প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দুর্বৃত্তদের হাতে যাচ্ছে বৈধ অস্ত্র

ডেস্ক রিপোর্ট : কুমিল্লার সরকারি কর্মকর্তা আবদুস সবুর (ছদ্মনাম) নিজের নিরাপত্তার জন্য একটি দোনলা (ডাবল ব্যারেল) বন্দুক কিনেছিলেন। দীর্ঘদিন ব্যবহারের পর বন্দুকটি মাত্র ৩০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেন একজন বৈধ অস্ত্র কারবারির কাছে। গত সোমবার রাজধানীর গুলিস্তান থেকে গ্রেপ্তার হওয়া ‘পেশাদার ডাকাত’ জালালউদ্দিনের কাছ থেকে সবুরের বিক্রি করা সেই দোনলা বন্দুকটি উদ্ধার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) আর্মস এনফোর্সমেন্ট টিম। দেশ রুপান্তর

সবুরের বৈধ অস্ত্রটি বৈধ কারবারির কাছে বিক্রির পর সেটি কীভাবে দস্যুর হাতে গেলÑ তা তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য সিটিটিসি উদঘাটন করেছে। সিটিটিসির একাধিক কর্মকর্তা জানান, জালালসহ তিন অস্ত্র কারবারিকে গ্রেপ্তারের পর এক দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। অন্য দুজন হলেন কুমিল্লার ফয়েজ বক্স ভুঞা অ্যান্ড আর্মস স্টোরের মালিক আবদুল হামিদ বাবুল ও একই এলাকার অবৈধ অস্ত্র কারবারি শফিকুল ইসলাম বিটু। তাদের কাছ থেকে দোনলা বন্দুকসহ দুটি পিস্তল ও ৭০ রাউন্ড গুলি উদ্ধার হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে জালাল

জানিয়েছেন, দোনলা বন্দুকটি তিনি অস্ত্র কারবারি বিটুর কাছ থেকে সংগ্রহ করে নিয়ে যাচ্ছিলেন সোনারগাঁয়ের বালু মহাল দখলদার বাহিনীর সদস্য জয়নাল ও আওয়ালের কাছে। জালালের দাবি তিনি অস্ত্র বহনকারী, বহনের জন্য ১০ হাজার টাকায় চুক্তি হয়েছিল জয়নাল ও আওয়ালের সঙ্গে। বিটু জানিয়েছেন, তিনি অস্ত্রটি ২ লাখ ৩০ হাজার টাকায় কিনে আওয়ালের কাছে আড়াই লাখ টাকায় বিক্রি করেছেন।

সিটিটিসির অতিরিক্ত উপকমিশনার জাহাঙ্গীর আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘উদ্ধার হওয়া দোনলা বন্দুকটি একজন বৈধ ডিলারের কাছে বিক্রি করেছিলেন এক সরকারি কর্মকর্তা। সেই বৈধ ডিলার বিশেষ কৌশলে অস্ত্রটির নম্বর মুছে ফেলে তা অপরাধীদের কাছে বিক্রি করার তথ্য পেয়েছি। এখন আমরা সেই ডিলারকে খুঁজছি। গ্রেপ্তারের স্বার্থে তার নাম-পরিচয় প্রকাশ করা যাচ্ছে না।’

তদন্তকারী অন্য এক কর্মকর্তা বলেন, যেই অস্ত্র কারবারির মাধ্যমে এই দোনলা বন্দুকটি অপরাধীদের হাতে পড়েছিল, তার সব তথ্য আমাদের হাতে। এখন সিআইডির ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে অস্ত্রটির প্রকৃত নম্বর উদ্ধার করার পর তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সিটিটিসির অস্ত্র উদ্ধারকারী একাধিক কর্মকর্তা জানান, শুধু এই অস্ত্র কারবারি নয়, আরও অনেক বৈধ অস্ত্র কারবারি তাদের নজরদারির মধ্যে রয়েছেন। তারা আগ্নেয়াস্ত্রের বৈধ লাইসেন্সের আড়ালে অবৈধ কারবারে যুক্ত রয়েছেন। এসব অভিযোগে বিভিন্ন সময়ে দেশের অন্তত ১২ অস্ত্র কারবারিকে গ্রেপ্তার করেছিল সিটিটিসি, যাদের অনেকেই জামিন নিয়ে একই কারবারে যুক্ত আছেন।

সিটিটিসির এই কর্মকর্তারা আরও জানান, বর্তমানে এক ও দোনলা বন্দুকের কোনো চাহিদা নেই। পৈতৃক সূত্রে যাদের কাছে এ ধরনের অস্ত্র রয়েছে, তারা অনেকেই এসব নিয়ে বিপাকে আছেন। কারণ কোনো কাজে না এলেও প্রতি বছর লাইসেন্স নবায়নের জন্য ৫ হাজার টাকা খরচ হয়। এছাড়া অনেকেই অস্ত্র রাখতে ঝুঁকি মনে করেন। তাই অস্ত্রের বৈধ কারবারিদের কাছে এক ও দোনলা বন্দুক বিক্রির জন্য নিয়ে যান। তখন কারবারিরা অস্ত্রের মালিকদের জানান, এসব অস্ত্রের কোনো চাহিদা নেই। বিক্রি তো দূরের কথা, এক ও দোনলা বন্দুক তাদের কাছে রাখার বিনিময়ে অর্থও দাবি করেন তারা। এমন পরিস্থিতিতে অনেকে বৈধ অস্ত্র কারবারিদের কাছে এক ও দোনলা বন্দুক রেখে যান। পরে বৈধ দোকান মালিকরা অবৈধভাবে এসব অস্ত্র ৩০-৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন অপরাধ চক্রের কাছে বিক্রি করে দেন। এসব অভিযোগে খুলনার বৈধ অস্ত্র কারবারি সুবোধ ও নেত্রকোনা আর্মস কোম্পানির মালিক মোহাম্মদ আলী বাবুল গ্রেপ্তার হন সিটিটিসির হাতে।

সিটিটিসির আর্মস এনফোর্সমেন্টের এক কর্মকর্তা জানান, কুমিল্লার অস্ত্র কারবারি আবদুল হামিদ বাবুল ও অবৈধ অস্ত্র কারবারি শফিকুল ইসলাম বিটু যোগসাজশে দীর্ঘদিন ধরে বৈধ অস্ত্রের অবৈধ কারবার করে আসছেন। বাবুল তার দোকানের স্টক রেজিস্টারে কোনো তথ্য সংরক্ষণ না করে সম্পূর্ণ অবৈধ উপায়ে অস্ত্র বিক্রি করছিলেন। একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে চুয়াডাঙ্গার মির্জা বাশার বেগ আর্মস কোম্পানির বিরুদ্ধে। সিটিটিসির জিজ্ঞাসাবাদে বিটু জানিয়েছেন, বাবুল ছাড়াও আরও অনেক বৈধ অস্ত্র কারবারির কাছ থেকে তিনি অস্ত্র ও গুলি সংগ্রহ করে কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করেছেন। গত সপ্তাহেও তিনি কুমিল্লার বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তির কাছে প্রায় ৪০০ রাউন্ড গুলি বিক্রি করেন। যাদের গুলি দিয়েছেন, তাদের সবার কাছে বিটুর সরবরাহ করা অন্তত আটটি অবৈধ অস্ত্র রয়েছে। এসব অস্ত্রের মধ্যে পিস্তল, রিভলবার ছাড়াও একে টুটু রয়েছে।

সিটিটিসির অন্য এক কর্মকর্তা বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সিলেট, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম ও খুলনার বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে অবৈধ অস্ত্র ও গুলি বিক্রি করেছেন বাবুল ও বিটু। সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া সিলেটের গোয়াইনঘাটের অবৈধ অস্ত্র কারবারিদের জোটের সঙ্গে এসব ব্যক্তিরও সম্পর্ক রয়েছে বলে জানা গেছে। বাবুল ও বিটু বৈধ-অবৈধ দুভাবেই অস্ত্র-গুলির কারবারে জড়িত। তারা বৈধ কারবারিদের কাছে অবৈধভাবে গুলি সংগ্রহ করতেন। একই সঙ্গে অবৈধ কারবারিদের কাছ থেকে অবৈধ অস্ত্র কিনে চড়া দামে অপরাধীদের কাছে বিক্রি করেন।

সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া কুমিল্লার জামায়াত নেতা ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের বডিগার্ড হাতকাটা হাসিবের সঙ্গেও বিটুর সংশ্লিষ্টতার তথ্য পেয়েছেন তদন্তকারী সিটিটিসির কর্মকর্তা। হাতকাটা হাসিব দীর্ঘদিন ধরেই নিখোঁজ।

সিটিটিসির হাতে গ্রেপ্তার হওয়া দস্যু জালালের বিরুদ্ধে ডাকাতির একাধিক মামলা রয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে জালাল জানিয়েছেন, তার বড় ভাই একসময় নারায়ণগঞ্জের বালু ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতাদের চাহিদামতো বিভিন্ন অস্ত্রের বহনকারীর কাজ করতেন। তার ভাই মারা যাওয়ার পর তিনি এখন সেই পেশা বেছে নিয়েছেন। কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে তিনি অবৈধ অস্ত্র বহন করে থাকেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈধ অস্ত্রের হিসাব রাখার ক্ষেত্রে দেশে তথ্যপ্রযুক্তিগত কোনো ব্যবস্থা নেই। তাই বৈধ কোনো অস্ত্র কোথায় কীভাবে কার হাতে রয়েছে, তা অনেক ক্ষেত্রে নির্ভুলভাবে জানা সম্ভব হয় না। অনেকে এ সুযোগে বৈধ অস্ত্রের চিহ্নিতকরণ নম্বর ঘষামাজা করে অবৈধভাবে হাতবদল করে দেয়। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সিটিটিসির অতিরিক্ত উপকমিশনার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘অনেক বৈধ অস্ত্র কারবারি অবৈধভাবে অস্ত্র বিক্রি করছেন। অনেকের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এরপরও অনেকের বিরুদ্ধে এ ধরনের তথ্য আমাদের কাছে আসছে। আমরাও তাদের নজরদারির মধ্যে রেখেছি।’

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত