প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

প্রবাসী মৃত্যু বাড়ছে, ১০ বছরে এসেছে ৩০ হাজার মরদেহ

রাশিদ রিয়াজ : দুই বছর আগে সৌদি আরবে গৃহকর্মীর কাজ নিয়ে যায় খুলনার অবিরন বেগম। সম্প্রতি তার গৃহকর্তার বিরুদ্ধে তাকে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। অবিরনের পরিবারের পক্ষ থেকে যেমন অভিযোগ করা হয়েছে, তেমনি হত্যার কারণেও নির্যাতনের কথা উঠে এসেছে। তিন মাস নানা চেষ্টার পর অবশেষে গত ২৪ অক্টোবর ফেরত আনা গেছে অবিরনের মৃতদেহ।

এর একদিন পরই একই দেশ থেকে এসেছে আরেক গৃহকর্মী মানিকগঞ্জের মেয়ে নাজমা বেগমের মৃতদেহ। তার বড় বোন মাকসুদা সারাবাংলাকে জানিয়েছে, ক্লিনিকে কাজ দেওয়ার কথা বলে নাজমাকে গৃহকর্মীর ভিসায় দশ মাস আগে সৌদি আরবে পাঠায় স্থানীয় দালাল সিদ্দিক। সেখানে গৃহকর্তার অমানবিক নির্যাতনের কথা টেলিফোনে বার বার জানিয়েছিল সে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইমোতে পাঠিয়েছিল তার শরীরে আঘাতের চিহ্নের ছবি। নির্যাতনে গত ২ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবে তার মৃত্যু হয়। এর আগে ২৯ আগস্ট সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে সিলেটের আজাদ মিয়ার মৃতদেহ পৌঁছায় বাংলাদেশে। জুনে আসে ইতালি থেকে ইমরানের মরদেহ।

শুধু অবিরন, নাজমা, আজাদ এবং ইমরানই নন, প্রায় প্রতি মাসেই কোন না কোনো প্রবাসী শ্রমিকের স্বপ্ন এভাবে কফিনে মুড়ে ফিরছে নিজ দেশে। অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রবাসে গিয়ে শ্রমিকরা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাসের পাশাপাশি অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়। পাশাপাশি অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় মেটাতে অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হয় তাদের। এতে তারা প্রচণ্ড মানসিক চাপে থাকে। ফলে বেশিরভাগ প্রবাসীর মৃত্য হয় স্ট্রোকে, হৃদরোগ আর দুর্ঘটনায়।আর নারীদের বেশিরভাগেরই মৃত্যু হয় নির্যাতন অথবা আত্মহত্যায়।

হযরত শাহজালাল আন্তজার্তিক বিমানবন্দরে থাকা প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের হিসাবে গেল দশ বছরে (২০০৯ থেকে ২০১৯) ২৯ হাজার ৩৩৮ জন প্রবাসী শ্রমিকের মৃতদেহ দেশে ফিরেছে। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, গত দশ বছরে সবচেয়ে বেশি মরদেহ এসেছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, জর্ডান, কাতার ও লেবাননে বেশিরভাগ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। তবে এর মধ্যে সবচেয়ে সৌদি আরবে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। গেল বছর হাজারেরও বেশি শ্রমিক দেশটিতে নানাভাবে মারা যায়। এছাড়া মালয়েশিয়া থেকেও আসছে শ্রমিকদের মৃতদেহ।দিন দিন এই মৃত্যুর মিছিল বেড়েই চলেছে। সুখের আশায় প্রবাসে গিয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন নারী কর্মীরা। সরকারি কিংবা বেসরকারি সংস্থা যারা দীর্ঘদিন ধরে অভিবাসন নিয়ে কাজ করছে, তাদের কাছেও নেই মৃত্যুর কারণ নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো গবেষণা।

এ প্রসঙ্গে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল হাসান সারাবাংলাকে বলেন, ‘গত ১৪ বছরে ৪০ হাজার প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকের মৃতদেহ দেশে ফিরেছে। এর মধ্যে ৬১ শতাংশ এসেছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। আর মধ্যপ্রাচ্যের ছয় দেশের মধ্যে শুধুমাত্র সৌদি আরব থেকে এসেছে ৩১ শতাংশ শ্রমিকের মৃতদেহ। দিন দিন কেন এই মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে তা নিয়ে কোনো ধরনের গবেষণা নেই সরকারি কিংবা বেসরকারি পর্যায়ে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের শ্রমিকদের বিদেশ পাঠানোর আগে কোনো সেখানকার পরিবেশ সম্পর্কের কোনো ধরনের ধারণা দেওয়া হয় না। যে কারণে তারা বিদেশ গিয়ে সেখানকার আবহাওয়া, খাবার ও পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারেন না। যদি আগে থেকে ধারণা দেওয়া হতো, তবে অন্তত ১০ শতাংশ মৃত্যু কমানো সম্ভব হতো’।

আরেক অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, ‘সহায় সম্বল শেষ করে বিদেশে পাড়ি জমানো এসব শ্রমিক অভিবাসন ব্যয় তুলতে গিয়ে অক্লান্ত পরিশ্রমের পথ বেছে নেয়। এমনকি তারা স্বচ্ছলভাবে বসবাসও করতে পারে না। ফলে সব সময় তারা মানসিক চাপে থাকে। এতে তারা অসুস্থ হয়ে পড়েন। এবং এক পর্যায়ে অনেকের জন্য মৃত্যুই হয় শেষ পরিণতি।’

অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের (ওকাপ) চেয়ারম্যান শাকিরুল ইসলাম বলেন, ‘বেশিরভাগ কর্মীই ঋণ করে বিদেশ যায়। যে বেতনের আশায় তারা বিদেশে পাড়ি জমায়, সেখানে গিয়ে প্রত্যাশা অনুযায়ী প্রাপ্তির মধ্যে বিস্তর ফাঁক থাকে। তখন আয় ও ব্যয়ের সমন্বয় ঘটাতে প্রচণ্ড মানসিক চাপ পড়ে। মৃত্যুর জন্য এটাও অনেকটা দায়ী। সেজন্য কর্মী পাঠানোর আগে তাদের ন্যায্য পাওনা বুঝিয়ে দিতে সরকারকে দেখভাল করা উচিত’।

যদিও দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা এই বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন ওয়েজ আর্নার্স বোর্ডের মহাপরিচালক গাজী মোহাম্মদ জুলহাস। তিনি বলেন, ‘শুধু মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে স্ট্রোক করেই যে শ্রমিকেরা মারা যাচ্ছে বিষয়টি তা নয়। দুর্ঘটনা, অসাবধানতাও এর জন্য দায়ী। তবে প্রবাসে শ্রমিক পাঠানোর আগে সে দেশের পরিবেশ সম্পর্কে অবহিত করেই পাঠানো হয়।’

তিনি জানান, প্রবাসে শ্রমিকদের কল্যাণে কাজ করে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের আওতায় থাকা ‘ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড’। এই বোর্ড প্রবাসীদের মৃতদেহ দেশে আনার ব্যবস্থা করে। আইন অনুযায়ী শ্রমিকের মৃতদেহ দেশে ফেরার পর দাফনের জন্য বিমান বন্দরে ৩৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়। এছাড়া পরবর্তী সময়ে নিহত প্রত্যেক শ্রমিকের পরিবারকে তিন লাখ টাকা করে দেওয়া হয়।

যাদের পরিশ্রমে প্রতিনিয়ত মজবুত হচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা; তাদের পেছনে রেখে কোনোভাবে উন্নয়ন সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, গেল কয়েক বছরে বাংলাদেশের জনশক্তি রফতানিতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে, যা এখনও কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। বন্ধ থাকা অনেক শ্রমবাজার নতুন করে চালু করা যায়নি। এদিকে বিশাল সংখ্যক শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনায় ভবিষ্যতে রেমিটেন্স বাড়ানো এবং শ্রমবাজারে বাংলাদেশের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই এখনই সমস্যার কারণ উদঘাটন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। সারাবাংলা থেকে নেয়া

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত