প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রাজধানীতে বেড়েছে কিউলেক্স মশার উৎপাত 

ইনকিলাব : রাজধানীতে বাড়ছে মশার উপদ্রব। অথচ মশা নিধনে দুই সিটি কর্পোরেশনের কোনো কার্যক্রম চোখে পড়ছে না। এডিশের পর এবার রাজধানীতে বেড়েছে কিউলেক্স মশার উপদ্রব। এডিস মশার পাশাপাশি এখন কিউলেক্স মশাও ভয়াবহ রোগ ছড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিউলেক্স মশা থেকে জাপানিজ এনসেফালাইটিসের মতো মারাত্মক রোগ হয়ে থাকে। এ রোগ গত কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশে দেখা যাচ্ছে।

রাজধানীতে গত জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে যায়। এর আগে মশার উপদ্রব বাড়লেও সিটি কর্পোরেশন ছিল নীরব। মশা নিধনে তাদের কোনো কার্যকর উদ্যোগ ছিল না। সিটি কর্পোরেশনের ব্যর্থতার জন্য রাজধানীতে ডেঙ্গুর প্রকোপ একসময় ভয়াবহ আকার ধারণ করে। পরে তা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। শীতের প্রারম্ভে আবার রাজধানীতে মশার উপদ্রব যখন বাড়ছে সিটি কর্পোরেশন এবারও কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করছে না। এতে আবারও কিউলেক্স মশার কামড়ে জাপানিজ এনসেফালাইটিসের মতো মারাত্মক রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন রাজধানীবাসী। তাদের মনে প্রশ্ন মশা নিধনে দুই সিটি কর্পোরেশনের কোটি কোটি টাকার বাজেট কোথায় যায়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. সানিয়া তহমিনা বলেন, ঢাকায় আমরা সার্ভে করে দেখেছি শীতকালে মাত্র ১-২ শতাংশ থাকে এডিস মশা, বাকি ৯৮-৯৯ শতাংশই থাকে কিউলেক্স মশা। অন্য সময়ে কিছুটা হেরফের হলেও বেশির ভাগই কিউলেক্সের রাজত্ব বা উৎপাত থাকে। তাই এ মশার ব্যাপারেও আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।

রোগতত্ত¡, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক ড. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, এডিসের সঙ্গে কিউলেক্স মশার যন্ত্রণাও কম নয়। শুধু এডিস নিয়ে ভাবলে চলবে না, আমাদের কিন্তু কিউলেক্স মশার ব্যাপারেও সতর্ক থাকতে হবে। কারণ এটা থেকেও জাপানিজ এনসেফালাইটিসসহ (জেই) আরো কয়েকটি রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে থাকে। বিশেষ করে আমাদের দেশে কয়েক বছর ধরেই ‘জেই’ আছে। ফাইলেরিয়াও আছে।

ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের প্রতিটি ওয়ার্ডেই মশার উপদ্রব দেখা দিয়েছে। তবে মশা নিধনে সিটি কর্পোরেশনের কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। নগরীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কিছু দিন আগে সিটি কর্পোরেশনের কর্মীদের মশা নিধনে যেভাবে দেখা যেত এখন আর তাদের সেভাবে খুঁজে পাওয়া যায় না। মোহাম্মদপুরের বসিলা এলাকার বাসিন্দা জামাল উদ্দিন বলেন, এখন সন্ধ্যা হলে ঘরে বাইরে কোথায়ও একটু শান্তিতে বসতে পারি না। মশা এতটাই বেড়েছে যে এক মিনিটের জন্যও বসে থাকা যায় না। আসলে সিটি কর্পোরেশন লোক দেখানোর জন্য কিছু কাজ করেছিল। এখন আর তাদের খোঁজ নেই। একই অবস্থা পুরানো ঢাকার বিভিন্ন এলাকার। লালবাগের বাসিন্দা জাকির হোসেন জানমান বলেন, গত ১৫ দিন সিটি কর্পোরেশনের কোন মশক নিধনকর্মীকে দেখিনি। সিটি কর্পোরেশন কি কোনো কাজ করে? কয়েকদিন লোক দেখানোর জন্য কিছু কাজ করেছিল। তিনি বলেন, রাজধানীতে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আসার ক্ষেত্রে সিটি কর্পোরেশনের কোনো ভূমিকা আছে বলে আমার মনে হয় না। এটা মানুষ নিজের প্রয়োজনে সচেতন হওয়ার কারণেই কমেছে। কিন্তু সিটি কর্পোরেশন যে ড্রেন পরিষ্কার করবে, ডোবা-আবর্জনা পরিষ্কার করবে, শহর পরিষ্কার রাখবে সেই কাজই তো করে না। রোগব্যাধিতে নগরবাসী যখন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে তখন কিছু তৎপরতা দেখা যায়। কয়েকদিন মশা নিধনের ওষুধ ছিটিয়ে কোটি কোটি টাকা অসাধু কর্মকর্তারা হাতিয়ে নেয়।
মশা নিধন কর্মসূচি আওতায় চলতি অর্থবছরে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মোট বরাদ্দ ৪৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এ খাতে ঢাকা দক্ষিণ সিটির বরাদ্দ ৪৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এই বরাদ্দের এক তৃতীয়াংশও মশা নিধনে খরচ হয়না এমন অভিযোগ নগরবাসীর।

দুই সিটি কর্পোরেশন মশা নিধন কর্যক্রমের গতি কমিয়ে দিয়েছে তা স্বীকার করেছেন ঢাকার একজন মেয়র। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন বলেন, আমি একমত মশা নিয়ন্ত্রণে আমাদের কাজ কিছুটা ধীরগতির হয়েছে। তবে আমরা বসে নেই। শহরে শীতের মধ্যে কিউলেক্স মশার উপদ্রব বেড়ে যায়, যদিও এটা প্রাণঘাতী কোনো মশা নয়। কিউলেক্স মশা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সব ধরনের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। আমাদের চলমান কার্যক্রম কিছুটা ধীর হয়েছে, এ বিষয়ে আমি একমত। তাই মন্থর গতিটা কাটিয়ে দ্রæততম সময়ের মধ্যে কার্যক্রম জোরদার করা হবে।

অন্যদিকে মশা নিয়ন্ত্রণে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ আতিকুল ইসলাম বলেন, মশক নিয়ন্ত্রণে আমরা বছরব্যাপী পরিকল্পনা নিয়েছে। এটাকে আমরা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেই কার্যক্রম এগিয়ে নিচ্ছি।
রাজধানীর গোড়ান শান্তিপুর এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ আলাউদ্দিন বলেন, মাঝখানে মশার উপদ্রব কিছুটা কম ছিল। আর ডেঙ্গু নিয়া যে হৈ চৈ ছিল, তখন প্রতিদিন মশার ওষুধ ছিটাতে দেখতাম। এখন আর তা দেখা যাচ্ছে না। এখন তো আবার আগের মতোই দিনে-রাতে মশার উৎপাতে অতিষ্ঠ।
রাজধানীতে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে মশা নিধন বা নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রমও ঝিমিয়ে পড়েছে। আগস্ট-সেপ্টেম্বরে মশা নিধনে যে আয়োজন ছিল তার কিছুই এখন দেখা যাচ্ছে না। এদিকে শীতে শুরুতেই সারা দেশেই মশার উপদ্রবও আবার বেড়ে গেছে।

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মমিনুর রহমান মামুন মশা নিধন কার্যক্রম শিথিল হওয়ার প্রশ্নে বলেন, কার্যক্রম শিথিল হয়নি, এখনো প্রতিদিনই কাজ চলছে। তবে অভিযানে কিছুটা ধীরগতি এসেছে। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ শরীফ আহম্মেদ বলেন, গত আগস্ট, সেপ্টেম্বরে যেভাবে বহুমুখী অভিযান কিংবা সচেতনতা কার্যক্রম দৃশ্যমান ছিল সেটা কিছুটা শিথিল হয়েছে। তবে মশা নিধনে ওষুধ প্রয়োগ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মতো মূল যে কাজ, সেগুলো নিয়মিতভাবেই চলছে। আমাদের কীটনাশকও এখন পর্যাপ্ত পরিমাণে আছে। অনুলিখন : ওয়ালি উল্লাহ, সম্পাদনা : সালেহ্ বিপ্লব

 

সর্বাধিক পঠিত