প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মানছে না প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা >> শীর্ষ পদে নৌকা বিরোধীরা

**নৌকা সমর্থকদের স্থান হচ্ছে না দলে *** তৃণমূল আ.লীগে সাংসদের একচেটিয়া দাপট *** নেতৃত্ব পাচ্ছে সাংসদ পরিবার ও পছন্দের ব্যক্তিরাই ****

ডেস্ক রিপোর্ট  : তৃণমূল আওয়ামী লীগকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ কাজে আসছে না। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় দল পুনর্গঠনে প্রধানমন্ত্রীর কড়াকড়ি নির্দেশনা আমলে নিচ্ছেন না স্থানীয় সাংসদ ও নেতারা।

তৃণমূল আওয়ামী লীগের চলমান সম্মেলনে স্থানীয় সাংসদেরই একচেটিয়া প্রভাব থাকছে। উপজেলার নৌকাবিরোধীরাই পাচ্ছেন শীর্ষ পদ, নৌকা সমর্থকরা ঠাঁই পাচ্ছেন না দলে।

মূলত সাংসদ যাকে চাচ্ছেন তিনিই নেতৃত্বে আসছেন। অনেক স্থানে সাংসদের ভাইসহ পরিবারের সদস্যরা আসছেন মূল দায়িত্বে। যা নিয়ে তৃণমূল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মাঝে চরম ক্ষোভের সঞ্চার হচ্ছে।

আগামী ২০ ও ২১ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। ওই সম্মেলনের আগেই আগামী ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে তৃণমূল সম্মেলন শেষ করার নির্দেশনা দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বিতর্কিত ও ভিন্নপন্থিদের হাত থেকে বের করে একটি পরিচ্ছন্ন ও যোগ্য নেতৃত্ব গড়ে তুলতে চান তিনি। এজন্য কেন্দ্র থেকে তৃণমূল— সর্বত্র বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে সম্মেলনের মাধ্যমে দলের জন্য ত্যাগী, পরীক্ষিত ও মেধাবীদের নেতৃত্বে আনার নির্দেশনা দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর সারা দেশে জেলা, উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন এবং ওয়ার্ডপর্যায়ের সম্মেলন শুরু হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর মেয়াদোত্তীর্ণ জেলা-উপজেলা কমিটির সম্মেলন ঘিরে সরগরম তৃণমূল আওয়ামী লীগের রাজনীতি। দলের দায়িত্বশীল পদে থাকতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন ত্যাগী ও পরিশ্রমী নেতারা। কিন্তু মাঠের রাজনীতির চিত্র ভিন্ন। নির্দেশনার তোয়াক্কা করছেন না স্থানীয় সাংসদ ও সাংসদপন্থি নেতারা।

মূলত তারা ক্ষমতার রাজত্ব করছেন নির্বাচনি এলাকাজুড়ে। তাদের ক্ষমতার কাছে পাত্তা পাচ্ছেন না তৃণমূলের ত্যাগী, পরিশ্রমী, ক্লিন-ইমেজ ও বিতর্কমুক্ত নেতারা। সাংসদ ও সাংসদপন্থি নেতাদের বলয়ভিত্তিক নেতৃত্ব নিয়ে বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে।

আওয়ামী লীগ সূত্র মতে, জেলা-উপজেলায় আওয়ামী লীগের রাজনীতির ত্রাণকর্তা স্থানীয় সাংসদরা। তারা সংসদীয় ক্ষমতার দাপটে কোথাও কোথাও তৈরি করেছেন আ.লীগ বনাম এমপিলীগ। তাদের এসব কর্মকাণ্ডের কারণে কোণঠাসা দলটির ত্যাগী ও পরিশ্রমী নেতাকর্মীরা।

তবে চলতি তৃণমূলের সম্মেলনের মাধ্যমে স্থানীয় প্রভাবশালী এমপিদের বলয় ভেঙে দিতে চান আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দায়িত্বশীল নেতাদের এ বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি।

সূত্র আরও জানায়, এমপি ও এমপিপন্থি নেতাদের রাজনীতির মাঠে এমন অবস্থানের কারণে ক্ষুব্ধ আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ জন্য উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে শীর্ষ পদে স্থানীয় সাংসদদের না রাখতে দায়িত্বশীল নেতাদের নির্দেশনা দিয়েছেন।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিদের্শনা আছে— কোনো সংসদ সদস্য উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক পদে প্রার্থী হতে পারবেন না। তবে যারা ইতোমধ্যেই হয়েছেন, সেগুলো আমরা খতিয়ে দেখছি।

যারা এমপি হতে পারেননি, তারা যেন নেতা হওয়ার সুযোগ পান। উপজেলাপর্যায়ে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক হতে পারবেন না এমপিরা। গত অক্টোবর মাসে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে নৌকার বিরোধিতাকারী প্রার্থী, মদতদাতা ও নেতাদের শনাক্ত করে সতর্ক করা হয়।

দলকে বিতর্কিত করা ওইসব নেতাদের এবং অনুপ্রবেশকারীদের শনাক্ত করে আগামী সম্মেলনের মাধ্যমে পদে না আনার সিদ্ধান্ত জানায় কেন্দ্রীয় হাইকমান্ড। প্রতিটি জেলা-উপজেলা কমিটির নেতাদের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করার জন্য চিঠি দেন।

বারবার সতর্ক করলেও তৃণমূলের ত্রাণকর্তা হিসেবে স্থানীয় সাংসদরাই আবির্ভূত হচ্ছেন। আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতা নির্বাচিত হচ্ছেন এমপির পছন্দেরই লোকজন। সম্মেলন হওয়া একাধিক জেলায় এমন ঘটনাই ঘটেছে।

সাংসদ যাদের চাইছেন, তারাই নেতৃত্বে আসছেন। উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে নৌকার বিরোধিতাকারীদের গুরুত্বপূর্ণ পদে আনা হচ্ছে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর অন্যতম সদস্য কাজী জাফরুল্লাহ বলেন, স্থানীয় এমপিদের প্রভাব থাকবে এটা স্বাভাবিক। উনি ওই এলাকার সবচেয়ে ক্ষমতাবান। চাইলেই সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক তার বাইরে যেতে পারেন না। এটা চলে আসছে এবং থাকবে। যেহেতু এমপি ক্ষমতাবান, তাই তিনি যাকে চাইবেন তিনিই দলে আসবে— এটা পরিবর্তন সহজ নয়।

চূয়াডাঙ্গা জেলার স্থানীয় প্রতিনিধিদের দেয়া তথ্য মতে, কেন্দ্রীয় নির্দেশনার তোয়াক্কা করছেন না তৃণমূল নেতা ও সংসদ সদস্যরা। সম্মেলন ছাড়াই পৌরসভা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডপর্যায়ে পকেট কমিটি করা হচ্ছে।

এসব কমিটিতে গত উপজেলা পরিষদসহ স্থানীয় নির্বাচনে নৌকাবিরোধীদের গুরুত্বপূর্ণ পদে রাখা হচ্ছে। নৌকাবিরোধী প্রার্থী ও সাংসদের আপন সহোদরদের দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে আনা হয়েছে। অনেক স্থানে দায়িত্বে আনা হচ্ছে ভিন্নপন্থিদের।

গত ১ ডিসেম্বর চুয়াডাঙ্গা জেলার দর্শনা পৌরসভা আওয়ামী লীগের কমিটি গঠন হয়। কমিটিতে পৌর মেয়র মতিয়ার রহমানকে সভাপতি এবং স্থানীয় সাংসদের ভাই দামুড়হুদা উপজেলা চেয়ারম্যান আলী মনছুর বাবুকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। বাবু গত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে নৌকার প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে সাংসদ ভাইয়ের প্রভাবে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

এছাড়া পারকৃষ্ণপুর মদনা ইউনিয়নে মন্তাজ আলী সভাপতি এবং জিয়াবুল হককে সাধারণ সম্পাদক, কুড়ুলগাছি ইউনিয়নে হাবিবুল্লাহ সভাপতি, সরোয়ার হোসেন সাধারণ সম্পাদক, কার্পাসডাঙ্গা ইউনিয়নে সাদিকুর রহমান সভাপতি, নজির আহমেদ সাধারণ সম্পাদক, নাতিপোতা ইউনিয়নে জাফর আলী সভাপতি, আব্দুল মমিনকে সাধারণ সম্পাদক, হাউলি ইউনিয়নে সাংসদের আপন বড় ভাই আলী আহাম্মদকে সভাপতি এবং সাঈদ খোকনকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে।

এছাড়া জীবননগর পৌরসভায় নাসির উদ্দিনকে সভাপতি এবং জাহাঙ্গীর আলমকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে। জাহাঙ্গীর আলম সাংসদের ছত্রছায়ায় গত পৌরসভা নির্বাচনে নৌকা প্রার্থীর বিরুদ্ধে নির্বাচন করেন। নতুন কমিটিতে দায়িত্ব পাওয়া সকলেই সাংসদের অনুসারী এবং গত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে নৌকার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কাজ করেছেন।

অথচ সাংসদের বিরুদ্ধে গিয়ে নৌকার নির্বাচন করেছেন, এমন একজনকেও আওয়ামী লীগের দায়িত্বে আনা হয়নি। এর আগে ইউনিয়নের গঠিত ওয়ার্ড কমিটিগুলোতেও ঠাঁই হয়নি নৌকা সমর্থকদের। যা নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রচার হয়েছে।

দামুড়হুদা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম ঝন্টু বলেন, ‘এমপি সাহেব টাকা-পয়সা আর তার লোকজন দিয়ে যা ইচ্ছা তা-ই করছেন। কমিটিগুলো ইচ্ছামতো করছেন। নৌকার পক্ষে নির্বাচন করায় অনেককে পদে রাখা হচ্ছে না।’

গত ২৮ নভেম্বর ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা আওয়ামী লীগের কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক করা হয় স্থানীয় সাংসদ দবিরুল ইসলামের দুই সহোদরকে। সাংসদের বড় ভাই মোহাম্মদ আলীকে সভাপতি ও ছোট ভাই সফিকুল ইসলামকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়।

এ ঘটনায় বিক্ষুব্ধ হয়ে পড়ে স্থানীয় নেতাকর্মীরা। গণমাধ্যমজুড়ে ফলাও করে নিউজ ছাপা হয়। এরপর ১২ ঘণ্টার মাথায় কেন্দ্রীয় নেতাদের হস্তক্ষেপে ওই কমিটি বাতিল করা হয়।

একই অবস্থা সৃষ্টি হয় কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর উপজেলায়। উপজেলাটির গঠিত ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড কমিটিতে সাংসদ অধ্যাপক এমএ মতিন একচেটিয়া প্রভাব বিস্তার করেছেন। উপজেলার দুর্গাপুর, গুনাইগাছ, বেগমগঞ্জ, দলদলিয়া, থেতরাই, পান্ডুলসহ অধিকাংশ ইউনিয়নেই পকেট কমিটি গঠন করা হয়েছে।

যা নিয়ে স্থানীয় ত্যাগী নেতাকর্মীরা বিক্ষুব্ধ। ৪ ডিসেম্বরের ওই উপজেলা কাউন্সিল স্থগিতের দাবি ওঠে। পরে কেন্দ্রের সিনিয়র নেতাদের হস্তক্ষেপে উপজেলা কাউন্সিল স্থগিত করা হয়।

জানতে চাইলে রংপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল হক বলেন, অভিযোগ ওঠার পর কাউন্সিল স্থগিত করা হয়েছে। কোথাও এমপিদের হস্তক্ষেপ করার সুযোগ দেয়া হচ্ছে না।

এছাড়া গত ২৪ নভেম্বর সিলেটের সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ওই সম্মেলনের পরের দিন প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিজাম চেয়ারম্যানকে সভাপতি আর হিরন মিয়াকে সাধারণ সম্পাদক করার তথ্য জানায় জেলা কমিটি।

পরে ঘোষিত কমিটির সাধারণ সম্পাদক হিরণ মিয়াকে নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয় এবং কমিটি স্থগিত করা হয়। এরপর মফিজুর রহমান বাদশাকে সভাপতি এবং নিজাম চেয়ারম্যানকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়।

এছাড়া গত ১৬ বছর পর ১৩ নভেম্বর গোলাপগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন হলেও কমিটি ঘোষণা হয়নি। স্থানীয় সাংসদ বিতর্কিত লোকজনকে দিয়ে পকেট কমিটি গঠনের চেষ্টা চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় নেতারা।

গত ৩০ নভেম্বর বিকালে সিলেট জেলা প্রেস ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন করে এমন ঘোষণা দেন নেতৃবৃন্দ। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা, পৌরসভাসহ অধিকাংশ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি-সম্পাদক। বিক্ষুব্ধ তৃণমূল নেতাকর্মীদের তোপের মুখে কমিটি গঠন স্থগিত রেখেছেন জেলা ও কেন্দ্রীয় নেতারা।

জানতে চাইলে সিলেট বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন বলেন, বিতর্কের কারণে সিলেট সদর উপজেলা কমিটিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে। আর গোলাপগঞ্জ উপজেলা কমিটি শিগগিরই ঘোষণা করা হবে।

তবে এসময় কমিটি গঠনে স্থানীয় সাংসদের প্রভাব বিস্তারের বিষয়টি স্বীকার করেননি তিনি। তিনি বলেন, আমি কোথাও প্রভাব বিস্তারের সম্মুখীন হইনি।

সূত্র-আমারসংবাদ

সর্বাধিক পঠিত