প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সংঘাতময় বিশ্বে সংসদ সদস্যদের করণীয়

সমকাল: জ্ঞাত ইতিহাসে পৃথিবী কখনও খুব শান্তিপূর্ণ জায়গা ছিল- বলা যায় না সেটা। একেবারে আদিম সমাজেও গোত্রের সঙ্গে গোত্রের সংঘাত ছিল। এর পরও রাজা-সম্রাট শাসিত রাজ্যগুলো একটি অপরটির সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়েছে। আর আধুনিককালে বিশেষ করে রাষ্ট্র ধারণাটি আসার পর থেকে পৃথিবীতে এই সংকট আরও গভীর হয়েছে। তৈরি হয়েছে নানা নতুন ডাইমেনশন। এই পথে কোনো জাতি নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করেছে; কখনও যুদ্ধ হয়েছে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের কিংবা কখনও যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে প্রায় পুরো পৃথিবী। খুব কম সময়ের ব্যবধানে দুটি বিশ্বযুদ্ধের মুখোমুখি হয়েছে পৃথিবী। সেই ভয়ংকর যুদ্ধগুলোর পর মানুষের মনে একটা নতুন শুরুর আশা হয়তো হয়েছিল, এর পর পৃথিবী মোটামুটি শান্তিপূর্ণ একটা জায়গা হয়ে উঠবে। কিন্তু সেই আশা কতটা ভুল ছিল; বর্তমান পৃথিবী দেখলেই তা বোঝা যায়।

পৃথিবীর রাজনৈতিক ইতিহাস কীভাবে ‘শেষ’ হবে, বিভিন্ন সময়ে সেই ঘোষণা করেছিলেন বহু দার্শনিক। সর্বশেষবার সেটা করা হয়েছে ১৯৯২ সালে; করেছিলেন জাপানি বংশোদ্ভূত আমেরিকান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা। ‘দ্য এন্ড অব হিস্ট্রি অ্যান্ড দ্য লাস্ট ম্যান’ বইতে তিনি বলেছিলেন, কমিউনিজমের পতন হয়ে গেছে। এখন থেকে পৃথিবীর সব দেশ উদার গণতান্ত্রিক পুঁজিবাদী ধারার পথে হাঁটবে এবং সংঘাতের আর কোনো উপাদান থাকবে না। ভবিষ্যতে এ রকম একটা শান্তিপূর্ণ রাষ্ট্রব্যবস্থার উদ্ভব এর মধ্য দিয়েই ‘শেষ’ হবে পৃথিবীর ইতিহাস।

না, পৃথিবীর ইতিহাস শেষ হয়নি। পৃথিবীর কিছু স্বৈরতান্ত্রিক দেশে কিছু সময়ের জন্য উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এলেও সেটা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয়নি। বরং উদার গণতান্ত্রিক দেশগুলোর মধ্যেই একটার পর একটা দেশে বরং দক্ষিণপন্থি পপুলিস্ট রাজনীতির উদ্ভব হয়েছে। যার পথ ধরেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বড় সংখ্যায় ডেমাগগের আবির্ভাব হয়েছে, যারা শুধু মানুষের সত্যিকারের সমস্যা এবং প্রয়োজন নিয়ে কথা বলে জনপ্রিয় হওয়ার চেয়ে মানুষের মধ্যকার হিংসা, ভীতি, প্রতিহিংসা উস্কে দিয়ে জনপ্রিয় হওয়ার চেষ্টা করেন। তাদের ক্ষমতায় থাকার পুঁজিই হলো মানুষের আদিমতম রিপুগুলোকে উস্কে দেওয়া।

‘গ্লোবাল কাউন্সিল ফর টলারেন্স অ্যান্ড পিস’-এর অধীন সংসদ সদস্যদের সংগঠন ‘ইন্টারন্যাশনাল পার্লামেন্ট ফর টলারেন্স অ্যান্ড পিস (আইপিটিপি)’-এর একজন সদস্য আমি। এর অংশ হিসেবে গত মাসের শেষদিকে ইথিওপিয়ার আদ্দিস আবাবায় গিয়েছিলাম এ সংগঠনের সম্মেলনে। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের প্রায় ৫০টি দেশের প্রতিনিধি, যারা নিজ দেশের সংসদ সদস্যও; এ সম্মেলনে যোগদান করেছিলেন।

একজন নবীন সংসদ সদস্য আমি। তাই এ সম্মেলন আমার নিজের জন্য একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা অর্জনের জায়গা ছিল। বর্তমান বিশ্বপরিস্থিতির নানা বিষয়ে বক্তৃতা, গ্রুপ ডিসকাশন যেমন ছিল, তেমনি ছিল ব্রেকফাস্ট ও ডিনার টেবিলে ইনফর্মাল আলাপচারিতা এবং মতবিনিময়। এসব আলাপে উঠে এসেছে বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সমস্যা, সংকট এবং তা থেকে উত্তরণের উপায় নিয়ে নানামুখী পর্যালোচনা।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বর্তমানের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট কীভাবে পাল্টে যাচ্ছে, বিভিন্ন দেশ কীভাবে সেটা দেখছে এবং এই প্রবণতা কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে কারা কীভাবে কাজ করার চেষ্টা করছে, সে সম্পর্কে জানা ছিল আমার জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা।

আমি খেয়াল করলাম, সম্মেলনে আসা অনেকেই গণদেশত্যাগ, অসংখ্য মানুষের শরণার্থী হওয়া, পৃথিবীর নানা প্রান্তে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, সন্ত্রাসবাদ, গৃহযুদ্ধ এমনকি জলবায়ু পরিবর্তন রোধে কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনতে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণে অনীহার মতো বর্তমান পৃথিবীর ভয়ংকর সংকটগুলো নিয়ে খণ্ডিতভাবে আলোচনা করার চেষ্টা করেছেন। আবার কেউ কেউ এগুলোকে সমন্বিতভাবে দেখার পক্ষেও মত দিয়েছেন।

‘হাউ ডেমোক্রেসিজ ডাই’ বইয়ের লেখক হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় পলিটিক্যাল সায়েন্সের অধ্যাপক স্টিভেন লেভিটস্কি এবং ড্যানিয়েল জিবলাটের মতো আমিও বিশ্বাস করি, ওপরে উল্লিখিত আন্তঃরাষ্ট্রিক সমস্যাগুলো তো বটেই, বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরে ভিন্নমতের মানুষের ওপর দমন-পীড়ন, নাগরিকদের রাজনৈতিক এবং বাকস্বাধীনতা হরণ, মানবাধিকারের প্রতি নূ্যনতম ভ্রূক্ষেপ না করা, নির্বাচন ব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে একক ব্যক্তির সর্বময় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা; এমন সব বিষয় আসলে কতগুলো উপসর্গ। বিশ্বব্যাপী ডেমগগদের উত্থান এবং ডানপন্থি চরমপন্থার রাজনীতির বিকাশই হচ্ছে মূল রোগ।

এ সম্মেলনে ব্যক্তিগত আলাপচারিতা, গ্রুপ ডিসকাশন এবং আমার বক্তৃতায় আমি ঠিক এই কথাগুলো বলার চেষ্টা করেছি। আমি আরও বলেছি, যেহেতু এই সমস্যাগুলোর সৃষ্টি হয়েছে এক বিশেষ ধারার রাজনীতির প্রসারের কারণে, তাই সমাধানসূত্র নিহিত আছে রাজনীতিতেই। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে এই রাজনীতি একজন সাধারণ মানুষ অপছন্দ করতে পারেন, ঘৃণা করতে পারেন এবং দেশের ভোটাধিকার প্রয়োগ করার সুষ্ঠু পরিবেশ থাকলে তার বিরুদ্ধে ভোটও দিতে পারেন। কিন্তু একজন রাজনীতিবিদের দায়িত্ব এর চেয়ে অনেক বেশি।

উল্লিখিত ধারার বিপরীত ধারার রাজনীতির সবচেয়ে বড় বিপদ হচ্ছে বিদ্যমান স্রোত জনমতকে এমনভাবে প্রভাবিত করে, সেখানে রাজনীতিতে জনপ্রিয় হওয়ার জন্য ওই ধারার স্রোতে গা ভাসানোকেই সহজ বলে মনে হয়। সেই স্রোতের বিপরীতে কথা বলা অজনপ্রিয় হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। পরিস্থিতি কঠিন নিশ্চয়ই; কিন্তু উদার গণতন্ত্রে বিশ্বাসী রাজনীতিবিদদের খেয়াল রাখতে হবে, সাময়িক হতাশাজনক পরিস্থিতিতে হতাশ হয়ে রাজনৈতিক মতাদর্শ বিসর্জন দিয়ে পপুলিস্ট ধারার স্রোতে গা ভাসিয়ে যেন একেকজন ডেমগগ না হয়ে ওঠেন।

কোনো সন্দেহ নেই, বর্তমান বিশ্বে দেশগুলোর অভ্যন্তরে এবং আন্তঃরাষ্ট্রিক ক্ষেত্রে সংঘাত, অসহনশীলতা, চরমপন্থা প্রসার লাভ করার পেছনে রাজনীতিবিদরাই প্রধানত দায়ী। আবার একইভাবে সত্য হচ্ছে, এই প্রবণতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে পৃথিবীতে শান্তি ও সহনশীলতার রাজনীতি ফিরিয়ে আনতে হবে রাজনীতিবিদদেরই। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে হবে উদার গণতন্ত্রে বিশ্বাসী রাজনীতিবিদদের। আর সংসদে রাষ্ট্রের আইন প্রণয়ন, রাষ্ট্রীয় নীতির পর্যালোচনা-সংশোধন, সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং জনগণের অধিকারের পক্ষে কথা বলার ক্ষমতা থাকার কারণে এ ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের ভূমিকা অন্যান্য রাজনীতিবিদের চেয়ে অনেকখানি বেশি।

বর্তমান যে স্রোত বইছে, তার বিপরীতে হেঁটেও সাফল্য পাওয়া যায়- তার অসাধারণ উদাহরণ এই বছর শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ। নিজ দেশের অভ্যন্তরের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যকার সংকট-উত্তেজনা, পাশের দেশ ইরিত্রিয়ার সঙ্গে সংঘর্ষ-সংকট- সবকিছু সমাধান করে তিনি চেষ্টা করছেন একটা শান্তি ও সহনশীলতার রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে। পুরোপুরি সফল তিনি হয়েছেন বলা যায় না এটা। তার নিজ দেশের ভেতরে এখনও নানা রকম সংঘাত চলছে। কিন্তু তিনি এটা প্রমাণ করেছেন- চেষ্টা করলে স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়েও সাফল্য পাওয়া যায়। সে বিবেচনায় এ সম্মেলনের স্থান আদ্দিস আবাবার একটা ভিন্ন তাৎপর্য তো আছেই।

আমি বিশ্বাস করি, আদ্দিস আবাবার এ সম্মেলনে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করা, অংশগ্রহণকারী সাংসদদের নিজ নিজ দেশে এ ক্ষেত্রে কাজ করতে আগের চেয়ে আরও বেশি উদ্বুদ্ধ করবে। নিয়মিত এ ধরনের সম্মেলন, পারস্পরিক অভিজ্ঞতা ও মতবিনিময় রাজনীতিবিদদের সঠিক পথে থাকতে প্রেরণা জোগাবে। সংঘাত, অসহনশীলতা, চরমপন্থার পৃথিবীতে সংসদ সদস্যদের করণীয় হচ্ছে শান্তি আর সহনশীলতার উদার গণতান্ত্রিক মতবাদকে মানুষের কাছে আরও বেশি করে নিয়ে যাওয়া; তাকে প্রতিষ্ঠিত করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাওয়া।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত