প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ভঙ্গুর সমাজের আবরার ও তুহিনরা

 

আকতার বানু আলপনা : ছোটবেলায় একটা গল্প শুনেছিলাম। এক লোক প্রতিহিংসাবশত তার নিজের মৃত মায়ের গলায় দড়ি বেঁধে তাকে তার এক প্রতিবেশী শত্রুর কুয়ার মধ্যে ফেলে দিয়ে এসেছে (যাতে কুয়ার পানি দূষিত হয় এবং সে প্রতিবেশী পানির কষ্টে পড়ে)। তাই দেখে সেই শত্রু তার নিজের জ্যান্ত মায়ের গলায় দড়ি বেঁধে নিয়ে গিয়ে সেই প্রতিবেশীর কুয়ার মধ্যে ফেলে দিয়ে এলো। আমাদের একটি প্রবাদও আছেÑ নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করা। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, বাঙালি স্বভাবগতভাবেই প্রতিহিংসা পরায়ণ। সে অন্যকে বিপদে ফেলার জন্য নিজের মাকে খুন করে। এমনকি নিজের নাক কাটতেও দ্বিধাবোধ করে না। সেই নাক কাটতে কাটতে এখন আমরা নিজের সন্তানকে খুন করা পর্যন্ত এসেছি। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে নির্যাতন, খুন, গুম, মিথ্যা মামলা করে শত্রুকে বিপদে ফেলা, পুলিশে ধরিয়ে দেয়া, জেল, শত্রুর সম্পদ জবরদখল, ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে চাঁদাবাজি, ধর্ষণ, আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারা ইত্যাদি হেন অপরাধ নেই, যা আমরা করি না। আর এসব অপরাধ করার কারণে যখন কেউ শাস্তি পাওয়ার বদলে পুরস্কার পায় বা নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়াতে পারে, ঠিক তখনই আসলে বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হয়। তখন ন্যায় হয়ে যায় অন্যায়, মন্দ হয়ে যায় ভালো, নিন্দিত ব্যক্তি হয়ে যায় সম্মানিত আর সম্মানিত ব্যক্তি হয়ে যায় নিন্দিত। তখন ‘চোরের মায়ের বড় গলা’র মতো কখনো কখনো নির্যাতিতরাই ন্যায়বিচার পাওয়ার পরিবর্তে শাস্তি পায়। নীতিবান, সৎ, অন্যায়ের প্রতিবাদকারী লোকেদের নানাভাবে বিপদে ফেলা হয়। এটাকে বলে ভিকটিম ব্লেমিং কালচার।

আর কোনো সমাজে চলমান এ রকম অরাজক পরিস্থিতি সমাজের সব স্তরের মানুষকে নিশ্চিন্ত মনে যেকোনো অপরাধ করতে উসকে দেয়। ফলে মানুষ আইনের ভয় ভুলে গিয়ে নিশ্চিন্ত মনে একের পর এক ছোট থেকে বড় অপরাধ করতেই থাকে। যখন কোনো সমাজে এ রকম ভয়াবহ রকমের অরাজকতা, জবাবদিহিতার অভাব এবং বিচারহীনতা চলমান থাকে, তখন মানুষের যুক্তিবোধ, সহনশীলতা, মানবিকতাবোধ ইত্যাদি ভালো গুণগুলো কাজ করে না। ফলে তখন মানুষ সামান্য কারণেও বড় বড় অপরাধ করে বসে। সামান্য কথা কাটাকাটির কারণে চলন্ত বাস থেকে ফেলে দিয়ে নির্মমভাবে মানুষ হত্যা করে। ছেলেধরা, পকেটমার, শিবির, নাস্তিক ইত্যাদি আখ্যা দিয়ে মানুষ খুন করে। ঘুষ, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অতিরিক্ত লোভের কারণে প্রতিষ্ঠানের টাকায় বিলাসিতা, আর্থিক অনিয়ম, লুটপাট, অর্থ তছরুপ, স্বেচ্ছাচারী আচরণ, বাকস্বাধীনতা হরণ বা সমালোচনাকারীকে নির্যাতন করা ইত্যাদি করে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর লোকেরাই আইন ভেঙে চাঁদাবাজি, ঘুষ, দুর্নীতি, অপরাধ, ঘুষ নিয়ে মানুষ খুন, পকেটে ইয়াবা ঢুকিয়ে দিয়ে চাঁদাবাজি, নারী নির্যাতন, চোরাকারবারি, মাদক ব্যবসাসহ হাজার অপরাধ করে। পুলিশের চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ে। ফলে সবাই নানা অপরাধে জড়ায়।

দীর্ঘদিন ধরে চারপাশে নানা অনিয়ম হতে দেখে মানুষের মনে ন্যায়-অন্যায়বোধের প্রকৃত ধারণা বদলে যায়। ফলে মানুষ ভুল আদর্শ গ্রহণ করে। আগে সত্যবাদী, নির্লোভ, নীতিবান লোককে লোকে শ্রদ্ধা করতো। এখন ক্ষমতাবানদের লোকে সম্মান করে। রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি বা সুবিধাবাদের রাজনীতির কারণে মানুষের মধ্যে মানবিকতাবোধ, শাস্তির ভয় ও আত্মমর্যাদাবোধ কমে যাচ্ছে। ফলে স্বার্থ হাসিল করতে এখন যে কেউ যেকোনো কাজ বা অন্যায় করতে দ্বিধা করে না। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশের অভাবের কারণে দেশে সামাজিক নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে সামাজিক অবক্ষয় সৃষ্টি হয়েছে। মানুষের মধ্যে এখন দয়া, ভালোবাসা, আন্তরিকতা, মিলেমিশে থাকার প্রবণতা, অন্যকে সাহায্য করা, পরমতসহিষ্ণুতা, একতাবোধ ইত্যাদি কমে গিয়ে মানুষের মধ্যে তীব্র বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে।এরই ধারাবাহিকতায় আবরার হত্যাকা- ঘটেছে। সবশেষে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে পরিকল্পিতভাবে এবং নৃশংসভাবে তুহিন নামের ছেলেটাকে তার বাবা এবং চাচা মিলে খুন করেছে। এদেশের মানুষ এখন কতোটা হিংস্র, প্রতিহিংসাপরায়ণ, শাস্তির ভয়হীন, বিবেকবর্জিত এবং নিষ্ঠুর হলে এ রকম ঘটনা ঘটাতে পারে, তা এই দু’টো খুন থেকে খুব তীব্রভাবে বোঝা যায়। এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষ্যণীয়। সেটা হলো, তুহিনকে তার বাপ-চাচা শুধু খুন করলেই পারতো। কিন্তু এতো নৃশংসভাবে ও বীভৎসভাবে খুন করলো কেন? এর কারণ হলোÑসবার নজর কাড়তে। বিচারের নিশ্চয়তা পেতে। যে যতো বেশি নির্যাতিত হয় বা হয়ে মারা যায়, তার প্রতি পাবলিক সেন্টিমেন্ট ততো বেশি হয়। ফলে সোশ্যাল মিডিয়া, খবরের কাগজ, টিভি টকশোসহ সারাদেশে অপরাধীর শাস্তির দাবি জোরালো হয়। কোনো দেশের বিচার ব্যবস্থা কতোটা ভঙ্গুর এবং মানুষের আস্থাহীন, এখান থেকে সেটা বোঝা যায়। যেকোনো সভ্য ও গণতান্ত্রিক দেশে যেকোনো অপরাধের বিচার এমনিতেই হবে। আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। আইন হবে সবার জন্য সমান। যে দেশে অপরাধীর শাস্তির দাবিতে আন্দোলন করতে হয়, সেদেশকে আর যাই হোক, ‘গণতান্ত্রিক, সুশাসনের দেশ বা সভ্য দেশ’ বলার কোনো সুযোগ নেই। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত