প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

উড়োজাহাজে তাদের পাশে বসতেও জাত যায় আমাদের

তুষার আবদুল্লাহ :  তুষার আবদুল্লাহযে রিকশায় বাড়ি ফিরছিলাম, তার চালকের সঙ্গে কথা হচ্ছিল না। সাধারণত রিকশায় উঠে বসার পর থেকেই কথা শুরু করি। দুনিয়ার হাল-হকিকত জানতে তারা খবরের ভালো উৎস। এমনকি দেশ ভালো যাচ্ছে নাকি খারাপ যাচ্ছে, মানুষের মুখের হাসি কতোটা প্রশস্ত, এই খবরটিও তাদের কাছ থেকে জানা যায়। দুয়েকবার রিকশাচালকের গ্রামের বাড়ির কথা জানতে চেয়েও উত্তর পাইনি বলে চুপচাপ ছিলাম। গন্তব্যের কাছাকাছি যখন, তখন ঘাড় ঘুরিয়ে বললেন, ‘সৌদি আরবে জানাশোনা কেউ আছে?’ জানতে চাইলাম, কেন? তার জিজ্ঞাসা, ‘একটা খবর নেওয়া যায়?’ বললাম—কীসের? জানালেন, ‘আমার বউটা পড়ে আছে সৌদিতে, কোনও খোঁজ নাই। ফোন নম্বর নাই।’ জানতে চাই, প্রবাসী কল্যাণের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে কিনা? জানান, ‘দুয়েকবার গেছি। কেউ কিছু বলে না। তাড়ায় দেয়।’ নিজেই বললেন, ‘আমার বউয়ের নাম লাভলী। এমন নামের কোনও লাশ আসলেও জানাইয়েন।’ তারপর নিজের মোবাইল নম্বর দিয়ে দিলেন। জানতে চাইলাম, লাশের কথা বলছেন কেন? বলেন, ‘শুনলাম এখন নাকি লাশই আসে, মেয়ে মানুষ আর ফিরে না।’ নেমে যাওয়ার সময় বলি, এতো যে মেয়েরা এসে বলছে ওখানে নির্যাতন করে, বেতন দেয় না, তারপরও পাঠালেন। ভাড়া টাকা বুঝে নিতে নিতে বললেন, ‘গরিবের দুঃখ আপনারা বুঝবেন কীভাবে?’

গ্রামে-গঞ্জে অনেকের সঙ্গেই দেখা হয় যাদের ঘরের মেয়েরা সৌদি আরব, জর্ডান, লেবানন, ওমান এবং আরব আমিরাতে আছেন। কারও সঙ্গে যোগাযোগ আছে, কারও সঙ্গে নেই। অনেকেই উদ্বেগ নিয়ে আছেন। মেয়ে সুস্থভাবে বা জীবিত ফিরবে কিনা। সবার যে এক অবস্থা তা নয়, অনেক নারী শ্রমিক নিয়মিতই টাকা পাঠাচ্ছেন। তবে অনিয়মিতই বেশিরভাগ। যে পাঁচ দেশের কথা বলা হলো সেখানে ২ লাখ ২০ হাজার নারী শ্রমিক কাজ করেন। সুস্থভাবে ফিরে আসা নারী শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল বেশ কয়েকবার। তারা বলেছেন, রিক্রুটিং এজেন্ট বা দালালরা যে লোভ দেখায় তার সঙ্গে বাস্তবের মিল নেই মোটেও। ওমানের মাস্কটেও এক নারী শ্রমিকের সঙ্গে কথা হয়েছিল। তিনি জানিয়েছিলেন প্রবাসে গিয়ে বিপদে পড়লে দূতাবাসকে পাওয়া যায় না। দূতাবাসে অভিযোগ দিতে গিয়ে আরও হয়রানির মুখে পড়তে হয়। অসুস্থ, দুর্ঘটনা দূরের কথা, কেউ মারা গেলে লাশ পাঠানোর বেলায়ও কোনও সহায়তা পাওয়া যায় না। গত ১৫ বছরে প্রবাসে মৃত্যু হয়েছে ৩ হাজার ৮শ’ নারী শ্রমিকের। নির্যাতনের শিকার হয়ে, মালিকের কাছ থেকে মুক্ত হতে না পেরে বা লজ্জায় আত্মীয়-পরিজনের কাছে ফেরার মানসিক শক্তি হারিয়ে আত্মহত্যা করেছেন ৫৩ নারী শ্রমিক। শুধু নারী শ্রমিকই নয়, অমানবিক পরিশ্রম ও দুর্ঘটনার শিকার হয়ে প্রতিবছর ৩ হাজার প্রবাসী শ্রমিকের লাশ দেশে আসে। প্রবাসী শ্রমিকদের শতকরা ৬২ জনের মৃত্যুর কারণ স্ট্রোক। বুঝাই যাচ্ছে মানসিক ও শারীরিক চাপ সইতে না পারাই এজন্য দায়ী। বাস্তবতা হলো এর মাঝেও যদি বাংলাদেশের দূতাবাস কর্মকর্তারা এই শ্রমিকদের পাশে থাকতেন, তাহলে তাদের মানসিক চাপ অনেকটা কমে যেতো। প্রবাসে আমাদের দূতাবাসের কর্তাদের বেশিরভাগের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা দেশ থেকে যাওয়া নানা প্রকৃতির ভিআইপিদের প্রটোকল দিতেই ব্যস্ত থাকেন। আর ব্যস্ত থাকেন ব্যক্তিগত বিলাসিতায়।

প্রবাসী জনশক্তি বিভাগ বা সরকারের পক্ষ থেকে বলা হতে পারে, প্রবাসে চাকরি নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তো সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হয়। তারপরও যদি তারা যান, তাহলে এর দায় কেন সরকার বা প্রবাসী জনশক্তি বিভাগ নেবে? দুর্নীতিবিরোধী বা দুর্নীতি, ঘুষ থেকে দূরে থাকতেও জনসচেতনতামূলক প্রচারণার ঘাটতি নেই। সরকারের দিক থেকেও তো হুঙ্কার কম নেই। তারপরও আপনারা লোভে পড়ে দুর্নীতি, ঘুষের সঙ্গেই আছেন। কিন্তু প্রবাসে যারা জমি বেচে, বাড়ি বেচে, অলংকার বেচে অনিশ্চিত যাত্রা করছেন, তারা সর্বস্বের বিনিময়ে শুধু নিজের নয়, পরিবারের ভাগ্য ফেরাতে চান। এই লড়াকু মানুষগুলোর পাঠানো টাকা দিয়েই আমাদের রেমিট্যান্সের সূচক ঊর্ধ্বমুখী থাকে। অর্থনীতির সচ্ছলতার বড়াই করি। মধ্যম পেরিয়ে উচ্চে যাওয়ার স্বপ্ন দেখি। অথচ প্রবাসের দূতাবাসে, দেশের বিমানবন্দরে সবচেয়ে অস্পৃশ্য তারা। নাক সিঁটকানো, তাদের নিয়ে হাসিঠাট্টা আমরা তথাকথিত সুবিধাবাদী, বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণির মানুষেরা করি। উড়োজাহাজে তাদের পাশে বসতেও জাত যায় আমাদের। তাই সুমির অসহায় অবস্থা, নির্যাতনকে আমরা বানানো গল্প বলি। লাভলী অথবা তার মতো কোনও প্রবাসী শ্রমিকের লাশের মিছিলকে আমরা বলে ফেলতে পারি ‘নগণ্য’।

এই অকৃতজ্ঞতা আসলে জাতি হিসেবে আমাদের দৈন্যতারই পরিচয় দেয়। প্রবাসে আমাদের যে উচ্চ শ্রেণির বসবাস, যারা দ্বিতীয় ভূমিতে টাকা পাচার করে, তাদের নীচতাই বরং লজ্জার। নগণ্যকে আমলে এনে, তাদের পাশে দাঁড়ানোটা মহানুভবতা নয়, দায়িত্ব বলেই দেখতে হবে।

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত