প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মেজর গণির অবদান আজকের বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বললেন নুরুদ্দীন খান

আসিফ কাজল : বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাবেক সেনা প্রধান মোহাম্মদ নুরুদ্দীন খান বলেছেন, মেজর আবদুল গণি না হলে ভাষা আন্দোলন হতো না। মেজর গণি না থাকলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না। মেজর গণির অবদানের কারণেই আজকের বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। অথচ জাতি হিসেবে আমরা তাকে প্রাপ্য সম্মান দিতে পারিনি।

শনিবার দুপুরে মহাখালীর রাওয়া হেলমেট হলে ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রতিষ্ঠাতা মেজর আবদুল গণির ৬৩তম মৃত্যু দিবসে আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। অবসরপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনী কল্যাণ সংঘ (রাওয়া) ও মেজর গণি পরিষদের যৌথ উদ্যোগে আলোচনা সভার সভাপতিত্ব করেন মেজর খন্দকার নুরুল আফসার (অব.)।

 

সাবেক সেনা প্রধান আতিকুর রহমান মেজর আবদুল গণিকে স্মরণ করে বলেন, শুধুমাত্র ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রতিষ্ঠাতা নন, তিনি বাংলাদেশ সেনা বাহিনীর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। ওই সময় সেনাবাহিনীর প্রতি ভীতি ছিলো তৎকালীন যুবসমাজের। পরিবারও চাইতেন না তার সন্তান সেনাবাহিনীতে যোগদান করুক। সেই ভীতি ভেঙে ছিলেন মেজর আবদুল গণি। ৬৩ বছর পর হলে তাকে প্রাপ্য সম্মান জানানো শুরু হয়েছে।

স্মরণ সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন রাওয়া সাধারণ সম্পাদক লে. কর্নেল মো. সামসুল ইসলাম। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কর্নেল মোহাম্মদ আব্দুল হক। এছাড়া, মেজর গণি পরিষদ মহাসচিব মো. আনোয়ারুল ইসলাম ভূঁইয়া।

আলোচনা সভায় মেজর জেনারেল এ এল এম ফজলুর রহমান (অব.) বীরপ্রতিক বলেন, এই বেঙ্গল রেজিমেন্ট ছিলো বলেই আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। এই রেজিমেন্ট ছিলো বলেই মুক্তিযোদ্ধাদেরকে ট্রেনিং দেওয়া সম্ভব হয়েছে। এই ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট থাকার জন্যই মুক্তিযোদ্ধের ৯ জন কমান্ডার ও সাব কমান্ডার করা সম্ভব হয়েছিলো। এই রেজিমেন্ট না থাকলে আমরা হইতো ট্রেনিং করতে ভারতে যেতাম। আমাদের ভারতীয় সেনা বাহিনী ট্রেনিং দিতো। হইতো ভারতীয় সেনা বাহিনীর হাতেই পাকিস্থান সেনাবাহিনী আত্নসমর্পণ করতো। তার অবদানের কথা মাথায় রেখে বাংলাদেশ সেবাবাহিনীকে মেজর গণির স্মরণে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

মেজর আবদুল গণির ভাগ্নে ও সাংবাদিক শওকত মাহমুদ তার বক্তব্যে রাওয়া ক্লাব যে স্বীকৃতি দিয়েছে তার জন্য তিনি কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি বলেন, পূর্ব পাকিস্তান মিলিটারিতে তিনিই প্রথম বাঙালী সেনা কর্মকর্তারা বাংলা ভাষায় কথা বলার দাবি জানিয়েছিলেন। ভাষা আন্দোলনের সূচনাকারী মেজর গণি। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, অথচ দেশের প্রতি তার এ আত্নত্যাগ প্রাচার হয় না। সভায় মেজর গণি পরিষদের পক্ষে থেকে সরকারের কাছে এই বাঙ্গালী ইতিহাসের এই কৃতি সন্তানের অবদান সরকারি ও রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠা করার দাবি জানানো হয়।

অনুষ্ঠানে মেজর গণি পরিষদ সরকার ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি জানিয়ে ১২ দফা দাবি পেশ করেন। উল্লেখযোগ্য দাবিগুলো হলো- রাষ্ট্রীয়ভাবে ও সরকারিভাবে তার জন্ম ও মৃত্যু দিবস পালন, জাতীয় বীরের মর্যাদা প্রদান, জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ড তার নামে নামকরণ, স্কুল কলেজের পাঠ্যপুস্তকে তার জীবনী প্রকাশ, কুমিল্লা ময়নামতি সেনানিবাস তার নামে নামকরণ।

মেজর আবদুল গণি ১৯১৫ সালের ১ ডিসেম্বর কুমিল্লা জেলার ব্রাহ্মণ পাড়া থানার নাগাইশ গ্রামে সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। যুবসমাজকে নৈতিক অবক্ষয় থেকে রক্ষা করার জন্য ১৯৩৩ সালে তার নেতৃত্বে সবুজ কোর্তা সমিতি গঠন করেন। লেখাপড়া শেষে কোলকাতা ফায়ারব্রিগেড কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৪০ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বৃটিশ ভারতীয় সেনা বাহিনীতে যোগ দেন।
বার্মা সম্মুখ যুদ্ধে তিনি বীরত্বের সঙ্গে নেতৃত্ব দেন তিনি। যুদ্ধ শেষে দেশ বিভাগের পর বাঙালী যোদ্ধাদের নিয়ে দুটি মুসলিম ইউনিট গঠন করেন। তার অধিনায়কত্বে এ রেজিমেন্ট ১৯৪৭ সালে সেপ্টেম্বরে ঢাকার কুর্মিটোলায় কার্যক্রম শুরু হয়। তার অদম্য চেষ্টায় ১৯৪৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সরকারিভাবে ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৫৪ সালে চাকুরী থেকে অবসর নেন।

এরপর থেকেই শুরু হয় তার রাজনৈতিক জীবন। প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য বুড়িচং ব্রাহ্মণপাড়া থেকে নির্বাচিত হন। তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান ক্যাডেট কলেজ, আর্মি স্টাফ কলেজ, সামরিক একাডেমী, চন্দ্রঘোনা পেপার মিল প্রতিষ্ঠা করা হয়।
১৯৫৭ সালের নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে জার্মানির বন শহরে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিনিধি হিসেব আন্তর্জাতিক সামরিক বাহিনীর প্রাক্তন সদস্যদের সংগঠন (‘ওয়াল্ড ভেটার্যা ন’) যোগ দেন। নভেম্বর মাসের ১১ তারিখ আকস্মিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন।

মেজর আবদুল গণির প্রতিষ্ঠিত ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করে স্বাধীনতা অর্জন করেন। পৃথিবীর মানচিত্রে সার্বভৌম দেশ হিসেবে নতুন ভূখণ্ডের সৃষ্টি হয় বাংলাদেশ। দেশের জন্য গৌরবোজ্জ্বল ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের জন্য মেজর এম এ গণিকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ১৯৮১ সালে মরণোত্তর স্বাধীনতা পদক প্রদান করেন।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন সাবেক মেজর জেনারেল কাজী মোহাম্মদ শহীদ্দুল্লাহ, মেজর জেনারেল ইমামুজ্জামান, বীর বিক্রম, মেজর জেনারেল জামিল ডি আহসান, ব্রিগেডিয়ার জেনালের শাহেদুল আনাম খান, মেজর জেনারেল সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহীম প্রমুখ।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত