প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ক্রমেই পাষণ্ড হয়ে ওঠছে মানুষ

হাসান আল বান্না : মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বন্ধুত্ব-ভালোবাসা হারিয়ে যাচ্ছে। মানুষে মানুষে এক সময় আত্মার সম্পর্ক ছিলো। ছিলো প্রেম-ভালোবাসা। একজনের বিপদে অন্যজন দৌঁড়ে এগিয়ে আসতো। পাশের বাড়িতে কোনো বিপদ হলে প্রতিবেশীরাই প্রথমে এগিয়ে আসতো। পাশে দাঁড়াতো। অসুখ হলে চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল বা নিকটস্থ কোনো চিকিৎসালয়ে নিয়ে যেতো প্রতিবেশিরাই। কারো বাড়িতে চোর বা ডাকাতি হচ্ছে এমন খবর পেলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা জানার আগেই প্রতিবেশিরা রক্ষীর ভূমিকায় দাঁড়িয়ে যেতেন। কিন্তু এখন কিন্তু সেই আগের অবস্থা নেই।

এখন মানুষ সব কিছুতেই নিজের স্বার্থটা আগে নিশ্চিত করতে চায়। মানুষ কোনো কাজ শুরুর আগে এখন প্রথমেই ভাবেন এতে তাঁর কোনো লাভ আছে কিনা। যদি না থাকে তাহলে সে আর সে অলাভজনক কাজে পা দিতে চায় না। কেউ কোনো সমস্যায় কেউ পড়লে পাশের লোকেরা দূরে সরে যায়। আগের দিনে এসব ছিল না। অন্যের উপকার করতে গিয়ে পরে নিজে ঝামেলায় পড়তে হতে পারে এমন আশঙ্কা থেকেও মানুষ কেউ কারো পাশে দাঁড়ায় না, দাঁড়াতে চায় না। বরং মানুষ ক্রমেই নিষ্ঠুর পাষণ হয়ে ওঠছে। অসংখ্যা মানুষের সামনে বরগুনায় রিফাত হত্যা হলো, কেউ তাকে বাঁচাতে ঝুঁকি নিতে আসেনি। মানুষের চোখের মানতেই প্রাণ দিতে হলো তাকে। প্রকাশ্যে নিজের কক্ষ থেকে ধরে নিয়ে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হলো আবরারকে কিন্তু সহপাঠীরা এগিয়ে আসেনি।

যে নির্মমতা চলে তুহিনের ওপর

সম্প্রতি শিশু তুহিন হত্যায় দেশবাসী স্তব্ধ হয়ে পরেছে। বুয়েটের হলে ছাত্রলীগের নেতারা নির্মমভাবে আবরার ফাহাদ হত্যার রেশ না কাটতে সামনে চলে আসে শিশু তুহিন হত্যা। মানুষ কেমন পাষাণ ও নির্মম হলে নিজের নিষ্পাপ শিশু সন্তানকে হত্যা করতে পারে। সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে কেজাউড়া গ্রামে নৃসংশভাবে শিশু তুহিন মিয়াকে হত্যার পর তার পেটে দু’টি ছুরি ঢুকিয়ে দেয় বাবা ও চাচা। তারা দু’টি ছুরির একটির গায়ে লিখে দেয় সুলেমান, অন্যটিতে সালাতুল। এই দু’জনই তুহিনের বাবা ও চাচার প্রতিপক্ষ। প্রতিপক্ষকে ফাঁসতে মানুষ এমন নির্মম হতে পারে শোনার পর যেকোনো সুস্থ মানুষই অসুস্থ হয়ে পড়বেন। মানুষ কতোটা নির্দয় হতে পারলে এমন আচরণ করতে পারে। সংবাদ মাধ্যমের খবরে জানা গেছে, শিশু তুহিনের বাবাই তাকে গভীর রাতে ঘর থেকে তুলে নিয়ে আসে। আর এই পাষাণ্ড বাবার সহযোগিতাই তাকে খুন করে আপন চাচা। বাবা ও চাচা মিলে যখন নিজের সন্তানকে খুন করার হয় ঠাণ্ডা মাথায় তখন স্বাভাবিকভাবে যে কাউকে ভাবনায় ফেলবে যে অন্যের কাছে নিজের সন্তান কতোটা নিরাপদ! সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান এর বরাত দিয়ে সংবাদ মাধ্যমগুলো জানায়, শিশুটির বাবার সঙ্গে গ্রামের একটি পক্ষের আধিপত্য বিস্তার, মামলা নিয়ে বিরোধ ছিল। প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতেই মূলত হত্যাকাণ্ডটি ঘটায় তুহিনের বাবা ও চাচারা।

‘মা’ ছেলের দু’পা চেপে ধরে, প্রেমিক গলা টিপে হত্যা করে
২০১০ সালে আলোজিত হত্যাকাণ্ড ছিল শিশু সামিউল হত্যা। ছয় বছরের শিশু খোন্দকার সামিউল ওয়াফিকে গলাটিপে হত্যা করা হয়। শিশু সামিউল এর মায়ের পরকীয়া প্রেমিক সামসুজ্জামান আরিফ তার গলায় দু’হাত দিয়ে সজোরে চেপে ধরে। আর মা আয়শা হুমায়রা এশা তার গর্ভজাত সন্তান সামিউলের দু’ পা শক্ত হাতে ধরে রাখে। এরপর সামিউলের মৃত্যু নিশ্চিত হলে তার লাশের ওপর বালিশ চাপা দিয়েই বাড়ির ছাদে উঠে যায় আরিফ। এ সময় এশা তাকে বলেন, তুমি ছাদে যাও আমি ব্যাপারটি দেখছি। মা তার একমাত্র সন্তানের লাশটিকে নিজ হাতে কিচেনের ডিপ ফ্রিজে রেখে ঘুমাতে যায়। এভাবেই মা এশা ও তার প্রেমিক আরিফের পথের কাঁটা দূর করা হয়। সামিউলের অপরাধ, এশা ও আরিফের অনৈতিক সম্পর্কের ঘটনা দেখে ফেলা। শিশু সামিউলকে হত্যার ঘটনা এভাবেই বর্ণনা করলেন আরিফ। ঘটনাটি ২০১০ সালের হলেও মানুষের হৃদয় থেকে এ নির্মমতা কখনোই মুছে যাবে না। অবশ্য সেই ‘খুনি’ স্ত্রীকে নিয়েই এখন সংসার করছেন সামিউল এর বাবা।

প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা করা হয় শিশু রাজনকে
২০১৫ সালের ৮ জুলাই সিলেটের কুমারগাঁওয়ে চুরির অপবাদ দিয়ে খুঁটিতে বেঁধে ১৩ বছরের শিশু সামিউল আলম রাজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয় পাষাণ্ডরা। এ হত্যার চিত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সারাদেশে ক্ষোভের সঞ্চার হয়। হত্যাকারীরাই নির্যাতনের এই ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিয়েছিল। মাত্র ১৩ বছর বয়সী এই টুকু শিশুকে যারা প্রকাশ্যে নির্মমভাবে হত্যা করলো তারা এটা কীভাবে পারলো। শুধু সিলেট নয় এই ঘটনায় সারাদেশে এটি তীব্র প্রতিবাদ গড়ে ওঠে। দোষীরা গ্রেফতারও হয়েছেন। কিন্তু এই নির্মমতা বন্ধ হয়নি। এখনো মির্মমভাবে পিটিয়ে মারা হচ্ছে আবরার ও তুহিনদের।

পাইপ পায়ুপথে ঢুকিয়ে হাওয়া দিয়ে হত্যা
২০১৫ সালের গত ৩ আগস্ট বিকেলে মোটরসাইকেলে হাওয়া দেওয়ার কমপ্রেসার মেশিনের পাইপ পায়ুপথে ঢুকিয়ে পেটে হাওয়া দিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় শিশু রাকিবকে। যে হত্যাকাণ্ডে দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। তীব্র সমালোচনার মুখে সরকার খুনিদের গ্রেফতারও করে। কিন্তু নেই নির্মমতা ও নিষ্ঠুরতা বন্ধ হয়নি। এ ঘটনার এক বছর পর বন্দরনগর নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে একটি সুতা তৈরির কারখানায় পায়ুপথে বাতাস ঢুকিয়ে সাগর বর্মণ (১০) নামের এক শিশুকে হত্যা করা হয়। শিশুটি ওই কারখানায় কাজ করছিল। এর আগেও সাগর বর্মণকে পিটিয়ে মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিল ওেই কারখানার মালিক। প্রথমে শিশুটি যখন হামলার শিকার হয়েছিল তখন এ হামলার বিচার হলে এভাবে অকালে ঝরে পড়তে হতো না সাগর বর্মণকে।

কটিয়াদীতে নার্স শাহিনুর আক্তার তানিয়া ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। যে ঘটনায় দেশজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করা হয় তানিয়াকে। এভাবে নিয়মিতই হয়ে ওঠছে নির্মমতা ও নিষ্ঠুরতা। শিশু সামিউল ও তানহা ই নয় শুধু, বাবা কিংবা মায়ের অনৈতিক সম্পর্কের বলি হতে হয়েছে অনেক শিশুকে। এমন জঘন্য ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। সম্প্রতি বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার ও শিশু তুহিন হত্যাকাণ্ড দেশের মানুষকে চরতভাবে মর্মাহত করেছে।

সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে যাওয়া নির্মমতার বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই। সমাজের সব শ্রেনী পেশার মানুষকে এসব নির্মম ও নিষ্ঠুর আচরণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। কারো চোখের সামনে কোনো অন্যায় কাজ হতে থাকলে তা প্রতিহত করার মানসিকতা লালন করতে হবে। নিজে গাঁ বাঁচিয়ে চলতে চাইলে সময়িকভাবে হয়তো চলা যাবে। কিন্তু অন্যায়গুলো যখন আরও বিস্তৃত হবে তখন এর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে কেউ বাঁচতে পারবে না।

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

সর্বাধিক পঠিত