প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

গণহত্যা বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন
আমাদের দুঃখ আছে আমরা পাকিস্তানিদের বিচার করতে পারলাম না, বললেন মুনতাসীর মামুন

শিমুল মাহমুদ: একাত্তরের গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাস্টের আয়োজনে শুক্রবার রাজধানীর বাংলা একাডেমি মিলনায়তনে দুইদিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলন শুরু হয়েছে।

এবারের সম্মেলনে আলোচ্য বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছে ১৯৭১-এর গণহত্যা, বাংলাদেশের সুর্বণ জয়ন্তী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী।

অধ্যাপক ড.মুনতাসীর মামুনের সভাপতিত্বে সকাল ১০টায় সম্মেলন উদ্বোধন করেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কেএম খালেদ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক। স্বাগত বক্তব্য রাখেন শিল্পী হাশেম খান, শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন ভারতীয় সংবাদিক ও লেখক হিরন্ময় কার্লেকার।

গণহত্যার স্মৃতিচারণ করে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কেএম খালেদ বলেন, ২৫ মার্চে ভোরে বাবা বলছিলেন ‘এ জোয়ান ছেলে-পেলে তোরা যে ঘুমাচ্ছিস। মনে হয় দেশের জন্য তোদের কিছু করার নেই? ঢাকা তো সব শেষ হয়ে গেছে’। এটি ছিলো মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তার প্রথম কথা। এরপর দুইভাই গেলো যুদ্ধে।

তিনি বলেন, খুব কাছ থেকে গণহত্যা দেখেছি। আমার নির্বাচনী এলাকায় একটি মাত্র উপজেলার ২০ কিলোমিটারের মধ্যে ১৭টি বধ্যভূমি রয়েছে। একটি বধ্যভূমিতে ১৬৫ জনকে হত্যা করা হয়েছে। যাদের নাম ঠিকানা আমাদের কাছে রয়েছে। এবং এ বিষয়ে মামলা মামলার ট্রায়েল চলছে।

কেএম খালেদ বলেন, আমাদের এলাকার পাশ দিয়ে চলে গেছে ব্রহ্মপুত্র নদী। নদীর পাড়ে থাকা বট গাছটির কিছু ডালপালা বর্ষায় পানিতে ডুবে যেতো। প্রতিদিন পানিতে ভেসে আসা মৃতদেহ গাছের ডালপালায় আটকা পড়তে দেখতাম। গ্রামের মানুষ সেগুলো আবার ছাড়িয়ে দিতো। আবার ভেসে যেতো কোথায় কে জানে। কোথায় থেকে কে ভেসে এসেছে, কোন মায়ের সন্তান কেউ জানে না।

সংস্কৃতি এ প্রতিমন্ত্রী বলেন, ১০ ডিস্বেম্বর ময়মনসিংহ স্বাধীন হলো, আমি পাকিস্তানি নির্যাতন ক্যাম্প থেকে মুক্তি পেলাম। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হাটতে হাটতে ময়মনসিংহ আসি। তখন পথে পথে ডাকবাংলো, ব্রহ্মপুত্রচরে শত শত মৃতদেহ। কোনটা ৬ মাস আগে হত্যা করা হয়েছে, কোনটা তিন মাস।

ড.মুনতাসীর মামুন বলেন, গণহত্যা জাদুঘরটি আমরা করেছি অনেক দুর্গম পথ পেড়িয়ে। এমন একটি জায়গায় জাদুঘরটি করা হয়েছে যে জায়গায় সবচেয়ে বড় গণহত্যা গুলো হয়েছে। এর নির্মানের প্রথম থেকেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের সাথে ছিলেন। তিনি আমাদের বাড়ি দিয়েছেন, জমি দিয়েছেন। ইতোমধ্যে সাংস্কৃতিক মন্ত্রনালয় এ জাদুঘরকে ৭তলা ইমারতে পরিনত করার কাজ শুরু করেছে।

জাদুঘরের ট্রাস্টের এ সভাপতি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের বহুমাত্রিকতা নষ্ট হয়ে যায় যখন আমরা শুধু বিজয়ের কথা বলি। আমাদেরকে গণহত্যার কথা, আমাদের যন্ত্রনার কথা বলতে হবে। আমরা তাদের কথা যেনো মনে রাখি। কেনো না স্মৃতিপরমকুড়ে অপমান, দুঃখ, বেদনা থাকে। বিজয়ের মুহুর্ত গুলো থাকে না।

আজকে শুরু থেকে যদি জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় না আসতেন, খালেদা জিয়া ক্ষমতায় না আসতেন যদি নিজামীরা ক্ষমতায় না আসতেন। তাহলে আমরা তাদের কথা মনে রাখতে পারতাম। তারা আমাদের ইতিহাসটি ভুলিয়ে দিয়ে গেছে। আমরা আবার তুলে ধরছি যাতে জাতি মনে রাখে। নতুন প্রজন্ম মনে রাখে। এ রাষ্ট্র গড়ে উঠার পেছনে কত অশ্রু কত বেদনা জড়িয়ে আছে।

তিনি বলেন, কান্নার কথা মনে না রাখলে মানুষ পূর্নাঙ্গ হয় না। আমরা এটা মনে রেখেছি এবং সবসময় হত্যাকারীদের বিচার চেয়েছি। দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম আমরাই ঘাতকদের শাস্তি দিতে পেরেছি। এটা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা না থাকলে হয়তো পারতাম না।

অধ্যাপক মুনতাসীর বলেন, আমাদের দুঃখ আছে আমরা পাকিস্তানিদের আমরা বিচার করতে পারলাম না কিন্তু একটা আশার আলোও আছে। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ছোট একটি দেশ গাম্বিয়ার মামলা করাতে ওয়াং সাং সুচি যিনি এ গণহত্যার সঙ্গে যুক্ত তিনি বলতে বাধ্য হচ্ছেন আত্বপক্ষ সমর্থন করবো।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যা যদি আন্তর্জাতিকভাবে সমাধান না হয় এ অঞ্চলে শিগগিরই বিভিন্ন অন্তর্ঘাতমূলক জঙ্গি, মৌলবাদী কাজ শুরু হবে যা থেকে ভারত, বাংলাদেশ ও পার্শ্ববর্তী কোনো দেশ বাদ পড়বে না। এ অঞ্চলের স্বার্থের জন্য, সার্কের স্বার্থের জন্য এ সমস্যার সমাধান করতে হবে।

ঢাবির এ অধ্যাপক বলেন, এই সম্মেলনে আমরা আশা করবো রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হবে এবং যদি আমরা পাকিস্তানিদের বিচার করতে পারতাম তাহলে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা এ কাজ করার সাহস পেতো না। সেজন্য আমরা মনে করি ঘাতক খুনিদের বিচার হওয়া উচিত। আজ বাংলাদেশ বা অন্য কোনো দেশ পাকিস্তানিদের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক আদালতে গেলে আমরা পাকিস্তানিদের বিচার করতে পারবো।

প্রথমদিন বাংলা একাডেমির তিনটি মিলনায়তনে সম্মেলনের ছয়টি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আগামীকাল একই মিলনায়তনে সংস্কৃতি সচিব ড. আবু হেনা মোস্তফা কামালের সভাপতিত্বে সম্মেলনের সমাপনী অনুষ্ঠিত হবে।

সম্মেলনে ইতালি, কম্বোডিয়া, তুরস্ক, মিয়ানমার, যুক্তরাজ্য, ভারত ও বাংলাদেশের শতাধিক গবেষক অংশগ্রহণ করেন।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত