প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সিদ্ধেশ্বরীতে সগিরা মোর্শেদ হত্যা মামলা ৩০ বছর পর চার আসামি গ্রেপ্তার

সুজন কৈরী : রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী এলাকায় ভিকারুননেসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনে সগিরা মোর্শেদ সালামকে গুলি করে হত্যা মামলার চার আসামিকে ৩০ বছর পর গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। গ্রেপ্তার চারজন হলেন- সগিরার স্বামীর ভাই ডা. হাসান আলী চৌধুরী, তার স্ত্রী সায়েদাতুল মাহমুদা শাহীন, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের কর্মকর্তা আনাস মাহমুদ রেজওয়ান ও আবাসন ব্যবসায়ী মারুফ রেজা।

বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর ধানমন্ডিতে পিবিআইয়ের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আরো জানানো হয়, গত ১০ নভেম্বর আনাস মাহমুদ, ১১ নভেম্বর হাসান আলী চৌধুরী ও তার স্ত্রী, ১৩ নভেম্বর মারুফ রেজাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা সবাই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

সংবাদ সম্মেলনে পিবিআই প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার জানান, ১৯৮৯ সালের ২৫ জুলাই বিকেলে মেয়ে সারাহাত সালমাকে স্কুল থেকে আনতে যান সগিরা মোর্শেদ। স্কুলের সামনে পৌঁছা মাত্র অজ্ঞাতনামা দুষ্কৃতিকারীরা তার বালা টান দেয়, দিতে অস্বীকার করলে তাকে গুলি করে। গুরুতর অবস্থায় সগিরাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষনা করেন। ওই ঘটনায় সগিরার স্বামী আ. ছালাম চৌধুরী রমনা থানায় মামলা দায়ের করেন। যার তদন্ত করে ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। তদন্ত শেষে ডিবি পুলিশ ছিনতাইকারী মিন্টু ওরফে মন্টুর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করে। এরপর আদালত অভিযুক্তের বিরুদ্ধে চার্জগঠন করে বিচার কাজ শুরু করেন। বিচার চলাকালে ৬ জন সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহন করা হয়। জবানবন্দিতে সন্দিদ্ধ আসামী মারুফ রেজার নাম আসায় মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য আবেদন করলে আদালত মঞ্জুর করেন। আদালতের আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে সন্দিদ্ধ আসামী মারুফ রেজা হাইকোর্ট বিভাগে ক্রিমিনাল রিভিশন মামলা দায়ের করে। এরপর ১৯৯০ সাল থেকে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত মোট ২৬ জন তদন্তকারী কর্মকর্তা ওই মামলাটি তদন্ত করেন। দীর্ঘদিন পর চলতি বছরের গত ১১ জুলাই হাইকোর্ট বিভাগ ক্রিমিনাল মিস মামলাটি খারিজ করে অধিকতর তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য পিবিআইকে নির্দেশ দেন। এরপর পিবিআই মামলার তদন্ত শুরু করে। এরই প্রেক্ষিতে হত্যাকা-ে সম্পৃক্ততা পাওয়ায় গত ১০ নভেম্বর রামপুরা থেকে আনাছ মাহমুদরক গ্রেপ্তার করা হয়। তার দেয়া তথ্যে ১২ নভেম্বর ধানমন্ডি থেকে ডা. হাসান আলী চৌধুরী ও তার স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন বেইলী রোড থেকে গ্রেপ্তার করা হয় মারুফ রেজাকে। সগিরা হত্যাকান্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ডা. হাসান আলী চৌধুরী ও তার স্ত্রী। আনাছ মাহমুদ এবং মারুফ রেজা পরিকল্পনা অনুযায়ী হত্যায় অংশ গ্রহন করেন।
তিনি বলেন, চার জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র দাখিলের জন্য আরো দুমাস সময় চাওয়া হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে অভিযোপত্র দাখিল করা হবে।

পিবিআই জানায়, সগিরা হত্যা মামলার বাদী আ. ছালাম চৌধুরী ও তার বড় ভাই সামছুল আলম চৌধুরী এবং মেঝ ভাই ডা. হাসান আলী চৌধুরী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে অধ্যয়নরত অবস্থায় সগিরার সঙ্গে ছালাম চৌধুরীর মধ্যে সু-সম্পর্ক তৈরী হয়। পরে দুই পরিবারের অভিবাবকদের সম্মতিতে ১৯৭৯ সালের ২৫ অক্টোবর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৮০ সালে শিক্ষকতা করতে ছালাম চেীধুরী স্ব-পরিবারে ইরাক যান। ইরাক-ইরান যুদ্ধের কারণে ১৯৮৪ সালে দেশে ফিরে এসে পৌত্রিক ভিটা রাজারবাগ পেট্রোল পাম্প সংলগ্ন দোতলার বাসায় থাকতে শুরু করেন। দাম্পত্য জীবনে সগিরা ও ছালামের ৩ কন্যা সন্তান ছিলো। তারা হলো- সারাহাত সালমা চৌধুরী (৭), সামিয়া সারোয়াত চৌধুরী (৫) ও সিফাত আবিয়া চৌধুরী (২)।

অপরদিকে ডা. হাসান আলী চৌধুরী বারডেম হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার হিসাবে কর্মরত। ১৯৮০ সালে সায়েদাতুল মাহমুদা ওরফে শাহিনকে বিয়ে করেন। ওই বছরের ২২ জুন স্ত্রীকে নিয়ে লিবিয়ায় যান। ১৯৮৫ সালে স্ত্রী ও দুই সন্তানসহ দেশে ফিরে রাজারবাগে বাবার বাসায় তার মা, বড় ভাইয়ের সঙ্গে নীচ তলায় কিছুদিন থাকেন। পরে বাড়ীর দ্বিতীয় তলায় ছোট ভাই ছালাম চৌধুরীর বাসায় একটি রুমে স্ব-পরিবারে থাকতে শুরু করেন। এক বাসায় থাকার কারণে হাসান আলী চৌধুরীর স্ত্রী সায়েদাতুল মাহমুদার সঙ্গে ছালাম চৌধুরীর স্ত্রী সগিরা মোর্শেদের গৃহস্থালীর ব্যাপারে দ্বন্দ্বের শুরু হয়। প্রায় ৬ মাস থাকার পর ১৯৮৬ সালের এপ্রিল মাসে ওই বাড়ীর তৃতীয় তলার কাজ সম্পন্ন হলে হাসান আলী চৌধুরী স্ত্রী-সন্তানসহ সেখানে উঠেন। তৃতীয় তলা থেকে ময়লা ফেলা ও বিভিন্ন কারণে হাসান আলী চৌধুরীর স্ত্রীর সঙ্গে সগিরা মোর্শেদের দ্বন্দ্ব হয়েছিল। সগিরা মোর্শেদ ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে মাস্টার্স পাশ আর সায়েদাতুল মাহমুদা বিএ পাশ ছিল। পারিবারিক তুচ্ছ বিষয়গুলো নিয়ে ডা. হাসান আলী চৌধুরী ও তার স্ত্রীর মনে ইগোর সৃষ্টি হয়। ১৯৮৯ সালের প্রথম দিকে হাসান আলী চৌধুরীর স্ত্রী সগিরা মোর্শেদকে একটু শায়েস্তা করার কথা বলেন। স্ত্রীর কথায় হাসান আলী চৌধুরী রাজি হয়ে তার রোগী গ্রেপ্তার তৎকালীন সিদ্ধেশ^রী এলাকার নামকরা সন্ত্রাসী এবং তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর জেনারেল (অব.) মাহমুদুল হাসানের ভাগ্নে মারুফ রেজার সঙ্গে কথা বলেন। ওই কাজের জন্য ডা. হাসান আলী চৌধুরী মারুফ রেজাকে তৎকালীন ২৫ হাজার টাকা দেয়ার কথা ছিল। এছাড়া সগিরা মোর্শেদকে চিনিয়ে দিতে হাসান আলী চৌধুরীর তার শ্যালক আনাস মাহমুদকে মারুফ রেজার সহযোগী হিসেবে নিয়োগ করেন। ঘটনার দিন (১৯৮৯ সালের ২৫ জুলাই) ডা. হাসান আলী চৌধুরী তার শ্যালক আনাস মাহমুদকে বেলা ২ টার দিকে ফোন করে মৌচাক মার্কেটের সামনে যেতে বলেন। আর মারুফ রেজা মোটর সাইকেলে যাওয়ার কথা জানান। হাসান আলী চৌধুরী তার শ্যালককে মারুফ রেজার সঙ্গে গিয়ে সগিরা মোর্শেদকে দেখিয়ে দিতে বলেন। বিকেল পৌনে ৫টার দিকে ডা. হাসান আলী চৌধুরীর শ্যালক আনাস মাহমুদ মারুফ রেজার মোটর সাইকেলের পিছনে উঠে মৌচাক মার্কেটের সিদ্ধেশ^রী কালি মন্দিরের গলি দিয়ে সিদ্ধেশ^রী রোডে যান। তারা সগিরা মোর্শেদকে রিক্সায় ভিকারুননিসা নূন স্কুলের দিকে যেতে দেখে ফলো করেন। মারুফ রেজা স্কুলের একটু আগে মোটর সাইকেল দিয়ে সগিরা মোর্শেদের রিক্সা ব্যারিকেড দেয়। মারুফ রেজা সগিরা মোর্শেদের হাত ব্যাগ নিয়ে নেয় এবং হাতের চুড়ি ধরে টানা হেঁচড়া করেন। তখন সগিরা মোর্শেদ গ্রেপ্তার আনাস মাহমুদকে চিনে ফেলে এবং বলে ‘এই আমি তো তোমাকে চিনি, তুমি এখানে কেন?’। এই কথা বলার পরপরই মারুফ রেজা ব্যাগ ছেড়ে কোমর থেকে পিস্তল বের করে ১ টি গুলি করে যা সগিরা মোর্শেদের হাতে লাগে। এরপর মারুফ আরো ১টি গুলি করে, যা সগিরা মোর্শেদের বাম বুকে লাগে। এ সময় সগিরা মোর্শেদ রিক্সা থেকে পড়ে যান। তখন আরো ২ টি ফাঁকা গুলি করে মারুফ ও আনাস মাহমুদ মোটর সাইকেলে করে পালিয়ে যান। হত্যাকা-ের পর ডা. হাসান আলী চৌধুরী বাদী আব্দুস ছালাম চৌধুরীকে মামলাটি উঠিয়ে নিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হুমকিসহ চাপ দিতে থাকেন। এছাড়া ‘তোমার তিন মেয়েকে নিয়ে ভাল থাকো মামলা নিয়ে বাড়াবাড়ি করবে না’ মর্মে চিরকুট লিখে বাদীর বাসার দরজার নিচ দিয়ে প্রবেশ করান। সেইসঙ্গে মারুফ রেজাও বেনামী টেলিফোনে মামলা উঠিয়ে নিতে হুমকি দিতে থাকেন।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত