প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শুদ্ধি অভিযান হোক সর্বস্তরে

 

অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান : সম্প্রতি পরিচালিত শুদ্ধি অভিযান অতি আলোচিত একটি বিষয়। চলমান এই শুদ্ধি অভিযান কেবলমাত্র রাজনৈতিক দল কিংবা রাজনৈতিক দলের একটি দুটি সংগঠনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। এর বিস্তৃতি বাড়ানো দরকার। সমাজের বিভিন্ন অপকর্ম, দুনীতি, অন্যায়ের পেছনে যারা কালো জোন হিসেবে কাজ করে অর্থাৎ যারা মদদ, সমর্থন এবং পৃষ্ঠপোষকতা দেয় প্রশাসন থেকে আরম্ভ করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী তাদের বিরুদ্ধেও অভিযান চালাতে হবে। খেয়াল করলে দেখা যায়, নামে-বেনামে বিভিন্ন সংগঠন বানিয়ে রাজনৈতিক দলের ব্যানার বা ব্যানারের মতো করে তাদের নিজস্ব ব্যানার লাগিয়ে অপকর্মগুলো করছে, সেগুলোও একসঙ্গেই রোধ করতে হবে। বিভিন্ন অফিসে মদ-গাঁজা অবৈধ অস্ত্রসহ অনেক কিছু পাওয়া যাচ্ছে। এগুলো আসলে রাজনৈতিক দলের অফিসে নয়। রাজনৈতিক দলের কতিপয় নেতার বাড়ি কিংবা নেতার নিজস্ব ব্যক্তিগত অফিসে এসব জিনিস পাওয়া গেছে। সেপ্টেম্বরের ১৮ তারিখ থেকে শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছে।

এই অভিযানের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের সম্পৃক্ততা বলতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সবচেয়ে শক্তিশালী একটি সহযোগী সংগঠন আওয়ামী যুবলীগের নামটি জড়িয়ে গেছে। এই সংগঠনটিকে আমি ভেতর থেকে দেখেছি এবং এটার নেতৃত্বেও একসময় ছিলাম। এই ঘটনাটির জন্য পুরো সংগঠনটিই দায়ী কিংবা সারাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে সব জায়গার লাখ লাখ তরুণের মাঝে ক্যাসিনো ছড়িয়ে গেছে, এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। আমাদের যারা উপর লেভেলের নেতৃত্বে ছিলেন, তাদের ব্যর্থতার কারণেই এ রকম কিছু সুবিধাবাদী কিংবা বিভিন্ন দলছুট লোক এসে নেতৃত্ব বা পদগুলো নিয়ে অপব্যবহার করেছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, প্রথম দিন ক্যাসিনো অভিযান চালিয়ে কয়েকজন ক্যাসিনোর মালিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ক্যাসিনোতে যারা জুয়া খেলছিলো এ রকম ১৮২ জনকে শাস্তি দেয়া হয় প্রথম দিনেই। মোবাইল কোর্ট বিভিন্ন মেয়াদে তাদের তাৎক্ষণিকভাবে শাস্তি দেয়। ওই ১৮২ জনের মধ্যে যুবলীগের নেতাকর্মী কেউ ছিলো না। তার মানে দাঁড়াচ্ছে মালিকানা যুবলীগের ওই মাস্তান কয়েকজনই দখল করেছিলো, কিন্তু এই ক্যাসিনোর সঙ্গে শুধু যুবলীগ জড়িত এমনটা মনে করার কোনো কারণ নেই। সমাজের কোনো স্তর বাকি নেই, যেখানে ক্যাসিনোর প্রভাব পড়েনি। আইন পেশা, ব্যবসা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, সিভিল সার্ভিস, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার থেকে শুরু করে সব পেশার লোক ওই ১৮২ জনের মধ্যে ছিলো। ক্যাসিনোগুলোর নিয়ন্ত্রণ যুবলীগের হাতে ছিলো বিধায় যুবলীগের নাম এসে গেছে এবং তাদের কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। যুবলীগের লাখ লাখ নেতাকর্মী আছে, যাদের তিনবেলা ভালোভাবে খাওয়ারই টাকা নেই, ক্যাসিনো কালচারের সঙ্গে তারা পরিচিত নয়। তাদের অনেকের এখনো কর্মের সংস্থান হয়নি। এখনো যুবলীগের অনেকে আমার কাছে আসেন। তারা একটা এসআই বা পুলিশের কনস্টেবলও হতে পারেনি। তারা একটা পিয়নের চাকরি করতেও রাজি আছে। সেজন্য ঢালাওভাবে যুবলীগকে দায়ী করা যাবে না।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে যেসব যুব সমাজ যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে অথবা ছাত্রত্ব থাকাকালীন সময়েই বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নির্দেশেই দেশের উন্নয়নের কাজে লাগানোর জন্য একটি সম্মিলিত শক্তি হিসেবে, তাদের মেধা মননকে কাজে লাগানোর উদ্দেশ্য নিয়েই যুবলীগ গঠিত হয়। পরবর্তী পর্যায়ে একান্তই সীমিত সংখ্যক কয়েকজন নেতার নেতৃত্বের দুর্বলতার কারণেই যুবলীগের আজকের এই পরিণতি। কোনোভাবেই গণহারে যুবলীগকে দোষ চাপানোর কোনো কারণ নেই। একইভাবে ছাত্রলীগের কথা উঠছে। ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদককে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। আমরা বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ^বিদ্যালয়ের একজন মেধাবী ছাত্রকে হারিয়েছি। এটা খুবই দুঃখজনক। আবরার ফাহাদ নামের একজন ছাত্র খুন হয়েছে, তার খুনিদের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। অপরাধী যারা তাদের খুব দ্রুত বিচারের আওতায় আনা হবে এবং একটা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হবে সেটাই সবার প্রত্যাশা। বুয়েটে ছাত্র আবরার হত্যায় বুয়েটের ১৯ জনের নামে মামলা করা হয়েছে। তাদের মধ্যে অধিকাংশকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে যারা একটি সংগঠনের নেতা কর্মী। আমাদের অবশ্যই শুদ্ধিকরণের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। বিরাজনীতিকরণের মধ্য দিয়ে বা রাজনৈতিক দলগুলোকে বাদ দিয়ে অন্য কোনো পন্থায় দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। যতো কথাই বলা হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত রাজনীতি এবং রাজনৈতিক দলের মাধ্যমেই দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে হবে। সেখানে মেধা, মননশীল এবং যোগ্য নেতৃত্বের জায়গাগুলো নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তার কাউন্সিল তারিখ ঘোষণা করেছে। সেখানে এই বিষয়গুলো আসতে পারে। র‌্যাব-পুলিশ কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে শুদ্ধি অভিযান আসলে কতোটা হবে, তা আমার জানা নেই। আমাদের সমাজের সার্বিক পরিম-লে যে অবক্ষয় হয়ে গেছে, সেগুলোকে কীভাবে শুদ্ধি করবেন? যে ছেলেটা বুয়েটে খুন হলো, সে অবশ্যই মেধাবী। যারা ছেলেটাকে খুন করলো, খুনিরাও কিন্তু মেধাবী। আশির দশকে রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ে, চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের হলগুলোতে হানাহানি, ছাত্রদের রগ কেটে দেয়া, ছাত্র হত্যা করা, ড্রামের মধ্যে ঢুকিয়ে রাখা এগুলো ছিলো নৈমিত্তিক ব্যাপার।

এই হানাহানি-রগকাটার রাজনীতি থেকে আমরা প্রায় বেরিয়ে আসছিলাম। আশির দশকে মাস্তান, সশস্ত্র গ্রুপ, ইলিয়াস গ্রুপ, অভি গ্রুপের, ক্যাম্পাসে গোলাগুলি গত কয়েক বছরে একেবারেই কমে এসেছিলো। এখন এসে আবার এমনটা শুরু হয়ে যাচ্ছে। বুয়েটে যারা এ কাজটা করলো, তাদের কয়েকজন চতুর্থ বর্ষের ছাত্র, আর কয়েকদিন পরে যারা ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে বের হবে, বিসিএস দিয়ে ক্যাডার সার্ভিসে গিয়ে প্রকৌশলী হিসেবে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের দায়িত্ব পাবে। বুয়েটে এতো মেধাবী ছাত্রদের সমাবেশ, অথচ সেখানেও এই পচন। আমাদের সমাজ কিংবা পরিবারের মধ্যে নৈতিকতা না আসে, তাহলে এ পচন রোধ করা যাবে না। এই ছাত্রদের অনেকে কেবল ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে, যারা পরিবারে ১৫-১৬ বছর কাটিয়ে গত বছর মাত্র বুয়েটে এসেছে। মাত্র এক বছর বিশ^বিদ্যালয়ে থাকার কারণে সে খুনিতে পরিণত হয়েছে, এমনটা মনে করার কোনো কারণ নেই। তার ফ্যামিলি, স্কুল সব জায়গার ব্যাপারে আমাদের মনোযোগী হতে হবে। অন্যথায় কেবল মাত্র র‌্যাব দিয়ে আমরা এই শুদ্ধি অভিযান চালিয়ে স্থায়ী সমাধান পাবো না। সন্ত্রাসীরা যুবলীগের নেতানেত্রী হচ্ছে। অন্যান্য রাজনৈতিক দলেরও একই অবস্থা। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য হচ্ছে যারা সব জায়গায় যতো অপকর্ম করে, ক্ষমতার দাপট দেখায়, তারা সবসময় কোনো না কোনোভাবে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের আশ্রয়ে চলে আসে। তারা ভালো করেই জানে, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের আশ্রয়ে আসলেই প্রশাসনের সমর্থন পাওয়া যাবে। কীভাবে এই ক্যাসিনো ব্যবসার সঙ্গে যুবলীগ জড়িত হলো, এসব তদন্ত করার জন্য আবার কমিটি করার কোনো প্রয়োজন নেই। ক্যাসিনো কীভাবে হলো এ ব্যাপারে সরকারের উচ্চমহল ধারণা রাখেন। এখানে একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রয়োজন ছিলো যেটা ইতোমধ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিয়েছেন। এখান থেকে পিছপা হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। একজনকে ছেড়ে আরেকজনকে ধরার কোনো সুযোগ নেই। এই অপরাধীরা ভেতরে ভেতরে অত্যন্ত সুসংগঠিত। তারা যদি কোনোভাবে পার পেয়ে যায়, তারা অবশ্যই পাল্টা আঘাত হানবে। লেখক : উপাচার্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

সর্বাধিক পঠিত