প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

যুবলীগ ঘিরে বিতর্কিতরা ঘুরঘুর করে কেন?

দীপক চৌধুরী : আওয়ামী যুবলীগ দেশের ঐতিহ্যবাহী সংগঠন। এই সংগঠন ঘিরে অতীতে নানারকম ইতিবাচক ও নেতিবাচক ঘটনা ঘটেছে। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারের হত্যার পর যুবলীগের নেতা-কর্মীর ওপর অত্যাচার চালিয়ে, হত্যা-গুম করে, মিথ্যা মামলা দিয়ে কোনঠাসা করতে স্বৈরাচার ও বিএনপি জামায়াত চক্র একই ভূমিকায় ছিল। তাদের সরকার নানারকম ছলচাতুরি করেছে। আওয়ামী যুবলীগের শক্তিকে দমানোর জন্য শুরু হয় বহু চক্রান্ত। নানা চড়াই-উৎরাই পার হয়ে রাজনীতি যখন গণমানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে শক্তিশালী ভূমিকায় নামে ঠিক তখনই যুবলীগকে কীভাবে নিস্ক্রিয় করে রাখা যায় সেই খেলা শুরু করে তারা। তবু গণআন্দোলন থেকে যুবলীগের হাজার হাজার অপ্রতিরোধ্য তরুণ-তরুণকে দমানো যায়নি।

মূলদল আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র আর চক্রান্ত ছিল এর সূচনা লগ্ন থেকেই। স্বাধীন দেশে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হয় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তে। এরপর কিন্তু গণতন্ত্রের সংগ্রাম ও প্রাণের ওপর হুমকি এলেও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা পিছপা হননি। ১৭ বার হত্যার অপচেষ্টা চলেছিল। অবশেষে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় আসে ১৯৯৬-এ। এরপর পাঁচ বছর ঠিকমতো চললেও বিএনপি-জামায়াত সরকার ক্ষমতায় এসেই মূল দলের বাইরে যুবলীগকে সবচেয়ে বেশি আক্রমণ করেছিল। এরপর টার্গেট করা হয় আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোকে। ২০০৯-এ ক্ষমতায় আসার কয়েকমাস পরই যুবশক্তি নতুনভাবে ও ভিন্ন চরিত্রে সক্রিয় হয়ে ওঠে। সর্বশেষ এই সংগঠনকে কেন্দ্র করে এ সরকার আমলেই নানাবিতর্ক জন্ম নেয়। অপ্রত্যাশিত ও অনাকাক্সিক্ষত বহুঘটনার জন্ম নেয়। সংগঠনের ব্যানারে রাতারাতি অনেকেই কোটিপতি হয়ে যান। চারদিক থেকেই এই সংগঠনের ব্যাপারে বিরুপ সমালোচনা শুরু হয়। কয়েকজনের জন্য এ সংগঠনকে ঘিরে অতিরঞ্জিত তথ্যও প্রচার করা হয়। এই সহযোগী সংগঠনের পরিস্থিতি ও কার্যক্রম বিশ্লেষণ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কঠোর কিছু পদক্ষেপ নেন। তাঁর পদক্ষেপই সর্বস্তরের মানুষের কাছে সমাদৃত হয়েছে। প্রশাসনের উচ্চস্তরের একাধিক কর্মকর্তা ও রাজনীতিকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের সঙ্গে আলোচনা করে জেনেছি এ শুদ্ধি অভিযান আরো চলবে। ইতিমধ্যেই যুবলীগের নের্তৃত্বে এনেছেন ব্যাপক পরিবর্তন। যোগ্য নেতৃত্বের অভাব থেকেই সংগঠনে চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব দেন অধ্যাপক শেখ ফজলে শামস পরশকে। অবশেষে পিতা শেখ মণির স্থানে এলেন পুত্র। অরাজনীতিক হলেও পরশ ব্যক্তিগতভাবে সৎ ও উচ্চশিক্ষিত হওয়ায় অনেকে এ পদক্ষেপকে কাক্সিক্ষত ও প্রত্যাশিত বলেও অভিহিত করেছেন। সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকলেও ঘর থেকে শুদ্ধি অভিযান শুরু করায় যুবলীগের কেন্দ্র ও তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মীই এখন জেলে। অনেক সদস্য পলাতক, কেউ কেউ আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর হাতে, রিমান্ডেও। অবশ্য কারো কারো মতে কিছু কিছু বিষয়ে এখনই যেন শিথিলতা শুরু হয়েছে। তারা মনে করেন, এই শুদ্ধি অভিযান জোরদার করতে হবে।

বুধবার রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শেখ ফজলুল হক মনির ৮০তম জন্মদিনের আলোচনা সভা ছিল। এতে অংশ নিয়ে কেঁদেছেন পুত্র শেখ ফজলে শামস পরশ। পুরো সভাকক্ষেই তখন এক আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়। গত ২৩ নভেম্বর যুবলীগের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন শেখ পরশ। এরপর এবারই প্রথম তিনি সংগঠনের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে বক্তব্য দেন। এর আগে যুবলীগ সাধারণ সম্পাদক মো. মাইনুল হোসেন খান নিখিল বলেছেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ গড়ার কারিগর। সমুদ্রতলদেশ থেকে মহাকাশ পর্যন্ত অর্জন রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার।’ এটি খুবই বাস্তব ও সত্য কথা। প্রধানমন্ত্রীর প্রতি জনগণের আস্থা এ কারণেই বেড়েছে। কিন্তু অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম, বুধবারের অনুষ্ঠান ঘিরে কিছু সুবিধাবাদী দুর্নীতিবাজ, হত্যামামলার আসামিদের দেখা গেল চোটপাট । তারা ‘পড়িমরি’ করে ছোটাছুটি করেছেন ‘নতুন ভাই’য়ের কাছে ঘেঁষতে। অনেকে আবার সভাশুরুর নির্ধারিত সময়ের বহু আগেই চেয়ার দখল করছেন। নেতার চোখ বা দৃষ্টি আকর্ষণের যেন এটা মোক্ষম সময়। বিকেলের দিককার অনুষ্ঠান হওয়ায় সংগতকারণেই আগ্রহ যেমন ছিল যথেষ্ট, তেমনই পরিবেশ ছিল আমার অনুকুলে। সেখানে বিতর্কিত সাবেক কয়েকজন নের্তৃস্থানীয়কে দেখে বিস্মিত হয়েছি। কারণ, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপকর্মের কারণে তাদের কেউ কেউ এই সংগঠনকে নিজগুণে কালিমালিপ্ত করেছেন।

সভা ‘কভার’ করে ফেরা একাধিক সাংবাদিক জানালেন, যুবলীগের শক্তিকে যুবশক্তিতে রুপান্তর করা কঠিন। কারণ, একাধিক বিতর্কিত কাউন্সিলর অংশগ্রহণ করেছেন আলোচনা সভায়। সেগুনবাগিচা এলাকায় এক কাউন্সিলরের ত্রাস এখনো রয়েছে। কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানালেন, মানুষের কাছে অনাকাক্সিক্ষত, চাঁদাবাজ ও খুন মামলার আসামিও ঢুকেছে সভাঘরে। পুলিশ খুঁজে পায় না যুবলীগের কুখ্যাত খোরশেদকে। অথচ সেও নাকি ছিল সেখানে। এক সময় গুলিস্তান বঙ্গবাজারের সামনের ফুটপাতে ব্যবসা করতেন খোরশেদ আলম। নিয়ন্ত্রণ করতেন ফুটপাত। এতে চোখ পড়েছিল ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক বিএনপির ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলমের। সাহস আর দক্ষতার কারণে তিনি তাকে দায়িত্ব দেন মুক্তিযোদ্ধা ক্রীড়া চক্রের ক্লাবে জুয়া পরিচালনার। এরপর সরকার বদল হলেও তার অবৈধ আয়-রোজগার বন্ধ হয়নি। আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি খোরশেদকে। একাধিক কাউন্সিলর পুলিশের মুখোমুখি হওয়ার সাহস না পেলেও যথারীতি এই সভায় বসা ছিলেন চেয়ারে।

অসুস্থতার কারণে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের বহিষ্কৃত সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী স¤্রাট ফের হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। শুধু স¤্রাটের মতো বা জি কে শামীমের মতো কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হলেই হবে না। কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগার থেকে স¤্রাটকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) ভর্তি করা হয়। তাকে রিমান্ডে নিয়ে সেগুনবাগিচায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরুর কথা ছিল। ক্যাসিনো বিরোধী শুদ্ধি অভিযানে গত ৬ অক্টোবর কুমিল্লা চৌদ্দগ্রাম থেকে স¤্রাটকে ও তার ঘনিষ্ঠ যুবলীগের বহিস্কৃত নেতা এনামুল হক আরমানকে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু স¤্রাটকে ঘিরে থাকতে যাদের সবসময় দেখা গেছে তাদের ভিড়ও অংশগ্রহণ গত বুধবার ছিল লক্ষ্যনীয়। আইনের আওতায় নিতে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে বলে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যরা বলে থাকলে বাস্তবতা ভিন্ন। আরেক বহিষ্কৃত যুবলীগ নেতা একএম মুমিনুল হক সাঈদ সিঙ্গাপুরে পলাতক। তবে সাঈদের ভ্রাতা সুমনের টিকিটিও স্পর্শ করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলাবাহিনী। কিছু দিন চুপ থাকলেও শতশত অপকর্মের হোতারা ‘যুবলীগের দোহাই’ দিয়ে আবার প্রকাশ্য হচ্ছে বলে শোনা যাচ্ছে। কতিপয় কাউন্সিলর সীমাহীন চাঁদাবাজি করেও এখন প্রকাশ্যে । চলমান অভিযানে যুবলীগের কয়েকজন সাবেক নেতা গ্রেফতার হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছেন সেই বিতর্কিত নেতারা। যাদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলার অভিযোগ রয়েছে তারাও। শুদ্ধি অভিযান কঠোরভাবে না চালালে বিতর্কিতরা ঘুরেফিরেই যুবলীগের ঐতিহ্যকে বিনাশ করবে বলেও অনুমান করা হচ্ছে। অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার জন্ম দিতে ন্যূনতম দুশ্চিন্তায় নয় তারা। তারা কেবলই আওয়ামী যুবলীগের পদলাভ করতে চায়। হয়তো জানে ‘পদগুলোতে’ মধুর হাঁড়ি। #
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, উপসম্পাদক, আমাদের অর্থনীতি

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত