প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অযোধ্যা মামলায় ভারতের সুপ্রিম কোর্টের রায়ে বিতর্কিত জমি পাবে হিন্দুরা, সেখানে রামমন্দির হবে, মসজিদ নির্মাণে বিকল্প জমি পাবে মুসলিমরা

রাশিদ রিয়াজ : অযোধ্যা মামলায় সর্বসম্মতিতে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ সদস্যের সাংবিধানিক বেঞ্চের রায়ে শর্তসাপেক্ষে বিতর্কিত জমি দেওয়া হয়েছে রাম জন্মভূমি ন্যাসকে। অযোধ্যাতেই ৫ একর বিকল্প জমি দেয়া হবে মুসলিম পক্ষ বা সুন্নি ওয়াকফ বোর্ডকে। শর্তসাপেক্ষে ২.৭৭ একর বিতর্কিত জমি পাবেন হিন্দুরা। সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, ওই জমি রামলালারই। একইসঙ্গে কেন্দ্রকে তিন মাসের মধ্যে ওই জমিতে মন্দির তৈরির জন্য ট্রাস্ট গঠনের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে আদালত। ট্রাস্টের নজরদারিতেই তৈরি হবে রামমন্দির। ট্রাস্টে রাখতে হবে নিমোর্হী আখড়ার প্রতিনিধিদের।
টাইমস অব ইন্ডিয়া/দি হিন্দু/হিন্দুস্তান টাইমইস/এনডিটিভি/আনন্দবাজার

এই মামলায় বিতর্কিত জমির দখল নিয়ে সুন্নি ওয়াকফ বোর্ডের পক্ষে রায় দিয়ে শিয়া বোর্ডের দাবি খারিজ করে দেয় ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। একই সঙ্গে নির্মোহী আখড়ার ‘সেবায়েত’ হওয়ার দাবি খারিজ করে দেয় আদালত। আর্কেলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার রিপোর্টে সিলমোহর দিয়ে রায়ে ভারতের প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ সাফ বলেন, ‘ফাঁকা জমিতে বাবরি মসজিদ তৈরি হয়নি। এর আগে সেখানে অমুসলিম সৌধের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। তবে সেই কাঠামো ভাঙা হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত নয়।’ বেশ খানিকক্ষণ ধরে চলা রায় দানে শীর্ষ আদালত সাফ জানায়, ১৯৪৯ সালে মূল গম্বুজের নিচে রামের মূর্তি স্থাপন করা মসজিদের অবমাননার শামিল। ফলে ১২ বছর পর দায়ের করা হলেও সুন্নি পক্ষের মামলা বিচার্য। ভারতের প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ রায় দিলেও তিনি ছাড়াও বেঞ্চে ছিলেন বিচারপতি এসএ বোবদে, ডিওয়াই চন্দ্রচূড়, অশোক ভূষণ এবং এস আবদুল নাজির।

রায়ের শুরুতে প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ জানান, কারও বিশ্বাস যেন অন্যের অধিকার না হরণ করে। ভারতের সংবিধান সব ধর্মকে সমান অধিকার দিয়েছে। বিচারপতিরা রায়ে জানিয়েছেন, মন্দির ভেঙে মসজিদ তৈরি করা হয়েছে এমন কোনও প্রমাণ না পাওয়া গেলেও ফাঁকা জমিতে বাবরি মসজিদ তৈরি হয়নি। এর নীচে পুরনো অনেক বড় কোনও নির্মাণ বা কাঠামো রয়েছে। তবে সেখানে কোনও মন্দির ভাঙা হয়েছিল কিনা তা নিশ্চিত নয়। খননকার্যের রিপোর্টে যে তথ্য উঠে এসেছে তাতে বলা হয়েছে ওই ধ্বংস হওয়া কাঠামো কোনও ইসলামি স্থাপত্য নয়।

৫ বিচারপতির বেঞ্চের এ রায়ে বলা হয় বাবরি মসজিদে প্রার্থনা করতেন মুসলিমরা। সেই অধিকার কেড়ে নিতে পারি না। জমির মালিকানা প্রমাণ করতে পারেননি মুসলিমরা। বিশ্বাসের উপর নির্ভর করে না আইন। ওই জায়গায় জন্মেছিলেন রাম,এটা হিন্দুদের বিশ্বাস। বিভিন্ন বইয়ে তার উল্লেখ আছে। সেই বিশ্বাসও এভাবে মেনে নেওয়া যায় না। তবে সেই দাবির বিরোধিতাও কেউ করেনি।

ভারতের প্রধানবিচারপতি রঞ্জন গগৈ আরো জানান, বাবরি মসজিদের জমি তিন ভাগে ভাগ করে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এলাহাবাদ হাইকোর্ট। ব্রিটিশরা আসার আগেও অযোধ্যার বিতর্কিত জমিতে যে হিন্দুরা পুজো করত, তার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। একই সঙ্গে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার রিপোর্টে মান্যতা দিয়েছে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। নির্মোহী আখড়ার দাবি খারিজ করে সুপ্রিম কোর্ট আরো বলেছে খনন কাজের প্রমাণ অস্বীকার করা যায় না। প্রধানবিচারপতি রঞ্জন গগৈ বলেন, কারো বিশ্বাস যেন অন্যের অধিকার হরণ না করে।

শুক্রবার থেকেই অযোধ্যা-ফৈজাবাদ থেকে শুরু করে সারা ভারতে ব্যাপক সতর্কতা ও নিরাপত্তাম্লূক ব্যবস্থা নেয় প্রশাসন। শুক্রবার রাতে বেশ কয়েকটি টুইট করে শান্তি রক্ষার আহ্বান জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি লিখেন, ‘অযোধ্যা মামলায় সুপ্রিম কোর্ট যে রায় দেবে তার সঙ্গে জয়-পরাজয়ের কোনও যোগ নেই। ভারতের শান্তি, একতা ও সম্প্রীতিকে শক্তিশালী করাই দেশবাসীর একমাত্র কর্তব্য।’ রায় ঘোষণার আগে প্রধান বিচারপতি গগৈর নিরাপত্তা বাড়িয়ে জেড প্লাস ক্যাটাগরি করে দেয়া হয়। সার্বিক পরিস্থিতির উপর নজর রাখতে শুক্রবার রাতেই বিশেষ নিয়ন্ত্রণ কক্ষ কাজ শুরু করে। উত্তরপ্রদেশ-সহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে স্কুল-কলেজ বন্ধ রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গেও রাতে নবান্ন থেকে জেলাশাসকদের সতর্কতা রক্ষার বার্তা পাঠানো হয়। অযোধ্যার আশপাশে রাত থেকেই উত্তরপ্রদেশ পুলিশ বিশেষ ড্রোন ওড়ানো শুরু করে। সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট নিয়েও সবাইকে সতর্ক করে দেয়া হয়। ভারতের ৭৮টি বড় স্টেশনে বিশেষ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে রেল।

এছাড়া উত্তরপ্রদেশ পুলিশ, সেনা ও বিমান বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় রাখছে। ভারতের বিভিন্ন ধর্মীয় স্থানগুলিতেও নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। অযোধ্যায় ৬০ কোম্পানি পুলিশ ও আধাসেনা মোতায়েন করা হয়েছে। অর্থাৎ ১৫ হাজার পুলিশ, ৪ হাজার আধাসেনা। অ্যান্টি টেররিস্ট স্কোয়াড ও অ্যান্টি রায়ট পুলিশের টহলদারি অব্যাহত রয়েছে। নয়ডা-সহ উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন সংবেদনশীল এলাকায় চলে ফ্ল্যাগমার্চ। জম্মু-কাশ্মীরের সর্বত্র ১৪৪ ধারা কার্যকর করা হয়েছে। অযোধ্যা ও সন্নিহিত অঞ্চল ছাড়াও উত্তরপ্রদেশ জুড়ে ৪০টির মতো স্পর্শকাতর এলাকা চিহ্নিত করা হয়ে।

গত কয়েকদিনই ধরে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের রায় নিয়ে রাজনৈতিক দল, মামলার সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ আগাম প্রস্তুতি শুরু করে দেয়। শুক্রবার প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ উত্তরপ্রদেশের পুলিশ-প্রশাসনের কর্তাদের ডেকে বৈঠক করার পরেই রাজধানী নয়াদিল্লিতে গুঞ্জন শুরু হয়ে যায়, দু’এক দিনের মধ্যেই অযোধ্যা মামলার রায় ঘোষণা হতে পারে। এরপর শুক্রবার রাতে সুপ্রিম কোর্টের বিবৃতিতে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়। এর আগে চলে ২৬ বছর আইনি যুদ্ধ। শুধু সুপ্রিম কোর্টেই মামলা চলছে ৮ বছর ৫ মাস ১২৩ দিন। শেষ পর্যায়ে টানা ৪০ দিন ধরে শুনানি চলে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত