প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দূষিত তরল শিল্পবর্জ্য ও পানি শোধন করবে অনুজীব, জানিয়েছেন দেশের বিজ্ঞানীরা

মাজহারুল ইসলাম : আমাদের দেশের নদী-নালাগুলোর দূষিত তরল শিল্পবর্জ্য শোধন করবে অনুজীব। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব দূষিত তরল বর্জ্যে এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া থাকে যা ওই বর্জ্য ভেঙ্গেই তাদের পুষ্টি সংগ্রহ করে থাকে। আর এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শিল্প বর্জ্য থেকে শুরু করে দূষিত হয়ে পড়া নদী-নালা খাল-বিলের পানি শোধন করা সম্ভব হবে। গবেষণা দ্বারা এটি প্রমাণ করেছেন গাজীপুরে অবস্থিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বায়োলজি ও এ্যাকোয়াটিক এনভায়রনমেন্ট বিভাগের বিজ্ঞানীরা। ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলা গাজীপুরে গড়ে উঠেছে অসংখ্য গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিসহ বিভিন্ন ডায়িং কারখানা। এসব কারখানার দূষিত বর্জ্য গাজীপুরে অবস্থিত বঙ্গবন্ধু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশ দিয়ে তৈরি নর্দমা দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। প্রাকৃতিক উপায়ে কিভাবে এই বর্জ্য পরিশোধন করা সম্ভব এই চিন্তা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বায়োলজি ও এ্যাকোয়াটিক এনভায়রনমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক এসএম রফিকুজ্জামান দূষিত বর্জ্য নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন। তিনি জানান, ড্রেন থেকে ডায়িং কারখানার নীল রঙের পানি ল্যাবে নিয়ে ব্যাকটেরিয়ার সাহায্যে দূষণমুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। মাটি এবং দূষিত বর্জ্যে বাস করে এমন কিছু ব্যাকটেরিয়া ডায়িং কারখানা থেকে সংগৃহীত পানির মধ্যে রেখে দেয়া হয়। ২৪ ঘণ্টায় দেখা গেল পানির নীল রং আর নেই। নীলের পরিবর্তে স্বচ্ছ পানির রং ফিরে এসেছে। জনকণ্ঠ

এরপর তিনি এই ব্যাকটেরিয়ার সাহায্যে অতি দূষিত পানি নিয়ে পরীক্ষা করেন। বিশেষ করে পানির নিচের অংশে যেসব হ্যাভি মেটাল থাকে সেগুলো পরিশোধনের জন্য পরীক্ষা চালান। এক পর্যায়ে দেখতে পান পানির নিচে অংশ জমে থাকা হ্যাভি মেটাল আর নেই। এই ব্যাকটেরিয়াগুলো হ্যাভি মেটাল ভেঙ্গে সেখান থেকে পুষ্টি সংগ্রহ করায় পানি সম্পূর্ণ পরিষ্কার রূপ ধারণ করেছে। তিনি জানান, প্রাথমিক পর্যায়ের গবেষণায় অণুজীব ব্যবহারে পানি দূষণমুক্ত হওয়ায় এখন এর ব্যবহারিক দিক নিয়ে গবেষণা করা হচ্ছে। অচিরেই এই গবেষণায় সাফল্য পাওয়া যাবে বলে উল্লেখ করেন। বলেন, মাটি এবং দূষিত বর্জ্যরে মধ্য থেকে সংগৃহীত বিশেষ ধরনের ব্যাকটেরিয়া দ্বারা এই গবেষণা করা হয়েছে।

ফিশারিজ এবং এ্যাকোয়াটিক এনভায়রনমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক ড. এসএম রফিকুজ্জামান বলেন, প্রাথমিক গবেষণায় দেখা গেছে অনুজীবের মাধ্যমে বর্জ্যজল শোধন বর্তমান দূষণ থেকে উত্তরণের জন্য একটি টেকসই সমাধান দিতে পারে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা সামনে রেখে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে একটি অনুজীব বর্জ্যজল শোধনাগার তৈরি দেশের জন্য একান্তই প্রয়োজন। তা যেমন অর্থনৈতিক দিক থেকে সাশ্রয়ী। অপরদিকে পরিশোধিত পানি বিভিন্ন উপায়ে ব্যবহার করা যাবে।
গবেষণার সঙ্গে সম্পৃক্ত বিজ্ঞানীরা জানান, আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে কেমিক্যাল নির্ভর পরিশোধনকে পুরোপরি নিরাপদ পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। এই বিবেচনা থেকেই বিভাগের গবেষণাগারে পরীক্ষামূলকভাবে অনুজীবের সাহায্যে বর্জ্যজল পরিশোধনের চেষ্টা করা হয়। এতে প্রাথমিক সাফল্য পাওয়া যায়। তারা বলেন, যে কোন ধরনের বর্জ্য পানীয়র মধ্যে এক ধরনের অণুজীব বাস করে। সেই অনুজীবগুলো সেই বর্জ্য ভেঙ্গেই তাদের পুষ্টি বা খাবার সংগ্রহ করে। সঠিক (অপটিমাইজেশনের) নিখুঁত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেইসব অনুজীব দ্বারা এই ধরনের দূষিত তরল বর্জ্য শোধন করা সম্ভব। একই সঙ্গে তারা কলকারখানার দূষণরোধে অণুজীব বর্জ্য শোধনাগার স্থাপনের প্রস্তাব করেছেন। বলেন, পরিকল্পিত অনুজীব বর্জ্যজল শোধনাগারটি শুধু নিরাপদ পানির উৎসই হবে না, সহজ স্থাপনা ও ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি বর্তমান পরিশোধন প্লান্টগুলোর তুলনায় খরচ বাঁচবে ৮০ শতাংশ।

ড. এসএম রফিকুজ্জামান আরও বলেন, শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বের অনেক দেশেই এটি ব্যবহারের জন্য গবেষণা হচ্ছে। এমনকি শিল্পকারখানায় ব্যবহারের ওপর এখন জোর দেয়া হচ্ছে। আমাদের গবেষণাগারেও এটি প্রমাণিত হয়েছে যে, প্রকৃতিতে থাকা অনুজীবগুলো বিষাক্ত বর্জ্য ভেঙ্গে ফেলতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় পানিও শোধন করা যায়। এই অনুজীব প্রকৃতিতেইে পাওয়া যায়। অনুজীব বর্জ্যজল শোধনাগারের স্থাপত্য নক্সা বা এটি স্থাপন ও পরিচালনা খরচের বিষয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি এখনও গবেষণার পর্যায়ে রয়েছে। তবে সাধারণ যে ইটিপি শিল্পকারখানায় ব্যবহার করা হয়ে থাকে তার চেয়ে এটির খরচ অনেক কম হবে। তিনি বলেন, অনুজীবগুলো দেশের বাইরে থেকে সংগ্রহ করা যাবে। আবার দেশের প্রকৃতিতে থাকা অনুজীবগুলো ব্যবহারও করা যাবে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, অনুজীব বর্জ্য শোধানাগারে পরিশোধিত পানি দ্বারা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার মাধ্যমে জলজ জীববৈচিত্র এবং পাশাপাশি উন্মুক্ত জলাশয়ে যেমন নদ-নদী, খাল-বিল ইত্যাদি পানির উচ্চতাও কাঙ্খিত পর্যায়ে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। এই প্ল্যান্টের পরিশোধিত পানি ব্যবহার করা যাবে সেচ কাজে, গৃহস্থালি কাজে ও পানীয় হিসেবে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত