প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বাবরি মসজিদ : ১৩৪ বছরের আইনি লড়াই এক নজরে দেখে নিন

মহসীন কবির : মহাকাব্যে বর্ণিত রামজন্মভূমিতে বাবরি মসজিদ তৈরি হওয়ার পর প্রায় সাড়ে তিনশ বছর টানাপড়েন তেমন ছিল না। মুঘল আমল শেষে ভারতে ব্রিটিশ রাজ প্রতিষ্ঠা পেতেই আইনি লড়াই শুরু হয়। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ভারতের প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ এ বছরের ১৬ অক্টোবর শুনানিতে বললেন, অনেক হয়েছে, আর নয়, আজই শেষ করতে হবে অযোধ্যা মামলার শুনানি।

২৭ বছর আগে ধ্বংস হয়েছিল অযোধ্যার বাবরি মসজিদ। তবে বাবরি মসজিদ নিয়ে বিতর্ক, গন্ডগোল যাই বলা হোক না কেন সবই কিন্তু নব্বইয়ের দশকে শুরু হয়নি। বিবাদের সূত্রপাত আরও আগে। সিপাহী বিদ্রোহের চারবছর আগে বাবরি মসজিদ নিয়ে প্রথম বিবাদের কথা উল্লেখিত রয়েছে ইতিহাসের পাতায়। হিসাবমতো অযোধ্যা বিতর্ক ৫০০ বছরের পুরনো। বিতর্কিত ভূখণ্ডের দখল নিয়ে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের আইনি বিবাদ ১৩৪ বছর ধরে চলে।

১৫২৮ সাল : অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ নির্মাণ করান মুঘল সম্রাট বাবরের সেনাপতি মির বাকি। তিনিই সম্রাট বাবরের নামে ‘বাবরি মসজিদ’ এর নামকরণ করেন। এর দুই বছর আগে ভারতে মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছেন জহিরুদ্দিন মুহাম্মদ বাবর।

১৮৮৫ সাল : ভারতে ব্রিটিশ রাজত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। ফৈজাবাদের জেলা আদালতের দ্বারস্থ হয়ে বাবরি মসজিদের বিতর্কিত কাঠামোর বাইরে সামিয়ানা তৈরি করে রামলালার মূর্তি স্থাপনের অবেদন জানান মহন্ত রঘুবীর দাস। আবেদন খারিজ করে দেয় ব্রিটিশ আদালত।

১৯৪৯ সাল : বছর দেড়েক আগে ভারত স্বাধীন হয়েছে। ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ, শীতের রাত। বিতর্কিত কাঠামাের মূল গম্বুজের নীচে রামলালার মূর্তি স্থাপিত হলো। মন্দিরপন্থীরা দাবি করলেন, রামলালা প্রকট হয়েছেন।

১৯৫০ সালা : গোপাল সিমলা এবং মহন্ত রামচন্দ্র দাস ফৈজাবাদ আদালতে আলাদা আলাদা মামলা করে বিতর্কিত স্থানে রামলালার পূজার অনুমতি চাইলেন।
১৮৫৩ সাল : সিপাই বিদ্রোহের চার বছর আগে প্রথম ধর্মীয় বিবাদের সূত্রপাত হয় এই মসজিদকে কেন্দ্র করে।
১৯৫৯ সাল : বিতর্কিত জমির মালিকানা দাবি করে মামলা করে নির্মোহী আখড়া।

১৯৮১ সাল : ভারতের উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পদে তখন বিশ্বনাথপ্রতাপ সিংহ। বিতর্কিত জমির মালিকানা দাবি করে আদালতের দ্বারস্থ হয় উত্তরপ্রদেশ সেন্ট্রাল সুন্নি ওয়াকফ্ বোর্ড।

১৮৮৫ সাল : বিতর্কিত স্থানে মন্দির নির্মাণের দাবি জানিয়ে ফৈজাবাদ জেলা আদালতে প্রথম মামলা দায়ের করেন মোহন্ত রঘুবর দাস।

১৯৪৯ : ভারতের স্বাধীনতার ২ বছর পর স্থাপত্যের ভিতরে রামের মূর্তি উদ্ধার হয়। মুসলিমরা অভিযোগ তোলে, স্থাপত্যের ভিতরে হিন্দুরা মূর্তি রেখে এসেছে। গোটা ঘটনায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পÐিত জওহরলাল নেহেরু অত্যন্ত দুঃখপ্রকাশ করেন। গোটা বিষয় নিয়ে দুই সম্প্রদায়ই আইনি মামলার পথে যায়। স্থাপত্যটিকে বিতর্কিত তকমা দিয়ে চিরতরের জন্য বন্ধ করে দেয় কেন্দ্রীয় সরকার।

১৯৮৪ সাল : বাবরির ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় সংযোজিত হয়। জাতীয় কংগ্রেসের পর এক নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান হয়। ভারতীয় জনতা পার্টি। তার সঙ্গে গোটা দেশে মাথাচাড়া দেয় হিন্দুত্ববাদ। ভগবান রামের জন্মভূমিকে অশুভ শক্তি থেকে ‘মুক্ত’ করার ডাক দিয়ে হিন্দুত্ববাদী সংগঠন বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নেতৃত্বে গঠিত হয় রাম মন্দির কমিটি। তার পুরোধা করা হয় বিজেপিনেতা লালকৃষ্ণ আডবানীকে।

১ ফেব্রæয়ারি ১৯৮৬ : বিতর্কিত কাঠামোর দরজা হিন্দুদের উপাসনার জন্য খুলে দিতে বলে ফৈজাবাদের আদালত।
১৪ আগস্ট ১৯৮৯ : বিতর্কিত জমিতে স্থিতাবস্থা বহাল রাখার নির্দেশ দেয় ইলাহাবাদ হাইকোর্ট।

৬ ডিসেম্বর ১৯৯২ : উগ্র হিন্দুদের হামলায় ধূলিসাৎ হয়ে যায় বাবরি মসজিদ। দাঙ্গায় প্রায় ৯০০ জন নিহত ও প্রায় ৯,০০০ কোটি ভারতীয় রুপির (৩৬০ কোটি মার্কিন ডলার) সম্পদ বিনষ্ট হয়।
৩ এপ্রিল ১৯৯৩ : সংসদে আইন পাস করিয়ে বাবরি মসজিদের বিতর্কিত জমির দখল নেয় কেন্দ্রীয় সরকার।

২৪ অক্টোবর ১৯৯৪ : ঐতিহাসিক ইসমাইল ফারুকি মামলায় ভারতের সর্বোচ্চ আদালত জানায়, কোনো এক মসজিদকে ইসলামের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে ধরা হবে না।
১৯৯৮ সালে : কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসে বিজেপির জোট সরকার। প্রধানমন্ত্রী হন অটল বিহারী বাজপেয়ী। চার বছর পর বাজপেয়ী নিজের অফিসে একটি অযোধ্যা সেল গঠন করেন।

২০০৩ সাল: আগস্ট মাসে এএসআই রিপোর্টে জানায়, মসজিদের নিচে রাম মন্দির থাকার অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছে। এই রিপোর্টকে চ্যালেঞ্জ করে মুসলিম ল’ বোর্ড।
৩০ সেপ্টেম্বর ২০১০ : বাবরি মসজিদ মামলার রায় দিল ইলাহাবাদ হাইকোর্ট। তিন বিচারকের বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের উপর দাড়িয়েছে জানাল, বিতর্কিত জমি তিন ভাগে ভাগ করে দেওয়া হচ্ছে। সুন্নি ওয়াকফ্ বোর্ড, নির্মোহী আখড়া এবং রামলালা বিরাজমানের মধ্যে।
৯ মে ২০১১ : ইলাহাবাদ হাইকোর্টের রায়ে স্থগিতাদেশ দেয় সুপ্রিম কোর্ট।

২১ মার্চ ২০১৭ : ভারতের প্রধান বিচারপতি জে এস খেহর বলেন, আদালতের বাইরেই মীমাংসা করে নেওয়া হোক বাবরি মসজিদ বিতর্কের।
৭ আগস্ট ২০১৭ : বাবরি মসজিদ মামলার শুনানির জন্য তিন বিচারপতির বেঞ্চ গঠন করে সুপ্রিম কোর্ট।
২০ নভেম্বর, ২০১৭ : উত্তরপ্রদেশ শিয়া সেন্ট্রাল ওয়াক্ফ বোর্ড জানায়, সেখানে মন্দির বানালে আপত্তি নেই। পরিবর্তে লখনৌতে মসজিদ বানিয়ে দেওয়া হোক।

৫ ডিসেম্বর ২০১৭ : প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্র, বিচারপতি অশােক ভুষণ এক বিচারপতি এস আবদুল নাজিরের বেঞ্চে আবার নতুন করে শুরু বাবরি মসজিদ মামলার শুনানি।
২৯ অক্টোবর ২০১৮ : নতুন প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈয়ের নেতৃত্বে আবার নতুন করে তিন বিচরপতির বেঞ্চ গঠন হয়।

৮ জানুয়ারি ২০১৯ : প্রধান বিচারপি রঞ্জন গগৈয়ের নেতৃত্বে এবার তৈরি হয় পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ। কারো সরে দাড়ানো, কারো অসুস্থতার কারণে সেই বেঞ্চে পরে কিছু পরিবর্তনও হয়।
৮ মার্চ ২০১৯ : বিচারপতি এফএম কলিফুল্লা, আধ্যাত্মিক গুরু শ্রী শ্রী রবিশঙ্কর এবং আইনজীবী শ্রীরাম পঞ্চুকে নিয়ে মধ্যস্থতা প্যানেল তৈরি করে দেয় সুপ্রিম কোর্ট।

২ আগস্ট ২০১৯ : মধ্যস্থতার চেষ্টা ব্যর্থ। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি জানান, ৬ আগস্ট থেকে রােজ শুনানি হবে অযোধ্যা মামলার।
১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯ : মধ্যস্থতা কমিটিকে আবার আলােচনা শুরু করতে বলে সুপ্রিম কোর্ট। এ মাসের মধ্যে আলােচনা শেষ করার সময় বেঁধে দেওয়া হয়।

১৬ অক্টোবর ২০১৯ : প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ বলেন, অনেক হয়েছে, আজই শেষ করতে হবে অযোধ্যা মামলার শুনানি।

৯ নভেম্বর ২০১৯ : ভারতের অযোধ্যার বিতর্কিত জমিতে রামমন্দির হবে, বিকল্প জায়গায় নির্মিত হবে মসজিদ। এজন্য সুন্নি ওয়াকফ বোর্ডকে অযোধ্যার মধ্যেই বিকল্প ৫ একর জমি দিতে হবে। অযোধ্যায় ২.৭৭ একর জমি রামলালার। দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে ভারতের সুপ্রীম কোর্ট এ রায় ঘোষণা করেন। এর মধ্যেই দিয়েই অবসান হয় বাবরি মসজিদ বিতর্ক।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত