প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কেউ ধোয়া তুলসী পাতা নন, খোঁজখবর নিয়েই বিয়ে করতে হবে, জানালেন পাখি ভাই (ভিডিও)

টিভিএনএ রিপোর্ট : ঘটক পাখি ভাই। বাংলাদেশের প্রথম বাণিজ্যিক ঘটক। বাড়ি বরিশালে। শখের বসে ১৯৬৭ সাল থেকে শুরু করেন ঘটকালি। তবে অসুস্থতার জন্য খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলে চাকরি করতে অক্ষম হয়ে পড়ায় ১৯৭৩ সাল থেকে ঘটকালিকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন। দীর্ঘ এই ৪৫ বছর তার ঘটকালিতে বিয়ে হয়েছে সাড়ে ১৮ হাজার। বাবা-মার দেয়া নাম কাজী আশরাফ হোসেনকে এখন আর কেউ এই নামে চেনে না। দেশ বিদেশের বাঙালিদের কাছে তিনি পরিচিত হয়েছেন ঘটক পাখি ভাই নামেই। সম্প্রতি তার ব্যবসা, সংসারের সুখ-দুঃখ, ভালো পাত্রপাত্রী নির্বাচনের কৌশল এসব বিষয়ে কথা হয়। সেই পুরো সাক্ষাতকারটি তুলে ধরা হলো-

প্রশ্নঃ কিভাবে ঘটকালি শুরু করলেন, আর এটিকে কেন পেশা হিসেবে বেছে নিলেন?

পাখি ভাইঃ ১৯৬৭ সালের কথা। তখন খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলে চাকরি করতাম। বন্ধু বা পরিচিতজনরা অনেকেই তাদের মেয়েকে বিয়ে দেয়ার জন্য বলতেন। আর বিয়ে দেয়া অনেক পূণ্যের কাজ ভেবেই তা করতাম। তবে সেসময় পারিশ্রমিক পাবো এরকম কোনো চিন্তা ভাবনা ছিল না। বিয়ের কাজ করায় মানুষ অনেক ভালোসাবতো, উপহার দিত, ভালো খাবার খাওয়াতো। আর এসব কারণেই ঘটকালির প্রতি আমার একরকম মায়া বসে যায়। আমার নাম কাজী আশরাফ হোসেন। কিন্তু খুলনায় থাকতে আমি যখন পাত্রপাত্রীর খোঁজে নানা জায়গায় যেতাম, তখন কেউ একজন বলে ফেললেন ‘ওই পাখি ভাই’। আর অন্যরাও মনে করলেন যে আমার নাম বুঝি পাখি ভাই। আর সেই থেকেই এই নামে পরিচিত হতে থাকি। দেশ স্বাধীনের পর ৭৩ সালে আমার আলসার ধরা পড়ে। তখন মিলে কাজ করতে অক্ষম হয়ে পড়ি। আর আমি ভাবলাম যেহেতু ঘটকালির কাজটি পারি, তাই এটিকেই পেশা হিসেবে বেছে নিলাম।

প্রশ্নঃ দীর্ঘ ৪৫ বছরের এই পেশায় কতগুলো বিয়ে দিয়েছেন?

পাখি ভাইঃ এখন পর্যন্ত আমার মাধ্যমে বিয়ে হয়েছে সাড়ে ১৮ হাজারের বেশি। চলতি মাসেও কয়েকটি বিয়ে হবে। আর শীতকাল চলে আসছে তখন তো বিয়ের ধুম পড়ে যাবে।

প্রশ্নঃ তাহলে কী আপনার ব্যবসার মূল সিজন শীতকাল?

পাখি ভাইঃ হ্যা, আশ্বিন-কার্তিকের পরেই বিয়ের কাজ বেশি শুরু হয় । আর শীতকালে ধুম পড়ে যায়।

প্রশ্নঃ এখন ব্যবসা কেমন যাচ্ছে?

পাখি ভাইঃ এখন এই ইন্টানেটের যুগে ছেলে মেয়েরা ফেসবুকে নিজেরাই পছন্দ করে অনেক বিয়ে করছে। যার জন্য ব্যবসা একটু কম হচ্ছে। তবে ইন্টানেটে পরিচয় হয়ে যেসব ছেলে মেয়েরা বিয়ে করছে তাদের অধিকাংশই পরবর্তী সময়ে বিপদে পড়ছে, এরকম খবর প্রায়ই আসছে। যদি ছেলে মেয়েরা বাবা-মায়ের পছন্দে ও তাদের পরামর্শে আর আমাদের মাধ্যমে বিয়ে করে তাহলে তাদের সাংসারিক জীবনে ঝামেলা হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নাই বললেই চলে।

প্রশ্নঃ মানুষ কি ধরনের পাত্রপাত্রী বেশি চায়? পাত্রীর ক্ষেত্রে আগে সাংসারিক মেয়েই বেশি চাইতো। এখনও কি সেরকই আছে নাকি প্রেক্ষপট পরিবর্তন হয়েছে?
পাখি ভাইঃ এখনতো যে ঘরে শ্বশুর শ্বাশুড়ি নেই সেখানেই মেয়েদের আগ্রহ বেশি। আগে বাবা মা বা শ্বশুর শাশুড়ির খেদমতের একটি প্রবণতা ছিল, এখন সেটি নেই। সবাই চায় দুজনে ঘুরে বেড়াবে। পরিবারের সদস্যদের বাড়তি ঝামেলাই মনে করে বেশিরভাগ মেয়ে।

প্রশ্নঃ সাধারণত পাত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রে সবাই সুন্দরী পাত্রী চায়। সুন্দরী পাত্রী বলতে আপনি কি বোঝেন?

পাখি ভাইঃ সুন্দর বিষয়টি সবার চোখে ও মনে এক রকম না। অনেকক্ষেত্রে দেখা গেছে পাত্রের বন্ধুরা বলছে পাত্রী পছন্দ হয়নি, কিন্তু পাত্রের কাছে অনেক ভালো লেগেছে। আসলে সুন্দরের বিষয়টি আপেক্ষিক। কালো বা ফর্সা সব মেয়েরই কিন্তু বিয়ে হচ্ছে। ভালোলাগা বা সুন্দর মনে করা এটি অনেকের মনে এমনিতেই জেগে উঠে। তবে বিয়ে করার ক্ষেত্রে পাত্র বা পাত্রী উভয়ের ক্ষেত্রেই খোঁজ খবর নিয়ে করতে হবে। বাহ্যিক সুন্দর বা সম্পদ দেখে তার সম্পর্কে না জেনে বিয়ে করলেই বিপদে পড়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।

প্রশ্নঃ বিয়ের পর যদি দম্পতির মাঝে ঝামেলা হয় সে বিষয়গুলো আপনার ওপর কী রকম প্রভাব ফেলে?
পাখি ভাইঃ এসব বিষয় আমার ওপর কোনও প্রভাবই ফেলে না। কারণ আমি আগেই বলে দেই, পাত্র বা পাত্রীর বিষয়ে ভালোভাবে খোঁজ খবর নিবেন। আমি শুধু মিলিয়ে দেবো। উভয়পক্ষের মাঝে খোঁজ খবর নেয়া তাদের দায়িত্ব। পরে কোনও ঝামেলা হলে সে বিষয়ে আমি কিছু করতে পারবো না।

প্রশ্নঃ বিয়ের পর কোন বিষয়গুলো আপনাকে আনন্দ বা কষ্ট দেয়?
পাখি ভাইঃ যে মেয়েটার বিয়ে হচ্ছিল না। আমার মাধ্যমে যখন বিয়ে হয়, তারা সুখে সংসার করে তখন বিষয়গুলো খবুই আনন্দ দেয়। আবার আমার মাধ্যমে বিয়ে হলো, অথচ আমাকে অবেহেলা করলো বিয়ের দাওয়াত পর্যন্ত দেয় না। এমনকি আমার পরিচয় পর্যন্ত অনেকে দিতে চায় না সেটি কষ্ট দেয়। এছাড়া যখন কারও সংসার ভেঙে যায় সে বিষয়গুলোতো মর্মাহত করে।

প্রশ্নঃ ঘটকালির প্রথমদিকে ব্যবসা কেমন ছিল? পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয়ার কথা মাথায় আসলো কিভাবে?
পাখি ভাইঃ একবার একজন ব্যাংকের ম্যানেজার আমাকে বললেন যে, এভাবে বাড়ি বাড়ি গিয়ে কত দৌড়াবেন, তার চেয়ে কোনো একটি নম্বর দিয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেন। তার কথা মতো যে হোটেলে থাকতাম সেই হোটেলের নম্বর নিয়ে ইত্তেফাকে বিজ্ঞাপন দিলাম। এতো ফোন আসতে থাকলো যে, ১৫ দিনের মাথায় হোটেল ম্যানেজার আমাকে হোটেল ছাড়তে বাধ্য করলেন। এরপর বাসা ভাড়া নিয়ে মানুষের বাসার নম্বর দিয়ে কিছুদিন চেষ্টা করলাম, কিন্তু সেটিও সম্ভব হয়। তারপর নিজে ফোন নিয়ে বাসা ভাড়া করে শুরু করলাম সেখানেও সমস্যা। বাসায় মানুষ বেশি আসে বলে বাড়িওয়ালা বাসা ছাড়তে বললেন। তারপর ৮৫ সালে ইস্টার্ন প্লাজায় ৬০ হাজার টাকা অগ্রিম ও ৩ হাজার টাকা ভাড়া দিয়ে রুম নিলাম। এখন ইস্টার্ন প্লাজায় আমি অফিস ভাড়া দেই দেড় লাখ টাকা।

প্রশ্নঃ পাত্রপাত্রী নির্বাচন করার ক্ষেত্রে কোন বিষয়গুলোর গুরুত্ব দিতে হবে?

পাখি ভাইঃ পাত্রপাত্রীর সম্পর্কে না জেনে বিয়ে করা যাবে না। পাত্র বা পাত্রী উভয়ের ক্ষেত্রেই আজকাল নানা সমস্যা দেখা যায়। কেউ ধোয়া তুলসী পাতা নন। খোঁজ খবর না নিয়ে বিয়ে করে অনেকেই বিপদে পড়ছে। তাই আমার অনুরোধ থাকবে সবাই যেনো পাত্রপাত্রীর সম্পর্কে ভালোভাবে খোঁজ খবর নিয়ে তারপর বিয়ের কাজ শেষ করে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত