদস্য পদের ফরমে মোবাইলে নম্বর এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর সংযুক্ত করার বিষয়ে প্রস্তাব করা হবে। একই সঙ্গে গঠনতন্ত্র অনুসারে এতদিন আওয়ামী লীগের আইনজীবীদের সংগঠনের নাম ছিল ‘আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ’। বর্তমানে এই সংগঠনটির নাম হবে ‘বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ’। পরিবর্তিত নামটি এবার গঠনতন্ত্রে সংযোজন করা হবে। এ ছাড়া কিছু শব্দ ও ভাষাগত পরিমার্জন আসবে গঠনতন্ত্রে। গঠনতন্ত্রের ‘অঙ্গীকার’ শিরোনামের ১০ নম্বর উপধারায় ‘জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠন’ এর সঙ্গে মাদক যুক্ত করে ‘জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, মাদক ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠন’ করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। একই শিরোনামের ১৭ নম্বর উপ-ধারায় ‘ভাতের অধিকার নিশ্চিত করা’র স্থলে ‘খাদ্যের পুষ্টির অধিকার’ যুক্ত করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে দলীয় নেতাদের যুক্তি হচ্ছে, আওয়ামী লীগ সরকারের অভাবনীয় উন্নয়ন ও অগ্রগতির ফলে ইতোমধ্যে দেশের মানুষের ‘ভাতের অধিকার’ নিশ্চিত হয়েছে। এখন পুষ্টিমান নিশ্চিত করতে হবে। এ কারণেই দলীয় অঙ্গীকারনামায় এটি যুক্ত করা হচ্ছে। এবার প্রথমবারের মতো আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র ও ঘোষণাপত্রে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের জীবন যাত্রার মান উন্নয়নের অঙ্গীকার করা হচ্ছে।

এদিকে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরণে ‘গড়তে সোনার দেশ, এগিয়ে চলেছি দুর্বার, আমরাই তো বাংলাদেশ’ এই স্লোগানকেই চূড়ান্ত করা হয়েছে এবারের সম্মেলনের স্লোগান হিসেবে। এবারের সম্মেলনের মাধ্যমে ৮১ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবর্তন আসতে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে দলের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক সূত্র থেকে। সভাপতি পদে শেখ হাসিনার কোনো বিকল্প এখনো তৈরি হয়নি আওয়ামী লীগে। ফলে তিনিই যে সভাপতি থাকছেন, এটা অনেকটা নিশ্চিত। তবে অন্যান্য পদে কে আসবে তা নিয়ে চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদে পরিবর্তন আসছে কি না, তা নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে রয়েছে ব্যাপক কৌতূহল।

তবে এবারের সম্মেলনের মধ্য দিয়ে প্রায় ৩৩ শতাংশ নারী দলের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে আসতে পারে বলে জানিয়েছে দলের একাধিক সুত্র। কারণ নির্বাচন কমিশনের বাধ্যতামূলক নির্দেশনা থাকায় আগামী ২০২০ সালের মধ্যে প্রত্যেক রাজনৈতিক দলকে ৩৩ শতাংশ নারী নেতৃত্ব আনতে হবে। সে কারণেই এবার কমিটিতে নারী নেত্রীর সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। এর জন্য দলের পক্ষ থেকে যোগ্য নারীদের বিষয়ে খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি দিক বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে। ছাত্র রাজনীতিতে বিভিন্ন সময়ে যারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, সততার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ, শহীদ বুদ্ধিজীবী পরিবারের সন্তান, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, বারবার মনোনয়নবঞ্চিত ত্যাগী রাজনীতিক, তরুণ সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্য ও উচ্চশিক্ষিত নারীদের প্রাধান্য দেয়া হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবারের সম্মেলনের মধ্য দিয়ে সৎ, ত্যাগী ও ক্লিন ইমেজের নারী নেত্রীদের দলে ঠাঁই দিতে চায় আওয়ামী লীগ। কারও কারও বিষয়ে ইতোমধ্যে নীতিগত সিদ্ধান্তও হয়েছে।

জানা গেছে, বর্তমানে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে যেসব নারী নেতৃত্ব দলের বিভিন্ন পদে আছে তাদের পুনরায় রাখা হতে পারে। তবে তাদের কারও কারও পদ বদল হতে পারে। আসন্ন সম্মেলনে নতুন করে যুক্ত হতে পারেন আরও বেশ কয়েকজন নারী। এ বিষয়ে আলোচনায় রয়েছেন শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলামের কন্যা ও প্রয়াত সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের ছোট বোন ডা. সৈয়দা জাকিয়া নূর লিপি, শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা. এএফএম আবদুল আলীম চৌধুরীর মেয়ে ডা. নুজহাত চৌধুরী শম্পা, ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ও সাবেক সাংসদ ফজিলাতুন নেছা বাপ্পি, সাবেক সাংসদ সানজিদা খানম, বরিশালের প্রয়াত মেয়র শওকত হোসেন হিরনের স্ত্রী জেবুন্নেছা হিরন, জামালপুরের সংরক্ষিত নারী সাংসদ ও মেজর জেনারেল খালেদের মেয়ে মাহজাবিন খালেদ, শহীদ বুদ্ধিজীবী আলতাফ মাহমুদের মেয়ে শাওন মাহমুদ, কুমিল্লা জেলা আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা আফজল খানের মেয়ে সংরক্ষিত আসনের সাংসদ আঞ্জুম সুলতানা সীমা।

এবারের সম্মেলন উপলক্ষে গঠিত করা হয়েছে ১১টি উপকমিটি। সম্মেলন সফল করতে সব ধরনের প্রস্তুতি এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে। আসন্ন সম্মেলনের মঞ্চ ও সাজসজ্জা উপকমিটি সূত্রে জানা গেছে, দলের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন আয়োজনের মঞ্চ নিয়ে বিশেষ পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। যেহেতু ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে পালিত হবে মুজিববর্ষ। এর আগে ১০ জানুয়ারি থেকে শুরু হবে মুজিববর্ষের কাউন্টডাউন। আর মুজিববর্ষের আগে আওয়ামী লীগের এই সম্মেলনের সভামঞ্চে থাকবে নজরকাড়া সাজসজ্জা ও আলোর ঝলকানি। দলীয় সুত্রে জানা গেছে, প্রতি বছর আওয়ামী লীগের সম্মেলনে রাজধানী জুড়ে যে সাজসজ্জা করা হয় এবার তা হচ্ছে না। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ছাড়া অন্য কোথাও তেমন সাজানো হবে না। এর কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, যেহেতু আগামী বছর মুজিববর্ষ শুরু হচ্ছে। তাই আওয়ামী লীগের মূল ফোকাস থাকছে মুজিববর্ষকে ঘিরে। দায়িত্বশীল নেতারা জানিয়েছেন, ২০ ডিসেম্বর সম্মেলনের সূচনা হলেও ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যান সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে যাবে সম্মেলনের জন্য। এরপর ১৬ থেকে ১৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৪দিন সম্মেলনস্থল থাকবে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত। তারা এই সময়ের মধ্যে সম্মেলনস্থলটি ঘুরেফিরে দেখতে পারবেন।

সম্মেলন উপলক্ষে, অভ্যর্থনা উপকমিটির দাওয়াতপত্র ছাপানোর এবং নিমন্ত্রণ জানানোর কাজ প্রায় শেষ। এবারের সম্মেলনে ২৫ হাজার অতিথিকে পাটের ব্যাগ উপহার দেবে প্রচার ও প্রকাশনা উপকমিটি। ওই ব্যাগে আওয়ামী লীগের ইতিহাস সংবলিত একটি সুভেনি, শোক প্রস্তাব, দলের সভানেত্রী ও সাধারণ সম্পাদকের ভাষণ থাকবে। একশ চিকিৎসক নিয়ে ১২টির মতো প্রাথমিক চিকিৎসা কেন্দ্র প্রস্তুত করছে স্বাস্থ্য উপকমিটি। সম্পাদনা : মাজহারুল ইসলাম

সর্বাধিক পঠিত