প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বিনোদনবঞ্চিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কথা

 

মো. মিনহাজ উদ্দীন : রোহিঙ্গা সংকট বর্তমান বিশে^র সবচেয়ে জটিল মানবিক সংকট- এ বিষয়ে কারও কোনো সন্দেহ নেই। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে শুরু করে অন্যান্য সব বৈশি^ক বা আঞ্চলিক জোট একবাক্যে এই সমস্যাকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জন্য বিরাট নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করছে। এদিকে গত দুই বছরে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কোন অগ্রগতি না হওয়ায় বাংলাদেশিদের মধ্যে বাড়ছে ক্ষোভ ও হাতাশা। কিছু কিছু ইস্যুতে স্থানীয় জনগণের মধ্যে তৈরি হয়েছে চাপা অসন্তোষ। এমনই বাস্তবতায় সুযোগ হয়েছিলো বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা বিশেষ করে বিনোদন সম্পর্কে বিস্তারিত জানার। অক্টোবরের শেষ ভাগে দুই দিন কুতুপালং ও বালুখালি ক্যাম্পের বিভিন্ন ইউনিট ঘুরে দেখার সুযোগ হয়েছিলো লেখকের।

প্রথমেই সুযোগ হয় উখিয়ার বালুখালি ক্যাম্পের একটি মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ঘুরে দেখার। মার্সি মালয়েশিয়া নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় এই কেন্দ্রটি পরিচালনা করছে বাংলাদেশের একটি উন্নয়ন সংস্থা। সেবা কেন্দ্রটির পাশেই শিশুদের খেলার জায়গা। সেখানে ২৭টি শিশু (৩-১৪ বছর) খেলছে। ক্যারাম, লুডুসহ ইত্যাদি। রেহনুমা নামের এক রোহিঙ্গা তরুণী তাদের দেখভাল করে। কেন্দ্রটির পরিচালক জানান, এই শিশু কেন্দ্রটি করা হয়েছিলো সহিংসতা দেখা শিশুদের মানসিক প্রশান্তির জন্য। শুরুতে শিশুরা আসতে চাইতো না। কিন্তু এখন অনেক শিশুই আসছে। ওরা এখানে কিছুটা হলেও স্বস্তি ও আনন্দ খুঁজে পচ্ছে। এরপর এক উন্নয়ন কর্মীর সহযোগিতায় বালুখালি ক্যাম্পটি কয়েক ঘন্টা ঘুরে দেখার সুযোগ হয়। কথা হয় কয়েক জন মাঝির সঙ্গে। বর্তমানে উখিয়া থেকে টেকনাফ পর্যন্ত ৩৪টি ক্যাম্প হয়েছে। এই ক্যাম্পগুলো আবার নানা ভাগে বিভক্ত। এই ভাগের সবচেয়ে ছোট অংশের মাতব্বর/প্রধান বা যোগাযোগ ব্যক্তি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মাঝি নামে পরিচিত। এই মাঝি একটি ক্যাম্প ইউনিটের মসজিদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পালন করে থাকেন। বালুখালিতে ১ নম্বর ব্লকের পান বাজার পশ্চিম পাড়া এলাকাতে কথা হয়েছিলো সেলিম নামে ৪২ বছর বয়সী একজন মাঝির সাথে। রোহিঙ্গাদের ভাষা বুঝতে পারেন এমন একজন উন্নয়নকর্মীর সহযোগিতায় সেলিমের কাছে জানতে চেয়েছিলাম তাদের বিনোদন মাধ্যম সম্পর্কে। তিনি জানান, তিনিসহ বেশির ভাগ তরুণ যুবক নিয়মিত মসজিদে যান। ধর্মচর্চা ও প্রশান্তির জন্য। সেখানে দলগতভাবে ধর্ম নিয়ে আলোচনা হয়।

আর কেউ কেউ ুেমাবাইল ফোন ব্যবহার করে গান শোনার জন্য। তবে এই সুযোগ খুবই সীমিত। কারণ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। তারা মোবাইল চার্জ করতে পারেন না। তাই ইলেকট্রনিক ডিভাইসে গান শোনা বা সিনেমা দেখার সুযোগ খুব কম। তবে কিছু উন্নয়ন সংস্থা মাঝে মাঝে সন্ধ্যা রাতে গানের আসরের আয়োজন করে। তবে তা নিয়মিত নয়। প্রশ্ন ছিলো ঘরের নারীরা কি করে? তাদের বিনোদন? উত্তরে জানালেন, তারা ঘরে কাজ করে। তাতেই তাদের আনন্দ! ক্যাম্পে রোহিঙ্গা নারীদের সঙ্গে কথা বলা খুবই কঠিন বিষয়। ধর্মীয়ভাবে তারা ভীষণ রক্ষণশীল। প্রাপ্তবয়স্ক প্রায় সব রোহিঙ্গা নারীই রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বোরখা পড়ে চলাফেরা করেন। তাদের আড্ডা দেওয়া, সমবেত হওয়া, একসাথে কোনো কিছু আনন্দের জন্য করার সুযোগ নেই বললেই চলে। তাদের বিনোদন শুধু সংসারের কাজ আর জৈবিক জীবন আচারে সীমাবদ্ধ। আশ্রিত রোহিঙ্গাদের মধ্যে সবচেয়ে বিপদে আছেন তরুণ-যুবারা। প্রকৃতপক্ষেই তাদের করারা কিছু নেই। আনুষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ নেই। খেলার কোনো জায়গা নেই।

নেই বিনোদনের কোনো মাধ্যম। রোহিঙ্গাদের জীবন ও বিনোদন নিয়ে কথা হয়েছিলো চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক খ. আলী আর রাজীর সঙ্গে। তিনি এ বিষয়ে একটি গবেষণায় যুক্ত আছেন। খ. আলী আর রাজী জানান ‘নারী আর কিশোর-কিশোরীদের ক্যাম্পে সারাদিন কিচ্ছু করার নাই। বসে থাকা আর আড্ডা দেওয়ার একঘেঁয়ে জীবন। খেলাধুলা, বিনোদন নেই। তাদের লেখাপড়ার কোনো সুযোগ নেই’। অনেক উন্নয়ন কর্মী বলছেন, বিনোদন বঞ্চিত এই জনগোষ্ঠী প্রাপ্ত বয়স্ক হলেই বিয়ের দিকে ঝোঁকে। যার ফলে রোহিঙ্গাদের মধ্যে সন্তান জন্ম দেওয়ার প্রবণতা অনেক বেশি। সেইভ দ্য চিলড্রেনেরা তথ্য অনুযায়ী, প্রতি দিন গড়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে জন্ম নেয় অন্তত ১৩০টি শিশু। যা বছর শেষে গড় হিসেবের সংখ্যা ৫০ হাজারের বেশি। এই সংকট মোকাবেলা তথা রোঙ্গিাদের বিনোদন ও বিকাশে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এছাড়া এই সংকট দিনে দিনে আরও জটিল হতে পারে। (শেষ)

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত