প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ইউরোপের দেশে দেশে সাবেক শিবির নেতার কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ

সাইদুল ইসলাম, লন্ডন: ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ফাঁদ পেতে সাধারণ খেটে খাওয়া প্রবাসীদের কষ্টার্জিত অর্থ প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা আত্নসাৎ করেছে মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলা ছাত্র শিবিরের সাবেক সভাপতি কলিম উদ্দিন।গত ১০ বছরে বিভিন্ন ছলচাতুরীর মাধ্যমে প্রায় অর্ধশতাধিক ইউরোপ প্রবাসীদের এই টাকা আত্নসাত করে সে।

টাকা আত্মসাতের লক্ষ্যে সাধু সেজে সাধারণ প্রবাসীদের বিপদে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিত কলিম উদ্দিন।এসব কাজে তাকে সহযোগিতা করতো তার স্ত্রী কলি বেগম।বিশেষ করে ইউরোপে বসবাসরত অবৈধ অভিবাসীদের অসহায়ত্বের সুযোগে তাদের সহযোগিতার কথা বলে সখ্য গড়ে তুলতো।ক্ষেত্র বিশেষে ছোট খাটো সাহায্যের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের বিশ্বাস অর্জন করতো।কোন কোন সময় গৃহহীন প্রবাসীদের এক দু’রাত নিজের বাসায় রেখে আদর আপ্যায়নের মাধ্যমে আস্থায় নিয়ে আসতো।নিজেকে কখনো ছাত্র শিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা, কখনো বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর স্পেন শাখার আমীর বলেও পরিচয় দিত।আবার কখনো ইউরোপে বাংলাদেশী কাপড়ের বড় পাইকারী বিক্রেতা বলেও মানুষের কাছে নিজেকে তুলে ধরতো। এভাবে একে একে যেখানে যে উপায়ে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করা যায় সেখানে সেই পন্থা অবলম্বন করতো কলিম। সুযোগ বুঝে অবৈধ অভিবাসীদের ইউরোপে স্থায়ী হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে আবার কখনো ব্যাবসায় বিনিয়োগের মাধ্যমে লাভের কথা বলে অর্থ আত্মসাৎ করত।বাঙ্গালী মালিকদের কাছ থেকে বাসা ভাড়া নিয়ে সময়মত বাসার ভাড়া পরিশোধ করতো না।মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে অবৈধ অভিবাসীদের হাতে ইমিগ্রেশন সংক্রান্ত জাল কাগজ ধরিয়ে দিত। তার প্রতারনার ফাঁদে পা দিয়ে ইউরোপে স্থায়ী হওয়ার আশায় অনেকে বউয়ের সোনা বিক্রি করে তার হাতে টাকা তুলে দিয়েছেন।

এভাবে গত ১০ বছরে স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদ ও বার্সেলোনা শহরের প্রায় অর্ধশতাধিক প্রবাসীকে সর্বশান্ত করে বাকপটু কলিম উদ্দিন । কেউ কেউ তার প্রতারনার শিকার হয়ে ইউরোপ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। সে প্রতারনার জাল মাদ্রিদে বিস্তার করলেও গত দু’বছর থেকে লন্ডনে বসবাস করছে। যুক্তরাজ্যে বসবাসরত অনেক অবৈধ অভিবাসীকে ইউরোপে স্থায়ী করার স্বপ্ন দেখিয়ে বড় অংকের টাকা বাগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তার প্রতারনার এমন অভিযোগ আমাদের সময় ডটকমের যুক্তরাজ্য প্রতিনিধির কাছে এসেছে । অভিযোগ কারীরা তার প্রতারনার প্রতিকার চেয়েছেন এবং ভবিষ্যতে যাতে কেউ তার প্রতারনার ফাঁদে না পড়ে সে ব্যাপারেও সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।

কলিমের কাছে পাওনাদারদের তালিকা যেমন দীর্ঘ টাকার অংকটাও অনেক বড়। আমাদের সময় ডটকমের এ প্রতিবেদকের হাতে আসা তালিকায় দেখা যায়, বর্তমানে যুক্তরাজ্য প্রবাসী সিলেটের সুবিদ বাজারের বাসিন্দা এবং স্পেনে থাকাবস্থায় কলিমের ব্যাবসায়িক পার্টনার মকসুদ আহমদের পাওনা দেড় লাখ ইউরো যা বাংলাদেশী টাকায় দেড় কোটি টাকা এবং স্পেনের মাদ্রিদে একটি বাসার দু’বছরের ভাড়া। তালিকায় অন্যান্যদের মধ্যে আছেন মাদ্রিদের তাজ রেস্টুরেন্টের মালিক প্রফেসর এমাজ উদ্দিনের ৪৫ হাজার ইউরো, বর্তমানে যুক্তরাজ্য প্রবাসী মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার বাবুল আহমেদ শামীমের ৭ হাজার ইউরো, বাবুল আহমেদের ১৫ হাজার ৫ শত ইউরো, মামুনের ১০ হাজার ইউরো, কাওছার আহমেদের ৫ হাজার ইউরো, জুড়ী উপজেলার স্পেন প্রবাসী কলিমের আপন ভাগ্নির স্বামী ইসলাম উদ্দিন পংকির ৭ হাজার ইউরো, মাদ্রিদের নজরুল ইসলামের ১৩ হাজার ৫ শত ইউরো, স্পেন প্রবাসী হবিগঞ্জ জেলার আব্দুল কাইয়ুমের ৬ হাজার ইউরো, মাদ্রিদ বাংলাদেশ মসজিদের ইমাম জহির আহমেদের ৩৪ হাজার ইউরো, সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার লালা মিয়ার ২০ হাজার ইউরো, ও গোলাপগঞ্জ উপজেলার কাশিম আহমদ শরীফের ৫ হাজার ইউরো, ইস্টলন্ডনের বাসিন্দা কলিমের আপন ফুফাতো ভাই কমিউনিটি ট্রাস্ট বড়লেখার সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মানিকের পাচঁ হাজার পাউন্ড ও এক্সপ্রেস লিংক প্রোপার্টিজ স্টেট এজেন্টের বাসা
ভাড়া বাবদ সাড়ে চার হাজার পাউন্ড।

কলিমের কাছে পাওনাদারদের অভিযোগের প্রমানও পাওয়া গেছে শালিস বিচারকের বক্তব্যে ও মানি রিসিটে । কলিমের কাছে পাওনা টাকা আদায় করতে ২০১০ সালে বাবুল আহমেদ শামীম ও নজরুল ইসলাম দারস্থ হোন স্পেনের বাংলাদেশী কমিউনিটির বড় সংগঠন এসোসিয়েশন দি বাংলাদেশ ইন স্পেনের। ২০১১ সালের ২রা জানুয়ারি মাদ্রিদে এই সংগঠনের মধ্যস্থতায় একটি শালিস বৈঠকে কলিম উদ্দিন শামিম ও নজরুলের পাওনা টাকার কথা স্বীকার করে প্রতিমাসে ৫ শত ইউরো পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দিলেও তিনি সেটি আর পরিশোধ করেননি। এবিষয়ে ঐ শালিস বৈঠকের প্রধান আব্দুল কাইয়ুম ও উপস্থিত সাক্ষরদাতা ১৫ সদস্যের অন্যতম সদস্য এমদাদ আহমদ আমাদের সময় ডটকমকে বলেন, ‘কলিমের কাছে অনেক প্রবাসী বাংলাদেশী টাকা পান। বাবুল আহমেদ শামিম ও নজরুল ইসলামের অভিযোগের প্রেক্ষিতে আমরা কলিমকে নিয়ে শালিসি বৈঠকে বসি। কিন্তু কলিম বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুসরণ না করায় শামীমকে আইনের আশ্রয় নেওয়ার পরামর্শ দেই।’ পরবর্তীতে বাবুল আহমেদ শামীম স্পেনের বাংলাদেশ দূতাবাসের সহযোগিতা নিয়ে শামীমের বাবা জমির উদ্দিন বাদী হয়ে কলিম উদ্দিন, তার স্ত্রী কলি বেগম ও বড় ভাই সেলিম উদ্দিনের উপর ৪০৬/৪২০/৫০৬(২) ধারায় ২০১২ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারী বড়লেখা সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেন। যে মামলাটি এখনো চলমান।

একইভাবে লন্ডনেও কলিম উদ্দিন ও আব্দুল মানিককে নিয়ে তাদের নিজ এলাকা কাঠালতলী ইউনিয়নের যুক্তরাজ্য প্রবাসীরা মধ্যস্থতার মাধ্যমে কলিমের কাছে পাওনা টাকা আদায়ের চেষ্টাও ব্যার্থ হয়।

এসব বিষয়ে কলিমউদ্দিনের বক্তব্য জানতে দু’সপ্তাহ ধরে তার মুঠোফোনে কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। ক্ষুধে বার্তা পাঠালে সেটারও কোন উত্তর পাওয়া যায়নি।

উল্লেখ্য কলিম উদ্দিন মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার কাঠালতলী ইউনিয়নের মৃত মস্তকিন আলীর ছেলে। বড়লেখা উপজেলা ছাত্র শিবিরের সাবেক সভাপতি বর্তমানে ফ্রান্স প্রবাসী সাইফুল আলম ও সাবেক সভাপতি কাতার প্রবাসী খিজির আহমদ আমাদের সময় ডটকমকে নিশ্চিত করেছেন যে, কলিম উদ্দিন ১৯৯৮ সালে বড়লেখা উপজেলা ছাত্র শিবিরের সভাপতি ছিলেন । কলিমের এহেন কান্ডের ব্যাপারে জানতে চাইলে সাইফুল আলম বলেন , আমরা শুনেছি লেনদেনে কলিমের দূর্বলতার কথা। তবে খিজির আহমেদ বলেন, কলিমের ঋণের কথা আমরা জানি। উনিতো ত্যাগী মানুষ। হয়তো কোন বেকায়দায় পড়ে এ অবস্থায় আছেন। যোগাযোগ রক্ষা করা ততক্ষন পর্যন্ত কঠিন যতক্ষণ কমিটমেন্ট রক্ষা করা যায়।

তবে সকলের ঋন পরিশোধ করার ক্ষমতা উনার আছে। সেই চেষ্টাও তিনি করছেন বলে শুনেছি।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত