প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কলকাতাকে এখন আর মেধাচর্চার জায়গা বলা যায় না, বললেন অভিজিৎ

নিউজ ডেস্ক : কলকাতা একসময় প্রাণবন্ত মেধাচর্চার বড় জায়গা ছিল উল্লেখ করে নোবেলজয়ী বাঙালি অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, এখন আর তা বলা যাবে না। এছাড়া, বর্ণপ্রথার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘আজ অবধি পশ্চিমবঙ্গের যত জন মুখ্যমন্ত্রী, সবাই উচ্চবর্ণের। এই বৈচিত্র্য হীনতা সত্যিই চমকপ্রদ’।ভারতের পশ্চিমবঙ্গের পাঠকপ্রিয় পত্রিকা আনন্দবাজারে বুধবার প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব বলেন।দেশরূপান্তর

অভীক সরকারের নেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে অভিজিৎ কলকাতায় নিজের বেড়ে ওঠা, দিল্লিতে যাওয়া সহ পশ্চিমবঙ্গের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট নিয়ে কথা বলেন।

কলকাতার সঙ্গে সম্পর্কিত পাঁচজন ব্যক্তির নোবেল প্রাপ্তি নিয়ে এক প্রশ্নের জবাতে অভিজিৎ বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব না দেওয়ার কথা উল্লেখ করে বলেছেন, ইতিহাসের একটা পর্বে কলকাতা ছিল ইন্টেলেকচুয়াল চর্চার একটা কেন্দ্র। এ ধরনের যোগাযোগ খুঁজে বার করা সহজ। কিন্তু আমার মনে হয়, অমর্ত্য আর রবীন্দ্রনাথ কেন কলকাতার মানুষ, তার অন্তত একটা কারণ হলো, কতকগুলো ঐতিহাসিক ঘটনার যোগাযোগে কলকাতা এক সময় ভারতের বিদ্যাচর্চার একটা বড় জায়গা ছিল। আজ আর সেটা বলা যাবে না। কিন্তু এটা আপনি বলতেই পারেন যে, কলকাতার সঙ্গে ভারতের পাঁচজন নোবেলজয়ী মানুষের যোগ আছে। আমার বক্তব্য হলো, এর সঙ্গে বাঙালিয়ানার বিশেষ সম্পর্ক নেই। বরং এটাই আসলে বড় শহরের মাহাত্ম্য। সেখানে শ্রেষ্ঠ মেধার মানুষেরা আসেন এবং তারা পরস্পরের কাজে অনুপ্রাণিত হন ও অসামান্য সব কাজ করেন। তারা সবাই একে অন্যের চেয়ে আরও ভালো কাজ করতে চান এবং সেটাই হলো মহানগরের মহত্ত্বের চাবিকাঠি। এই কারণেই এক সময় সমস্ত শিল্পী প্যারিসে যেতে চাইতেন, সব লেখকের লক্ষ্য ছিল নিউ ইয়র্ক। ভালো লেখক হিসেবে স্বীকৃত হতে চাইলে আপনাকে নিউ ইয়র্কে যেতেই হবে, এটাই ছিল নিয়ম। একটা সময় অবধি কলকাতার এই ব্যাপারটা ছিল। আমি তার শেষের দিকটা দেখেছি আমার বাবার মধ্যে দিয়ে। তার ক্ষেত্রেও এই মহানাগরিক অনুপ্রেরণা কাজ করত। ঠিক যেমন অমর্ত্য সেনের ক্ষেত্রেও। সত্যিই সে এক প্রাণবন্ত মেধাচর্চার জায়গা ছিল বটে। এর পেছনে বাঙালির কোনও বিশেষত্ব আছে বলে আমি মনে করি না, এটা মহানগরের বিশেষত্ব।

দিল্লি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমার মনে হয় দিল্লির অবস্থা তুলনায় ভালো, তার একটা কারণ হলো, দিল্লিতে একটা উদ্যোগী শ্রেণি আছে। অনেককেই সেখানে চিনি, তারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে সফল— এখন ঘটনা হলো, সচরাচর তাদের একটা বেশ জোরদার পারিবারিক ভিত আছে, তারা কেউ দরিদ্র পরিবার থেকে আসেনি, এসেছে সচ্ছল মধ্যবিত্ত ঘর থেকে।

নিজের বেড়ে ওঠা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমার সৌভাগ্য হলো, যে বাড়িতে আমি মানুষ হয়েছিলাম সেখানে খুবই ভালো লেখাপড়ার পরিবেশ ছিল। আমার লেখাপড়ার ভিত সবল ছিল, অঙ্ক ভালো শিখেছিলাম। অনেকগুলো সুবিধে হাতে নিয়েই আমি শুরু করেছিলাম। দিল্লিতে আমার সুযোগ হলো, এক অর্থে, ভারতের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার।

কথা প্রসঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের বর্ণপ্রথা নিয়ে নোবেলজয়ী এই বাঙালি অর্থনীতিবিদ বলেন, কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ ছিল পুরোপুরি উচ্চবর্ণের মধ্যবিত্ত বাঙালির কলেজ, আর তার ফলে পরিবেশটা ভীষণই একমাত্রিক, কারণ পশ্চিমবঙ্গের উচ্চবর্ণগুলির ভিতরে বিশেষ কোনও বৈচিত্র্য নেই। তার অর্থ হলো, সমাজের বাকি অংশ এই পরিবেশ থেকে বাদ। নানা ক্ষেত্রেই এটা সত্যি। যদি কমিউনিস্ট পার্টির দিকে তাকান, এক হরেকৃষ্ণ কোঙারকে বাদ দিলে উচ্চবর্ণের বাইরে বড় নেতা খুঁজে পাবেন না।

তিনি বলেন, আজ অবধি পশ্চিমবঙ্গের যত জন মুখ্যমন্ত্রী, সবাই উচ্চবর্ণের। এই বৈচিত্র্য হীনতা সত্যিই চমকপ্রদ। কুড়ি বছর বয়েস পর্যন্ত কাস্ট সম্পর্কে ধারণা ছিল একেবারে শূন্য। কলকাতায় আমার কাস্ট নিয়ে সত্যিকারের কোনও অভিজ্ঞতাই ছিল না। আমার চার পাশের পরিচিত জগতে কাস্ট নিয়ে ভাবারই কোনও কারণ ছিল না। সেখানে সবাই কার্যত ছিল একই কাস্টের লোক। এবং সত্যি বলতে কি, সেই পরিবেশে, ধরা যাক প্রেসিডেন্সিতে যারা পড়ত তাদের মধ্যে কেউ যদি নিজের কাস্টের বাইরে বিয়ে করতে চাইত, সেটাও খুব বড় সমস্যা হতো না, সবাই তো উচ্চবর্ণের, আর উচ্চবর্ণের ভিতরে দুটো কাস্টের দূরত্ব এমন কিছু বিরাট ব্যাপার ছিল না, ব্রাহ্মণ-কায়স্থের বিয়ে তত দিনে মোটামুটি সহজে মেনে নেওয়া হচ্ছিল। এখনো কলকাতায় ছবিটা মোটামুটি একই।…

উল্লেখ্য, এ বছর অর্থনীতিতে অভিজিতের সঙ্গে যৌথভাবে নোবেল জিতেছেন আরও দুই অর্থনীতিবিদ, যার মধ্যে এস্থার ডুফো হচ্ছে অভিজিতের স্ত্রী এবং আরেকজন মার্কিন অর্থনীতিবিদ মাইকেল ক্রেমার।

অভিজিৎ ও এস্থার দুজনেই যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) গবেষক।

মা-বাবা দুজনেই অর্থনীতির স্বনামধন্য অধ্যাপক। তাঁদের ছেলেও অর্থনীতির শিক্ষক। বাবা-মার কর্মজীবন কেটেছে কলকাতাতেই। অভিজিতের জন্ম মুম্বাইয়ে ১৯৬১ সালে। এমআইটির শিক্ষকতার পাশাপাশি একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত অভিজিৎ।

মা নির্মলা ব্যানার্জি ও বাবা দীপক ব্যানার্জির সন্তান অভিজিৎ। তার মা নির্মলা কলকাতার সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোশ্যাল সায়েন্সেসের অর্থনীতির অধ্যাপক। বাবা দীপক ব্যানার্জি কলকাতার বিখ্যাত প্রেসিডেন্সি কলেজের অর্থনীতির অধ্যাপক ছিলেন।

অভিজিতের শৈশব-কৈশোর কেটেছে কলকাতাতেই। কলকাতার সাউথ পয়েন্ট স্কুলে লেখাপড়া করেছেন। পরে পড়েছেন প্রেসিডেন্সি কলেজে। দিল্লির জওহরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটিতেও কেটেছে শিক্ষাজীবনের একটি অংশ। এরপর ১৯৮৮ সালে তিনি হাভার্ড ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি করেছেন।

সর্বাধিক পঠিত