প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বৃহত্তর ঐক্যে ‘বাধা’ জামায়াত ও সিপিবি, সমাধান চায় বিএনপি

ডেস্ক রিপোর্ট : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগবিরোধী একটি বৃহত্তর ঐক্যের চেষ্টা চালায় বিএনপি। এরপর নির্বাচনের মাত্র আড়াই মাস আগে চারটি দলের সমন্বয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গড়ে তুলতেও সক্ষম হয় দলটি। ওই নির্বাচনে অপ্রত্যাশিত ফল আসার পর নতুন করে বৃহত্তর ঐক্যের বিষয়টি নিয়ে ‘সিরিয়াস’ হয় বিএনপির হাইকমান্ড। এখন নীতিগত প্রত্যাশা একটি সর্বদলীয় ঐক্য। দলটির নেতারা চান, ২০ দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বাইরে থাকা সরকারবিরোধী দলগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে ‘মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবি’ আদায়ে সক্রিয় কর্মসূচিতে যেতে। ইতোমধ্যে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিক দলগুলোর মধ্যে বিষয়টি নিয়ে ইতিবাচক অবস্থা সৃষ্টি হলেও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি)সহ গুরুত্বপূর্ণ বাম ও ধর্মভিত্তিক কয়েকটি দলকে যুক্ত করা যাচ্ছে না। বাংলা ট্রিবিউন

ঐক্যপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত রাজনৈতিক নেতারা বলছেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী জামায়াতের সঙ্গে জোটগত সম্পর্ক থাকলে বিএনপির নেতৃত্বে কোনও ঐক্য হবে না। একইসঙ্গে কোনও-কোনও রাজনৈতিক দলের নেতার দাবি, বিএনপি বা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে বামদলগুলোর ঐক্যের সম্ভাবনা স্থগিত হয়ে আছে সিপিবির জন্য। গত কয়েক বছরে অসংখ্যবার দলটিকে আহ্বান জানানো হলেও বারবারই প্রত্যাখ্যাত হয়ে এসেছে বিএনপিসহ সমমনা দলগুলো।

বৃহত্তর ঐক্য-প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করছেন জেএসডির উপদেষ্টা ও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। তিনি  বলেন, ‘সরকারের বাইরে যেসব দল আছে, তারা সবসময় বৃহত্তর ঐক্যের গঠনে পজেটিভ। কিন্তু এই দলগুলোর মধ্যে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সিপিবি। জামায়াত ইস্যুকে সামনে এনে তারা বৃহত্তর ঐক্যে যায় না। আবার অন্য বাম দলগুলোকে যেতে বাধা দেয়। বাম নেতাদের মধ্যে সাইফুল হক ঐক্যের ব্যাপারে পজেটিভ। কিন্তু সিপিবির কারণে তিনি আসতে পারেন না।’

জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘আমি সিপিবিকে বলেছি জাতীয় ঐক্যেফ্রন্টের মধ্যে তো জামায়াত নেই। তাহলে যেতে সমস্যা কোথায়? মূলত তারা আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠনের মতো কাজ করে।’

বিএনপি যদি তাদের জোট শরিক জামায়াতকে না ছাড়ে, তাহলে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তো সম্ভব নাও হতে পারে, এমন সংশয় প্রকাশ করেন জাফরুল্লাহ চৌধুরী।

জানতে চাইলে সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘১৯৭১ সালের মতো ঐক্য করলে তার দল ঐক্যে থাকবে।’ শুক্রবার সন্ধ্যায় তিনি বলেন, ‘আমরা তো ঐক্য করেছি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়। এখন আবার ঐক্য করতে হলে মুক্তিযুদ্ধের চার নীতিকে সামনে রেখে করতে হবে। এক লুটেরার হাত থেকে দেশকে মুক্ত করে আরেক লুটেরার হাতে দেশকে তুলে দিতে কারও সঙ্গে আমরা ঐক্য করতে পারি না।’

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মধ্যে গণফোরাম ছাড়া বাকি শরিক দলগুলোয় জামায়াতকে নিয়ে এক ধরনের সহিষ্ণুতার নীতি তৈরি হয়েছে। ‍দৃশ্যত অস্বস্তি দেখালেও ফ্রন্টের কোনও-কোনও নেতার সঙ্গে দলটির সুসম্পর্কের কথা এখন ‘ওপেন সিক্রেট’ বলে মনে করেন অনেকেই।

শুক্রবার (১৮ অক্টোবর) এক সভায় জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘আমরা যখনই ঐক্য গড়ার চেষ্টা করি, তখনই কালো টাকা দিয়ে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়। সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে সামনে আনা হয়। কিন্তু জনগণ এগুলোকে প্রশ্রয় দেয় না। তাই সরকারও সফল হয় না।’

বামদলগুলোর নেতারা বলছেন, সরকারবিরোধী যে বৃহত্তর ঐক্যে গড়ে তোলার কথা বলা হচ্ছে, তা এখন দলগুলো মধ্যে প্রাথমিক আলোচনা মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। কোন ইস্যুতে বৃহত্তর ঐক্য করা হবে, বিএনপি বা জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট থেকে তার সুনির্দিষ্ট কোনও প্রস্তাব আসেনি তাদের কাছে। তবে ঐক্যফ্রন্টের শরিক ও বামদলগুলো একে-অন্যেরর বিভিন্ন প্রোগ্রামে আসা-যাওয়ার মধ্য দিয়ে ন্যূনতম যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।

বাম জোটের সাবেক সমন্বয়ক, বাংলাদেশে ওয়ার্কাস পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ‘ঐক্যফ্রন্টের শরিক গণফোরাম, জেএসডি ও নাগরিক ঐক্যের বিভিন্ন প্রোগ্রামে আমরা অংশগ্রহণ করি, তারাও আমাদের বিভিন্ন কর্মসূচিতে আসেন। এর বাইরে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলার বিষয়ে বিএনপি বা ঐক্যফ্রন্ট থেকে সুনিদিষ্ট কোনও প্রস্তাব আসেনি। সবকিছু এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। আমরা সব সময় বলে আসছি, কর্মসূচির মাধ্যমে রাজপথেই ঐক্য গড়ে উঠতে পারে।’

ধর্মভিত্তিক দলগুলোর মধ্যে কোনও জোটে নেই, এমন কয়েকটি দল আছে। এরমধ্যে, উল্লেখযোগ্য ইসলামী আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলন উল্লেখযোগ্য। এই দলগুলোর সঙ্গে ‘অনানুষ্ঠানিক’ প্রক্রিয়ায় কথা হলেও কার্যকর কোনও কমিটমেন্ট তৈরি হয়নি।

বিএনপির একটি দায়িত্বশীল পক্ষ বলছে, ধর্মভিত্তিক দলগুলোর সঙ্গে জামায়াতের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব, তার কারণ মুক্তিযুদ্ধ নয়। ধর্ম নিয়ে বিশ্বাসগত কিছু জায়গায় দলটির সঙ্গে দূরত্ব আছে তাদের। এক্ষেত্রে নতুন নির্বাচনের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ চাপসৃষ্টি করতে হলে বিষয়টিকে কোন জায়গায় রাখা উচিত, তার ব্যাখ্যা বিএনপি করবে, এমন দাবি এই পক্ষের।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইসলামী আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক মাওলানা মোহাম্মদ ইউনুছ আহমদ বলেন, ‘আমরা দলের সাংগঠনিক কাজ নিয়ে ব্যস্ত আছি। সারাদেশে দলের সদস্য সংগ্রহের কাজ চলছে। আপাতত, কোনও জোট বা বৃহত্তর ঐক্য নিয়ে আমরা ভাবছি না। তবে দুর্নীতিমুক্ত দেশ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সন্ত্রাসমুক্ত করতে সুনির্দিষ্ট সরকারবিরোধীরা রাজপথে নামলে আমরা তাদের সঙ্গে যুক্ত হতে পারি।’

কীভাবে সমাধান চায় বিএনপি?

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর জাতীয় সংসদে যোগদানকে কেন্দ্র করে ফ্রন্টে দ্বিধা-বিপত্তি ছড়ালেও দিনে-দিনে পরিস্থিতি গুছিয়ে এনেছে বিএনপি। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সরাসরি আগ্রহেই জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নতুন করে কর্মসূচি নিয়ে সামনে আসছে। এই ধারাবাহিকতায় মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবিকে সামনে রেখে আরও কার্যকর কর্মসূচি গ্রহণ করতে চায় বিএনপি।

বিএনপির নীতি-নির্ধারকদের মধ্যে ঐক্যের বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা হলেও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশের বাইরে থাকায় কার্যকর কোনও উদ্যোগ এখনও গ্রহণ হয়নি। তিনি দেশে ফিরে এলে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে সামনে এগোবে, এমনটি প্রত্যাশা করেছে বিএনপির একটি দায়িত্বশীল সূত্র।

চেয়ারপারসন কার্যালয়ের একাধিক দায়িত্বশীল বলছেন, বৃহত্তর ঐক্যের জন্য বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্য সময়ের দাবি। এই দাবি পূরণে কোনও বাধাই শেষ পর্যন্ত টিকবে না। জামায়াতের বিষয়ে যে বাধাগুলোকে সামনে আনা হয়েছে, এর সমাধান হবে দলটির ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা, নতুন আমির কে হবেন, গঠনতন্ত্রে নতুন কী পরিবর্তন আসবে, তার ওপর। এক্ষেত্রে বিএনপিকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে জামায়াতের বিষয়ে।

তবে, এতে দ্বিমত পোষণ করেন জামায়াতের রাজনীতির গভীর পর্যবেক্ষক, সাবেক সচিব শাহ আবদুল হান্নান। শুক্রবার রাতে  তিনি বলেন, ‘আমার জানা মতে, বিএনপির শীর্ষ নেতারা জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চান। আর তা চান জামায়াতের শীর্ষ নেতারাও।’ তিনি মনে করেন, ‘জামায়াতের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রোপাগাণ্ডা আছে, বিএনপির ভেতরের কিছু লোক থাকতে পারে, যারা মনে করে জামায়াতকে বাদ দিলে তাদের ভোট আরও বাড়বে।’

শাহ আবদুল হান্নান আরও বলেন, ‘জামায়াতের একটি ভোটব্যাংক আছে। সেটা আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পরের অবস্থান। জাতীয় পার্টি এখন চতুর্থ অবস্থানে আছে। সেটা বিএনপি শীর্ষ নেতারা বোঝেন যে, কিছু বোকা বিএনপি ও কিছু বুদ্ধিজীবী মনে করেন, তাদের জামায়াত ছাড়ার কথা। এক্ষেত্রে কারও বলতে চাই না।’ তিনি দাবি করেন, ‘বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও সাধারণ সম্পাদক মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মনে করেন জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি রাখতে হবে। এবং আরও সুদৃঢ় করতে হবে।’

বিএনপির দায়িত্বশীলসূত্র দাবি করেছে, সিপিবিসহ ক্ষমতাসীনদের বাইরে বাকি বাম দলকে ঐক্যে যুক্ত করতে বিভিন্ন পরিকল্পনা এখন শীর্ষ নেতৃত্বের নজরে আছে।

সিপিবির একাধিক সূত্র বলছে, ২০০১ সালের পর বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় তারেক রহমানের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোই সবচেয়ে বেশি আপত্তির। এক্ষেত্রে আগামী দিনে তার আচরণ কী হবে, এর নিশ্চয়তা আগে পেতে হবে। এছাড়া, দলের প্রেসিডিয়ামের মনোভাব এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করবে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন প্রবীণ সদস্যের মত, গত বছরের ৮ সেপ্টেম্বর বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া গ্রেফতারের পর তারেক রহমানই দলের একচ্ছত্র নেতা। সাংগঠনিকভাবে তার অবস্থান আগে থেকে শক্তিশালী থাকায় নতুন করে রাজনৈতিকভাবেও সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যেগুলো নিয়ে খুব বেশি বিতর্ক সৃষ্টি হয়নি। এক্ষেত্রে সংসদে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত, ছাত্রদলে সরাসরি ভোট নিয়ে নেতৃত্ব নির্বাচন ইত্যাদি বিষয়কে দেশের নাগরিক সমাজের অনেকেই ইতিবাচক হিসেবে গ্রহণ করেছেন।’

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র  বলেন, আমরা বৃহত্তর ঐক্য করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এখন সেক্ষেত্রে আগানো বা পেছানোর কোনও বিষয় নেই। কারণ কাউকে তো জোর করে এনে ঐক্য করতে পারি না।’

গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও নতুন নির্বাচনের দাবিতে সামনে রেখে বৃহত্তর ঐক্য হতে পারে বলে উল্লেখ করে গয়েশ্বর চন্দ্র বলেন, ‘দেশের মধ্যে যেসব সমস্যা বিদ্যমান রয়েছে, সেগুলো ক্ষমতায় গিয়ে সংস্কারের বিষয়ে। কারণ দেশকে আপনি দুর্নীতিমুক্ত করতে চাইলে ক্ষমতা গিয়ে প্রমাণ করতে হবে। ক্ষমতার বাইরে থেকে আমরা চাইলে তো দুর্নীতি মুক্ত করতে পারবো না।’

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত