প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ঘূর্ণিঝড় বুলবুল : তিন লাখ হেক্টরের ফসল ও ১০৭ কোটি টাকার মাছের ক্ষতি

নিউজ ডেস্ক : প্রস্তুতি চলছিল আমন ধান কাটার। ফলন ভালো হওয়ায় কৃষকের মুখেও ফুটেছিল হাসি। অপেক্ষা ছিল কেবল গোলায় তোলার, কিন্তু দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম জনপদে কৃষকের সেই হাসি উবে গেছে। উপকূলজুড়ে ফসলি জমিতে এখন ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র। পানিতে শুয়ে পড়েছে পাকা ধানের গোছা। অনেক এলাকায় ধানের জমির ওপর থইথই পানি। ভেসে গেছে ঘের, দীঘি ও পুকুরের মাছ। ক্ষতি হয়েছে গবাদি পশু-পাখিরও।

বুলবুলের আঘাতে গতকাল সোমবার পর্যন্ত ১৫ জেলায় প্রায় তিন লাখ হেক্টর জমির ফসলের ক্ষতি হওয়ার তথ্য মিলেছে। সরকারিভাবে প্রাথমিক পর্যায়ে এমন তথ্য দেওয়া হলেও ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়তে পারে। প্রাপ্ত তথ্য মতে, ঘূর্ণিঝড়ে আমনসহ মোট ৯টি ফসলের ক্ষতি হয়েছে।

কৃষি তথ্য সার্ভিসের পরিচালক ড. নুরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত পুরো ক্ষতির তথ্য আমাদের কাছে পৌঁছেনি। তাত্ক্ষণিকভাবে টেলিফোনে যতটুকু তথ্য পাওয়া গেছে সে অনুসারে আজ (সোমবার) দুপুর পর্যন্ত মোট দুই লাখ ৮৯ হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর বড় অংশই আমন। এ ছাড়া শীতকালীন সবজি, আলু, খেসারি কলাই, পানের রবজ, পেঁপে ও কলারও ক্ষতি হয়েছে।’

প্রাথমিকভাবে মত্স্য খাতে প্রায় ১০৭ কোটি টাকা ক্ষতির তথ্য জানানো হয়েছে মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে। এর মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত পুকুর, দীঘি, ঘের ও খামারের সংখ্যা ১৪ হাজার ৮৫৮টি। প্রায় তিন হাজার ২৩৮ টন মাছ ভেসে গেছে। মত্স্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কাজী শামস আফরোজ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের আঘাতে ক্ষতির হিসাব চলছে। প্রাথমিক কিছু তথ্য আমরা পেয়েছি।’

প্রাণিসম্পদের মধ্যে গতকাল বিকেল পর্যন্ত প্রাথমিক তথ্যে দুই হাজার ৮০৬টি মুরগি, ১৩টি গরু, ৫৮টি ছাগল, ১১টি ভেড়া, ২০১টি হাঁস, একটি মহিষ মারা যাওয়াসহ খাবার ও অন্যান্য ক্ষতি মিলিয়ে প্রায় ৫৮ লাখ টাকার একটি হিসাব দিয়েছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর।

গতকাল পর্যন্ত জেলাভিত্তিক ক্ষতির হিসাব চূড়ান্ত করা যায়নি। বাগেরহাটের বিভিন্ন এলাকায় ৩৫ হাজার ৫২৯ হেক্টর জমির আমন ধানসহ বিভিন্ন ফসলের ক্ষতি হয়েছে। মত্স্য ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তিন হাজার ৫২৯ টি।

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার সিনিয়র মত্স্য কর্মকর্তা ফারুক হোসাইন সাগর জানান, উপজেলায় ১৭ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে ১৬ হাজার ৩২৮টি মত্স্য ঘেরের মধ্যে তিন হাজার ২৬৫টি প্লাবিত হয়েছে। এতে সাড়ে ছয় কোটি টাকার মাছ ভেসে গেছে।

খুলনায় এক হাজার ৭২০ হেক্টর জমির আমন ফসলের পাশাপাশি ১৬০ হেক্টর জমির সবজি নষ্ট হয়েছে। কয়রায় তিন হাজার ২৪০টি মত্স্য ঘের তলিয়ে যাওয়ায় প্রায় ৪৪ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

পিরোজপুর কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, ঝড়ে মঠবাড়িয়া উপজেলায় পাঁচ সহস্রাধিক কৃষক ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে আমন ধান সাত হাজার হেক্টর, পান ৩০ হেক্টর, সরিষা দুই হেক্টর, ফল ও শাকসবজিসহ ২০০ হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে সর্বমোট ৫০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। তবে কৃষকদের তথ্য অনুযায়ী, ক্ষতির পরিমাণ এর দ্বিগুণেরও বেশি।

উপজেলার মত্স্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ভারি বর্ষণ ও জোয়ারের তোড়ে উপজেলার ১৫০টি ঘের তলিয়ে ৩৫ লাখ টাকার মাছ ভেসে গেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। মঠবাড়িয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবুল হোসেন মিয়া জানান, ১২টি ইউনিয়নে ১৬ হাজার ৮১০ হেক্টর জমিতে আমন চাষ হয়, এর ২০ শতাংশের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

ঝালকাঠিতে টানা বৃষ্টি এবং সুগন্ধা ও বিষখালী নদীর পানি স্বাভাবিকের চেয়ে চার-পাঁচ ফুট বেড়ে তলিয়ে গেছে ৬১৫টি মাছের ঘের ও পুকুর। এ ছাড়া ৪১ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমির উঠতি আমন, পাঁচ হাজার ২২০ হেক্টরের অন্যান্য ফসল, এক হাজার ৪৫০ হেক্টরের শাকসবজি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

যশোরের কেশবপুর উপজেলা কৃষি অফিস থেকে প্রাথমিকভাবে শীতকালীন ফসলের ৮৪ লাখ টাকার ক্ষতি দেখালেও ধানের ক্ষতি নিরূপণ করা হয়নি। তবে দুই হাজার ৮০ হেক্টর জমির রোপা আমন ধান আক্রান্ত হয়েছে বলে কৃষি অফিস সূত্র জানিয়েছে।

কলাপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আ. মান্নান জানান, ঝড়ের তাণ্ডবে পাঁচ হাজার ১৭৩ হেক্টর জমির ধান এবং ১৫৬ হেক্টর জমির শাকসবজি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া পটুয়াখালীর রাঙাবালীতে প্রায় সাত হাজার ৮০০ হেক্টর জমির ফসলের ক্ষতি হয়েছে। গোপালগঞ্জে ৯ হাজার হেক্টরের উঠতি আমন ধান, ৬৭৭ হেক্টর জমির শাকসবজি ও ৪১ হেক্টর জমির পেঁপে ও কালাবাগান নষ্ট হয়েছে।

মাদারীপুরের শিবচরে আমন ধানের পাশাপাশি পেঁয়াজ-রসুন, কলা ও সবজি মিলিয়ে সাড়ে ছয় শ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতির শিকার হয়েছে। তবে এটা প্রাথমিক হিসাব। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা বলছেন, ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ দেড় হাজার হেক্টরের বেশি হতে পারে।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা অনুপম রায় বলেন, ‘ক্ষতির পরিমাণ যাতে কম হয় সে জন্য জমিতে জমে থাকা পানি দ্রুত নিষ্কাশনে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে আমরা মোট ক্ষতির পরিমাণ জানতে মাঠ পর্যায়ে কাজ করছি।’

সূত্র: কালেরকন্ঠ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত