প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রোহিঙ্গা সংকট : বিশ্ব সম্প্রদায় নিরুদ্বিগ্ন কেন?

মাহফুজা অনন্যা: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গা সমস্যাকে বাংলাদেশের পাশাপাশি আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্যও হুমকি বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, এ অঞ্চলের নিরাপত্তা রক্ষা করতে চাইলে এ সমস্যার আশু সমাধান প্রয়োজন। তিনি বিষয়টি অনুধাবন করে বিশ্ব সম্প্রদায়কে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ায় আহ্বান জানিয়েছেন।

নির্যাতনের মুখে ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা মিয়ানমার ত্যাগে বাধ্য হয়। বাংলাদেশ সম্পূর্ণ মানবিক কারণে তাদের আশ্রয় দিলেও এই বিপুল জনগোষ্ঠীর ভার বহনের ক্ষমতা আমাদের নেই। রোহিঙ্গারা দীর্ঘদিন এ দেশে থাকলে অর্থনৈতিক-সামাজিক-রাজনৈতিক এবং নিরাপত্তাজনিত সমস্যা দেখা দেবে। রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার আগ্রহ মিয়ানমারের নেই। আবার তাদের ওপর চাপ প্রয়োগের ক্ষেত্রেও বিশ্ব সম্প্রদায়ের মধ্যে নিরুদ্বিগ্ন ভাব দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা এখন পর্যন্ত কোনো আলোর রেখা দেখাচ্ছে না। সংকট আরো গভীর হওয়ার আগেই সবার শুভবুদ্ধির উদয় হওয়া প্রয়োজন।

রোহিঙ্গা সংকট শুরুর একমাসের মধ্যেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে সংকট সমাধানে ৫টি সুপারিশ তুলে ধরেন। এছাড়াও বাংলাদেশের কূটনীতিকদের বড় প্রচেষ্টা ছিল মিয়ানমারের উপর চাপ তৈরি করা।সংকট সমাধানের জন্য বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সমর্থন লাভের চেষ্টা করে বাংলাদেশ।রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সরকার প্রত্যাবাসনের সিদ্ধান্তে আলোচনায় বসেছিল।২০১৮ সালের ২৩ জানুয়ারি প্রত্যাবাসন শুরুর কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা আর হয়নি।রোহিঙ্গা সংকটের তিনমাসের মধ্যে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই ঢাকা সফরকালের এক সপ্তাহের মধ্যেই মিয়ানমারের সাথে সমঝোতা স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ।তবু নয়মাসেও রোহিঙ্গা সংকটের কোন অগ্রগতি হয়নি।

রোহিঙ্গারা তখন ৮দফা দাবি তুলেছিল প্রত্যাবাসনের শর্ত হিসেবে।নাগরিকত্ব,নিরাপত্তা, বাড়িঘর,হারানো জমি-জমা ফিরে পাওয়ার মতো শর্তগুলো নিয়ে তখন বিক্ষোভ করেছিল ‘আরাকান রোহিঙ্গা হিউম্যান রাইট এন্ড পিস সোসাইটি’ নামের একটি সংগঠন।এবছর আবারও প্রত্যাবাসনের একটি সম্ভাব্য তারিখ মিয়ানমারের পক্ষ থেকে প্রকাশের পর বাংলাদেশের ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন বিষয়ক কমিশনার মোহাম্মদ আবুল কালাম বিবিসিকে জানিয়েছেন তারাও প্রায় সাড়ে তিন হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠানোর কাজ করছেন।অর্থাৎ ২২ হাজার রোহিঙ্গার মধ্যে সাড়ে তিন হাজার রোহিঙ্গার নাম প্রত্যাবাসনের জন্য নির্বাচিত করে বাংলাদেশকে একটি তালিকা পাঠিয়েছেন। তালিকা পাওয়ার পর এসব রোহিঙ্গাদের মতামত যাচাই করার জন্য জাতিসংঘ শরনার্থী সংস্থাকে অনুরোধ করে এবং সংস্থার কর্মীরা ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছেন বলে জানা যায়।কিন্তু প্রত্যাবাসনের জন্য নির্বাচিত জায়গা এবং যেখান থেকে বিদায় দেওয়া হবে সেসব জায়গাগুলোতে অবকাঠামোগত প্রস্তুতি আগেই নেওয়া শুরু হয়েছে বলে প্রত্যাবাসন বিষয়ক কমিশনার নিশ্চিত করেছেন।এদিকে রোহিঙ্গা নেতারা বলছেন প্রত্যাবাসনের জন্য তাদের সুনির্দিষ্ট নীতি ও দাবি আছে।সেগুলো বাস্তবায়ন না করলে প্রত্যাবাসনে কেউ রাজী হবেন না।

বাংলাদেশ এবং মিয়ানমারের সমঝোতা চুক্তিতে পরিস্কারভাবে বলা আছে তারা প্রত্যাবাসিত হবেন নিজগ্রামে,সম্ভব হলে স্বগৃহে, কিংবা কোন কারণে যদি তা নাও হয় তবে এমন কোনো স্থানে তাদের নেওয়া হবে যে তা তাদের গ্রামের নিকটবর্তী।কিন্তু মিয়ানমার শুধু মোটাদাগে দুটি অভ্যর্থনা ক্যাম্প এবং একটি ট্রানজিট ক্যাম্প তৈরি করেছে।অন্যদিকে প্রত্যাবাসন এর প্রশ্নে মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সূচি সিঙ্গাপুরে এক অনুষ্ঠানে বলেছেন মিয়ানমার শরনার্থীদের নিতে প্রস্তুত, তাদের জন্য জায়গাও ঠিক করা হয়েছে, কিন্তু তাদের পাঠানোর দায়িত্ব মূলত বাংলাদেশের।অং সান সূচির এমন বক্তব্য বাংলাদেশেরর জন্য বিস্ময়কর,হতাশাজনক এবং দুর্ভাগ্যজনকও বটে!

নভেম্বরে সই হওয়া চুক্তি ১০ মাসে এসেও যখন বাস্তবায়ন হয়নি,তারপরও অং সান সূচির দায়হীন বক্তব্য বাংলাদেশের জন্য চরম আশংকাজনক!এখন ১১ লাখেরও বেশী রোহিঙ্গা নিয়ে চরম সংকটে আছে বাংলাদেশ!এদিকে প্রত্যাবাসনের জন্য ৫ টি দাবি সম্বলিত একটি লিফলেট গত দুদিন ধরে ক্যাম্পগুলোতে প্রচার করছে ‘ভয়েস অব রোহিঙ্গা’ নামের একটি সংগঠন।রোহিঙ্গা সংকট শুধু বাংলাদেশেই নয় দেশের বাইরেও অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরী করছে ভয়ঙ্করভাবে।বরিশাল সফরে এসে ব্রিটিশ হাইকমিশনার রবার্ট চ্যাটারসন ডিকসন বলেছেন রোহিঙ্গা সংকট শুধু বাংলাদেশে নয় সারা বিশ্বের নিরাপত্তার জন্য এটি হুমকিস্বরুপ।বিশ্বে অনেক সমস্যা আছে তবে রোহিঙ্গা সংকট একটি অন্যতম সমস্যা।রবার্ট চ্যাটারসন ডিকসন বলেছেন রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদেও আলোচনা করা হয়েছে।এখন রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে বিশ্বের সকল দেশকে একযোগে কাজ করতে হবে।

তাছাড়া রোহিঙ্গা সংকট এখন আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে! ক্রমবর্ধমান স্থানসংকট ও পরিবেশগত অবক্ষয়ের ফলে সেই এলাকার পরিবেশ, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ঝুঁকিতে আছে।রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে জাতিসংঘ কতটুকু কার্যকর ভূমিকা নিবেন তার জন্য অপেক্ষা বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশসমূহের।রোহিঙ্গাদের আত্মীয়স্বজন এখনও যারা মিয়ানমারে আছেন তাদের ও রোহিঙ্গাদের ভাষ্যমতে ‘মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিলেও তাদেরকে তাদের জমিজমা,ঘরবাড়ি ফিরিয়ে দেবে না,তাদেরকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে রাখা হবে’। এমতাবস্থায় রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরে যেতেও রাজী নন। তারা মর্যাদার সাথে সব অধিকার ফিরে পেতে চায়। রোহিঙ্গারা যাতে সব অধিকার নিয়ে নিজের দেশে ফিরে যেতে পারেন এ কামনা বাংলাদেশসহ সকল দেশের।আর রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে তাদের এ নিশ্চয়তা মিয়ানমারকেই দিতে হবে।

লেখকঃ কবি ও শিক্ষক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত