প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

হুমকিতে শপিংমল

ডেস্ক রিপোর্ট  : ডিজিটাল বাংলাদেশ ও প্রযুক্তির সহজলভ্যতার কারণে কয়েকবছর ধরেই ক্রমাগতভাবে বাড়ছে অনলাইন কেনাকাটা। পোষাক-পরিচ্ছদ, চাল-ডাল, অলঙ্কার, প্রসাধনী, খাবার থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় সকল পণ্যই এখন পাওয়া যাচ্ছে ভার্চুয়াল বাজারে। এই মার্কেটে হাজার হাজার পণ্যের মাঝে গ্রাহকরা তাদের পছন্দের পণ্য অর্ডার করলেই পেয়ে যাচ্ছেন বাসায় বসেই। ফলে মুক্তি পাচ্ছেন যানজটের ঝক্কি-ঝামেলা থেকে, বেঁচে যাচ্ছে সময়ও। ঘুরতে হচ্ছে না এক মার্কেট থেকে আরেক মার্কেটে কিংবা এক দোকান থেকে আরেক দোকানে।

জানতে চাইলে ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব)- এর সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুল ওয়াহেদ তমাল বলেন, এখন আমাদের দেশে ই-কমার্সে বার্ষিক এক হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়। আমাদের সংগঠনে ৯৫০টিরও বেশি সদস্য প্রতিষ্ঠান আছে যারা এখন প্রতিদিন প্রায় ৫০ হাজার থেকে এক লাখ পর্যন্ত অর্ডার গ্রাহকদের কাছে সরবরাহ করছেন। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস বেসিস-এর সাবেক সভাপতি ফাহিম মাশরুর জানান, অনলাইনে সবচেয়ে বড় সুবিধা ক্রেতারা পাচ্ছেন, সেটা হলো ঘরে বসে অর্ডার দিয়ে ঘরে বসেই পেয়ে যাচ্ছেন। আর অনেক ক্ষেত্রে এই দাম শপিংমলের দামের থেকেও কম থাকায় ক্রেতারাও আগ্রহী হয়ে উঠছেন।

শুরুতে এই অনলাইন কেনাকাটা কেবল নতুন প্রজন্মের কাছে এবং শহরকেন্দ্রিক জনপ্রিয় হলেও এখন প্রায় সব বয়সী মানুষই ঝুঁকছেন এই মাধ্যমে। অনলাইন কেনাকাটা কেবল শহরকেন্দ্রিক সীমাবদ্ধও নেই। গ্রামেও ছড়িয়ে গেছে অনলাইনে কেনাকাটার সংস্কৃতি। এমনকী খাবারদাবার কেনাকাটাতেও সমানে সমান টক্কর দিচ্ছে হরেক অনলাইন প্রতিষ্ঠানগুলো। সব মিলিয়ে চুটিয়ে ব্যবসা করছে দেশি-বিদেশি হরেক অনলাইন সংস্থা। আর তার জেরেই ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়ছে শপিং মলগুলো। এই সমস্যা যেমন বিশ্বের বড় বড় দেশগুলোতে জেঁকে বসছে, তা থেকে বাদ নেই বাংলাদেশও। অনলাইন কেনাকাটার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা দেখে ২০২০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের বাজারে আসার পরিকল্পনা করছে বৈশ্বিক ই-কমার্স জায়ান্ট ওয়ালমার্ট এবং অ্যামাজন। জানিয়েছেন ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সহ-সভাপতি রেজওয়ানুল হক। তিনি বলেন, বাংলাদেশে ওয়ালমার্টের একটি অফিস রয়েছে, এবং তারা বিগত দেড় বছর যাবত বাজার পর্যালোচনা ও গবেষণা করছে। তারা বাংলাদেশেও নিজেদের ব্যবসা শুরু করতে আগ্রহী। অন্যদিকে, ইতোমধ্যেই অ্যামাজন বাংলাদেশে এসেছে এবং সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠকও করেছে। তারা এখানে ২০২০ সাল নাগাদ ব্যবসা শুরু করার পরিকল্পনা করছে। এ ছাড়াও, চীনা ই-কমার্স জায়ান্ট আলিবাবা ইতোমধ্যেই দারাজ কেনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশ করেছে।

অনলাইন কেনাকাটার আগ্রাসনে ব্রিটেনের ব্যস্ততম শপিং স্ট্রিটগুলোতে ভুতুড়ে পরিবেশ বা ক্রেতাশূণ্য আবহের সৃষ্টি হয়েছে। অনলাইন শপিং’এর বিশেষ ছাড়, বাড়িতে পণ্য পৌঁছে দেয়ার নিশ্চয়তায় ক্রেতার সময় বেঁচে যাওয়া, যানজট এড়িয়ে কেনাকাটার ঝক্কি ছাড়াই পছন্দসই পণ্য হাতে পাওয়ার মত বিভিন্ন সুযোগে দোকানপাট, বিপনিবিতান বা শপিংমলের দ্বারস্থ হতে চাচ্ছেন না ব্রিটিশ নাগরিকরা। এর মিলিত প্রভাব পড়েছে দোকানদারির ওপর। এর ফলে ব্রিটেনের নামকরা সব হাইস্ট্রিটগুলো নিরব নিথর হয়ে পড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে ২০৩০ সালের আগেই দোকানপাটের ব্যবসা লাটে উঠবে বলে হুঁশিয়ার করে দিয়েছে এ্যাশলে নামের আসবাব কোম্পানি যাদের সারাবিশ্বে ৮ শতাধিক স্টোর রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বø্যাক ফ্রাইডেতে বিশাল ছাড় দিয়েও ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে পারেনি বিপনিবিতানগুলো। বিশেষ ওই দিনটিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দোকানগুলোতে সাধারণ দিনের তুলনায় ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ বিক্রি বাড়লেও আগের বছরের একই দিনের তুলনায় বিক্রি কমেছে ৬ দশমিক ২ শতাংশ। অন্যদিকে অনলাইনে বø্যাক ফ্রাইডেতে বিক্রি বেড়েছে ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ। এশিয়ার মধ্যে অনলাইন কেনাকাটায় শীর্ষে রয়েছে চীন, ভারত, থাইল্যান্ড, কোরিয়া, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, হংকং ও সিঙ্গাপুর।

ব্যতিক্রম নয় বাংলাদেশও। নগরজীবনের ব্যস্ততা আর ঝক্কি-ঝামেলা এড়াতে তাই অনেকেই এখন ঝুঁকছেন অনলাইন কেনাকাটায়। ঘরে বসে ছবি দেখে পছন্দ হলে বিস্তারিত জেনে অর্ডার করছেন একটি ক্লিকেই। ৪০ থেকে ১০০ টাকার চার্জের বিনিময়ে একদিনের মধ্যে পণ্য পৌঁছে যাচ্ছে গ্রাহকের দরজায়। গত কয়েক বছর ধরেই কেনাকাটার এই মাধ্যমটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠছে। শিক্ষার্থী, তরুণদের পাশাপাশি কর্মব্যস্ত মানুষের জন্য এখন কেনাকাটার প্রধান মাধ্যম এটি। অর্ডারের ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই নারীরা। কেনাকাটায় সিংহভাগই তাদের অর্ডার বলে জানিয়েছে ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশ (ইক্যাব)।

রমজান, ঈদসহ অন্যান্য ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক উৎসবগুলোতে এই ভার্চুয়াল বাজার হয়ে ওঠে রমরমা। কোরবানীর গরুসহ এখনকার দিনে অনলাইন মার্কেটে জামা-কাপড়, জুয়েলারি, শাড়ি, প্রসাধনী, ঘর গোছানোর সামগ্রী, চাল-ডাল, মাছ-মাংস, সবজি থেকে শুরু করে জমি, ফ্ল্যাট, গাড়ি, কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, গহনা, ব্যাগ-কসমেটিকস, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সবই মিলছে অর্ডার করলেই। জনপ্রিয়তা ও আগ্রহের কারণে উদ্যোক্তারাও প্রতিনিয়ত নতুন নতুন ই-কমার্স সাইট নিয়ে আসছেন। ওয়েব সাইটের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকও যোগ হচ্ছে এই বেচাকেনায়। আর অনলাইনের এই জনপ্রিয়তাতে হুমকীতে পড়ছে বড় বড় শপিংমলগুলো। রাজধানীর যমুনা ফিউচার পার্ক, বসুন্ধরা সিটি মার্কেটসহ বড় বড় কয়েকটি মার্কেটে ঘুরে দেখা যায় বেশিরভাগ দিনই ক্রেতাদের সংখ্যা থাকে অনেক কম। তবে ছুটির দিনগুলোতে ভিড় কিছুটা থাকলেও তাদের বেশিরভাগই পরিবার নিয়ে সময় কাটাতে কিংবা ঘুরতে মার্কেটগুলোতে ভিড় করেন বলে জানান দোকানীরা। বসুন্ধরা সিটির কয়েকজন দোকানদার ও কর্মচারীর সাথে কথা বলে জানা যায়, গত ৩ থেকে ৫ বছর আগেও যেভাবে বিক্রি ছিল এখন তা অনেকটা কমে গেছে। বিকেল থেকে সন্ধ্যার পর এবং ছুটির দিনগুলোতে কিছুটা ভিড় থাকলেও তাদের বেশিরভাগই আসেন ঘুরতে ও সময় কাটাতে। যমুনা ফিউচার পার্কের কয়েকজন দোকানদার জানান, দোকান নেয়ার পর থেকে যেমন ব্যবসা আশা করেছিলেন সেভাবে কোন সাড়া পাচ্ছেন না। দিনের বেশিরভাগ সময়ই মার্কেট থাকে ক্রেতা শূণ্য।

স¤প্রতি একটি সমীক্ষা বলছে, বিক্রিবাটা কমে যাওয়ায় বহু ব্যবসায়ী শপিং মল থেকে গুটিয়ে নিচ্ছেন নিজেদের অস্তিত্ব। শপিং মলের ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ নাকি খালি পড়ে থাকছে। যে দোকানগুলো রয়ে গেছে, সেখানে ব্যবসা কমেছে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ। তবে অনলাইন কেনাকাটায় ধনী দেশগুলোই যে সবচেয়ে এগিয়ে আছে, তা জানিয়েছে সমীক্ষাটি।

ওই সমীক্ষায় বলা হয়েছে, আমেরিকায় শপিং মলে ফাঁকা জায়গা ৫০ শতাংশ ছুঁই ছুঁই। লন্ডনে তা প্রায় ৪০ শতাংশ। অন্যদিকে একটি শিল্প উপদেষ্টা সংস্থার সমীক্ষা বলছে, অনলাইন কেনাকাটার বিক্রি বৃদ্ধির হার ৬৫ শতাংশ। আগামী বছর তা ৭২ থেকে ৭৫ শতাংশ হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে ওই সমীক্ষাটি।

এতে বলা হয়েছে, হাতে হাতে স্মার্ট ফোন এবং সস্তায় ইন্টারনেট পরিষেবা চলে আসায় অনলাইনে কেনাকাটাই রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। প্রতিবছরই আগের বছরের তুলনায় প্রায় দেড় থেকে দুইগুণ বেচাকেনা বাড়াছে। বাড়ছে ভার্চুয়াল মার্কেটের আকারও। সেক্ষেত্রে আরও কতটা খারাপ জায়গায় পৌঁছতে পারে মল-ব্যবসা, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

ব্রিটেনের হাউজিং এন্ড লোকাল গভর্নমেন্ট সিলেক্ট কমিটি বলছে, ‘অক্সফোর্ড স্ট্রিটস বা ওয়েস্টফিল্ডস’এর মত বনেদি কেনাকাটার এলাকাগুলো নিথর হয়ে পড়েছে ক্রেতাশূণ্যতায়। ইন্টারনেট বা ইন্টারনেট ভিত্তিক অনলাইন ব্যবসা এধরনের ব্যবসাকে হত্যা করেছে। হাউজ অব ফ্রেসারস বা মার্কস এন্ড স্পেন্সারস’এর মত বড় বড় চেইনশপগুলো এখন বিষয়টি নিয়ে রীতিমত শঙ্কিত। ওয়ালমার্ট, টার্গেট কর্প ও বেস্ট বাই’য়ের মতো বিশ্ববিখ্যাত প্রতিষ্ঠানগুলো এখন বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করছে তাদের ই-কমার্স সম্প্রসারণের জন্য।

তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এবং ই-কমার্স বিশ্লেষকরা বলছেন, গত দুই-তিন বছরে রাজধানী ও এর আশপাশসহ বড় শহরগুলোর কেনাকাটার চরিত্রে অনেক পরিবর্তন এসেছে। এর ফলে চিরাচরিত বাজারগুলোতে ভিড় কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ। তারা বলছেন, ১৬ থেকে ৫৫ বছরের পুরুষ ক্রেতাদের বেশিরভাগই অনলাইনে জিনিস কিনতে পছন্দ করছেন। ঠিক তেমনই ১৬ থেকে ৪৯ বছরের নারীদের কাছেও ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছে অনলাইনে জিনিসপত্র কেনা। বিশেষ করে সেই নারীরা যাদের পেশাগত কারণে প্রতিদিন বাইরে বেরোতে হয়, খুব দ্রæত হারে বাড়ছে এ পরিমাণও। তারা আরও বলছেন, টেকনোলজির ব্যবহারের ফলে অনলাইনে বেশ কিছুটা কম দামে জিনিস দেওয়া সম্ভব, যা কোনোভাবেই সাধারণ দোকানে দেওয়া সম্ভব নয়। শুধু পোশাক নয় অন্যান্য জিনিস কেনার ক্ষেত্রেও তাই বাড়ছে অনলাইনের চাহিদা।

জানা গেছে, দেশে ই-কমার্সের আওতায় প্রায় ৯শ’ প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর বাইরে জেলা শহরগুলোতেও গড়ে উঠেছে অনলাইন শপ। সর্বমোট দেশে প্রায় কয়েক হাজার অনলাইন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এর সঠিক কোনো পরিসংখ্যান সংস্থাটির কাছে নেই। তবে দিন দিন অনলাইনের ব্যবসা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে গ্রাহক সংখ্যা। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ফ্যান পেইজের মাধ্যমে নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে। এসব ছোট ছোট উদ্যোক্তার প্রধান মাধ্যম ফেসবুক। এর পাশাপাশি ই-কমার্সের সঙ্গে জড়াচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণ-তরুণীরা।

ই-ক্যাব বলছে, দেশে বর্তমানে ই-কমার্স বাজারের আকার বছরে এক হাজার কোটি টাকারও বেশি। চলতি বছর তা দেড় হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছাবে বলেও আশা প্রকাশ করছে সংগঠনটি। তাদের তথ্যমতে- ১৩ থেকে ১৫ লাখ মানুষ বছরে একবার হলেও অনলাইনে অর্ডার করেন। যদিও বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় তা খুবই নগণ্য। কারণ ভারতে অনলাইন গ্রাহকের সংখ্যা ১০ কোটি, চীনে প্রায় ৪০ কোটি। ভারতে জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ অনলাইন কেনাকাটায় অভ্যস্ত, সেখানে বাংলাদেশে এখনও জনসংখ্যার এক শতাংশের কম অনলাইন শপিং করে। সেটাও সংখ্যার হিসাবে একদম কম নয়।

ই-ক্যাবের সাবেক সভাপতি রাজিব আহমেদ বলেন, তিন-চার বছর আগে ১০ হাজার অর্ডার পেলেই আমাদের কাছে অনেক বড় মনে হতো। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে এখন সেটি এক লাখ পর্যন্ত পৌঁছেছে। ##

উৎসঃ ইনকিলাব

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত